বুধবার, ২৫ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ১৩ ফাল্গুন ১৪৩২

সীতাকুণ্ডের অক্সিজেন প্লান্ট দূর্ঘটনায় লাশের সংখ্যা বেড়ে ৭,সেদিন যা ঘটেছিল

প্রকাশ: ৬ মার্চ ২০২৩ | ৬:২১ পূর্বাহ্ণ আপডেট: ৬ মার্চ ২০২৩ | ৬:২৪ পূর্বাহ্ণ
সীতাকুণ্ডের অক্সিজেন প্লান্ট দূর্ঘটনায় লাশের সংখ্যা বেড়ে ৭,সেদিন যা  ঘটেছিল

জালাল ইবনে জহুর

সময় তখন বিকেল ৪ টা ৪০ মিনিট।সীতাকুণ্ডের কদমরসুলপুর বাজারের মসজিদ থেকে নামাজ পড়ে এসে শ্যালকের দোকানে এসে বসলেন ব্যবসায়ী শামসুল আলম।হঠাৎ একের পর এক বিস্ফোরণে বিকট শব্দ আসতে থাকে।।চেয়ার থেকে উঠতে যাবেন- সেই মুহুর্তেই তার মাথার উপর এসে পড়ল প্রায় ২৫০ কেজি ওজনের সিলিন্ডারের টুকরো।সেখানেই তার মৃত্যু হয়।

শনিবার (৪ মার্চ) সীতাকুণ্ডের সীমা অক্সিজেন প্ল্যান্টে ভয়াবহ বিষ্ফোরণের একটি চিত্র এটি । দুর্ঘটনার দিন ঘটনাস্থলে ২ জন ও হাসপাতালে আনার পর ৪ জনের মৃত্যু হয়েছে। পরের দিন রবিবার রাতে চমেক হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় প্রবেশ লাল শর্মা নামে আরও একজন মারা গেছেন।সব মিলিয়ে এই দূর্ঘটনায় ৭ জনের মৃত্যু হয়ছে।আর এখনও হাসপাতালে চিকিৎসাধীন আছেন ১৯ জন।এদের মধ্যে একজনের অবস্থা আশঙ্কাজনক।

এই ঘটনায় নিহতরা হলেন মো. শামসুল আলম (৫৬), মো. ফরিদ (৩৬), রতন নখরেট (৪৫), আব্দুল কাদের (৫০), সালাউদ্দিন (৪০),সেলিক রেসিল (৩৪) ও প্রবেশ লাল শর্মা (৫৫) । এদের মধ্যে ব্যবসায়ী শামসুল আলম ছাড়া সবাই এই অক্সিজেন কারখানার কর্মকর্তা- কর্মচারী।

জানা যায়, ভয়াবহ এই বিষ্ফোরণে অক্সিজেন প্লান্টটির কয়েক কিলোমিটার এলাকা প্রচন্ড শব্দে কেঁপে উঠে। আশেপাশের অনেক বাড়ি ঘর ও দোকানের গ্লাস ভেঙ্গে পড়ে। কিছু কিছু বিল্ডিংয়ে দেখা দেয় ফাটল।এই ঘটনায় স্থানীয়দের মাঝে এখনও বিরাজ করছে আতঙ্ক।

চমেক হাসপাতালে চিকিৎসাধীন এক শ্রমিকের স্বজন আব্দুল কাদের বলেন, আমার বাড়ি মাদামবিবি এলাকায়।এটি সীমা ফ্যাক্টরি থেকে প্রায় আড়াই কিলোমিটার দুরে। বিকেল সাড়ে ৪ টার দিকে হঠাৎ পুরো ঘর কেঁপে উঠে। ভূমিকম্প ভেবে ঘরের সবাই বের হয়ে পড়ি।বের হতেই শুনি বিষ্ফোরণের আওয়াজ।আমাদের মতো বাড়ির অন্যদেরও একই অবস্থা। পরে বাসায় এসে দেখি বাসার কাঁচের জানালা ফেটে গেছে।টেবিলের এক পাশে রাখা বই পত্র নিচে পড়ে আছে।এই ঘটনায় কদম রসুলপুর বাজারে থাকা আমার খালাতো ভাই আহত হয়েছে।তার জন্য এখন আমরা এখানে এসেছি।

রবিবার সকাল ৭ টায় ঘটনাস্থলে এসে দ্বিতীয় দিনের মতো উদ্ধার অভিযান শুরু করে ফায়ার সার্ভিস, পুলিশ, র‍্যাব ও নৌবাহিনীর যৌথ টিম।বিভিন্ন স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনের লোকজনও অভিযানে অংশগ্রহণ করেন।দুপুর দেড়টা পর্যন্ত এই অভিযান পরিচালনা করা হয়।তবে নতুন করে কারও লাশ ও আহতদের সন্ধান পাওয়া যায়নি। পরে ঘটনাস্থলে থাকা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) শাহাদাত হোসেন উদ্ধার অভিযানের সমাপ্তি ঘোষণা করেন।

এদিকে ঠিক কি কারণে এই ভয়ায়হ বিষ্ফোরণ ঘটেছে তা নির্দিষ্ট করে কেউ বলতে পারেনি।এমনকি মালিকপক্ষ এই বিষয়ে কিছু জানেন না বলে দাবি করেছেন।তবে রবিবার সকালে ঘটনাস্থল পরিদর্শন করতে আসা বিস্ফোরক অধিদফতরের পরিদর্শক মