বিশেষ প্রতিনিধি
চট্টগ্রামে মানুষকে বলা হয় ভোজনরসিক। নিজেরাও যেমন ইচ্ছামতো খায়, বাড়িতে মেহমান আসলেও খাওয়াতেও পছন্দ করেন তারা। অতিথিদের হরেক রকম খাবার দিয়ে মেহমানদারি করা যেন তাদের অন্যতম বৈশিষ্ট্য। কার চেয়ে কে বেশি মেহমানদারি করতে পারবেন, সেটি নিয়ে অনেক সময় প্রতিযোগিতাও চলে তাদের মধ্যে। চট্টগ্রামের মেজ্জান ( মেজবান) , গণি বেকারীর বেলা বিস্কুট, শুটকির কথা তো দেশের গণ্ডি পেরিয়ে বাইরেই অনেকেও জানে।তবে এখন জিনিসপত্রের লাগামহীন মূল্যবৃদ্ধির প্রভাব পড়েছে তাদের জীবনে।এখন ভোজনবিলাস তো দূরে থাক, নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্র কিনতেও হিমশিম খাচ্ছেন এখানকার একটি বড় অংশের মানুষ। এখানকার কয়েকটি বাজারে ২৫০ গ্রাম করে গরু আর পিস হিসেবে মুরগি বিক্রির দৃশ্য দেখলে তাদের বর্তমান অবস্থা কিছুটা বুঝা যায়।
শুক্রবার ( ১০ মার্চ) সকালে চট্টগ্রাম নগরের চকবাজারের কাঁচাবাজারে গিয়ে দেখা যায় বেশ কয়েকটি দোকানে ‘পিস’ হিসেবে মুরগি বিক্রি হচ্ছে।আবার কয়েকটি দোকানে ২৫০ গ্রাম করে বিক্রি হচ্ছে গরুর মাংস। যেগুলো ঠিক দুই মাস আগেও চিন্তা করা যেতো না।এসব দোকানে ‘এখানে মুরগির মাংস পিস হিসেবে বিক্রি হয়’, এখানে ন্যুনতম ২৫০ গ্রাম মাংস বিক্রি হয়’ ফেস্টুন টাঙ্গিয়ে রাখতে দেখা যায়।আর সেসব দোকানে ভীড় করছেন বিভিন্ন শ্রেণী পেশার মানুষ।
চট্টগ্রামে সাধারণত কোনো আচার- অনুষ্ঠানকে উপলক্ষে চট্টগ্রামে মেজবানের আয়োজন করা হয়। যেমন- মৃত ব্যক্তির কুলখানি, চেহলাম এবং বার্ষিকী উপলক্ষে ভোজ। এ ছাড়া আকিকা, খৎনা, গায়েহলুদ, কিংবা নতুন কোনো ব্যবসা আরম্ভ এবং নতুন বাড়িতে প্রবেশ করলেও কেউ কেউ মেজবানের আয়োজন করে থাকেন।সারা বছরই মেজবান করা হলেও সাধারণত ডিসেম্বর থেকে ফেব্রুয়ারী – এই তিন মাসেই সবচেয়ে বেশি মেজবানের আয়োজন করা হয়।তবে সেই মেজবানের পরিমাণও এখন অস্বাভাবিকভাবে কমে গেছে।গরুর মাংসের পাশাপাশি মসলাসহ আনুষঙ্গিক জিনিসপত্রের দাম বেশি হওয়ায় এখন এই মেজবানের সংখ্যা কমে গেছে অনেকটা।
ফটিকছড়ির কাঞ্চনগরের একটি মহল্লার সর্দার মাস্টার জসিম উদ্দিন বলেন, এখানে আগে গড়ে প্রতি মাসে কয়েকটি মেজবান হতো।বিশেষ করে ডিসেম্বর থেকে মার্চ মাসে সবচেয়ে বেশি মেজবান দেওয়া হতো।মানে এটি মেজবানের মৌসুম চলছে।আর সেখানে আমাদের এই সমাজসহ আশেপাশের সমাজে গত দুইমাসে কোন মেজবান হয়নি। মানুষ নিজেরাই চলতে পারছে না, সেখানে মেজবান দিবে কিভাবে।
এদিকে গতানুগতিক মেজবানের পাশাপাশি চট্টগ্রাম শহরের প্রায় সব ভালো রেষ্টুরেন্টে বিক্রি করা হতো মেজবানের মাংশ।এরমধ্যে শুধুমাত্র মেজবানের বিশেষায়িত রেস্টুরেন্ট আছে ১৪- ১৫ টি। সেসব রেষ্টুরেন্টে বিকিকিনি ছিলো চোখে পড়ার মতো। ।তবে বর্তমান সময়ে এদের ব্যবসায়েও ভাটা পড়েছে। কয়েকটি মেজবানের রেস্টুরেন্ট ইতোমধ্যে বন্ধও হয়ে গেছে।
নগরের মুরাদপুরে অবস্থিত ‘ডেইলি মেজ্জান’ রেস্টুরেন্ট।তুলনামূলক কম মূল্য ও ভালো স্বাদের কারণে প্রতিষ্ঠানটির বেশ নামডাক আছে পুরো শহরে। করোনা মহামারীর সময়েও ভালো ব্যবসা করেছিল প্রতিষ্ঠানটি।তব দ্রব্যমূল্যের লাগামহীন মূল্যবৃদ্ধির কারণে অন্যদের পাশাপাশি প্রতিষ্ঠানটির খাবারের মূল্যও বাড়িয়েছে সম্প্রতি। আর এতেই কাস্টমার কমে গেছে ৩০-৪০ শতাংশ।
প্রতিষ্ঠানটির পরিচালক অহিদুল আলম সাম্পান নিউজকে বলেন, আসল মেজবানের স্বাদ ধরে রাখার পাশাপাশি তুলনামূলক কম মূল্যের কারণে আমাদের বিক্রি বেশ ছিলো।তবে এখন দ্রব্যমূল্যের বৃদ্ধির কারণে আমাদেরকে খাবারের মূল্য বাড়াতে হয়েছে।যার ফলে বিক্রি কমে গেছে অনেকটা।একজনের প্যাকেজ দুই জনে মিলে খাচ্ছে। ব্যবসা চালাতে এখন আমাদের হিমশিম খেতে হচ্ছে।
চট্টগ্রামে বিয়শাদী মানেই বুঝতে হবে বাহারী খাবারের মেলা।৮-১০ পদ খাবার দিয়ে বরযাত্রীসহ মেহমানদের আপ্যায়ন করতে হবে – এটাই ছিলো এখানকার নিয়ম।তবে এখানেও লেগেছে দ্রব্যমূল্যের লাগামহীন মূল্যবৃদ্ধির প্রভাব। খরচ কমাতে এখন এই আইটেম গুলোতে কাটছাঁট করছেন আয়োজকরা।
চট্টগ্রাম মহানগর হোটেল রেস্টুরেন্ট বাবুর্চি সমিতির সেক্রেটারি শহিদুল ইসলাম এই প্রতিবেদককে বলেন, ১৬ বছর ধরে চট্টগ্রামে বিভিন্ন অনুষ্ঠানে রান্নাবান্না করছি।এক সময় কমপক্ষে ৮-১০ পদের খাবার দিয়ে বিয়ে-শাদিতে খাওয়ানো হতো।আর এখন এটি ৬-৭ আইটেমে নেমে এসেছে।আসলে কিছুই করার নেই।মানুষ তো হাঁপিয়ে উঠেছে।
শনিবার বিকেলে নগরের হিলভিউ বাজারে গিয়ে দেখা যায় ক্রেতাদের নাভিশ্বাস। এখানে প্রতি কেজি হাড়ছাড়া গরু বিক্রি হচ্ছে ৮৫০ টাকা, হাড়সহ গরু ৭৫০ টা,ব্রয়লার মুরগি ২৫০ টাকা, তেলাপিয়া মাছ ২০০ টাক,পাঙ্গাশ মাছ ১৮০ টাকা, রুই ২৬০ টাকা আর প্রতি ডজন ডিম ১৩০ টাকা।মুদির আইটেমের মধ্যে সয়াবিন তেল প্রতি লিটার ১৮৭ টাকা, সরিষার তেল ৩২০ টাকা,প্রতি কেজি চিনি ১২০ টাকা, চনার ডাল ৭৭ টাকা,মসুর ডাল (বড় দানা ) ১১৫ টাকা, ছোট দানা মসুর ডাল ১৫০ টাকা,পেঁয়াজ ৪০ টাকা,রসুন ১২০ টাকা বিক্রি হচ্ছে।
তবে একই সময়ে দেশের বৃহত্তর পাইকারি ভোগ্যপণ্যের বাজার চট্টগ্রামের খাতুনগঞ্জে খোঁজ নিয়ে জানা যায় ভিন্ন চিত্র।সেখানে প্রতি লিটার সয়াবিন তেল ১০৭ টাকা, সরিষার তেল ২৪৫ টাকা, প্রতি কেজি কেজি চিনি ১০৭ টাকা, চনার ডাল ৭৭ টাকা,মসুর ডাল ছোট ( ১৩০ টাকা, বড় দানার মসুর ডাল ৮৮ টাকা,পেঁয়াজ ৩০ টাকা, রসুন ১০২ টাকায় পাইকারি বিক্রি হচ্ছে। এক্ষেত্রে দেখা যাচ্ছে, দেশের পাইকারি বাজার অনেকটা স্বাভাবিক হলেও রহস্যজনক কারণে খুচরা বাজার অস্থিতিশীল।
এই বিষয়ে জানতে চাইলে চাক্তাই খাতুনগঞ্জ আড়ৎদার ব্যবসায়ী সমিতি সেক্রেটারি মোহাম্মদ মহিউদ্দিন বলেন, খাতুনগঞ্জের বাজার এখন স্থিতিশীল। বলতে গেলে গত বছরের রমজানের তুলনায় এইবার চিনি ছাড়া প্রায় সব আইটেমের মূল্য কম। এখানে আমদানি স্বাভাবিক আছে, মজুদও পর্যাপ্ত আছে।এরমধ্যে একটা শ্রেণী আমদানি বন্ধ- মজুদ কম গুজব ছড়িয়ে খুচরা বাজার অস্থিতিশীল করছে ও সুবিধা নিচ্ছে।এক্ষেত্রে তাই প্রশাসনকে খুচরা বাজার মনিটরিংয়ে গুরুত্ব দেওয়া দরকার।
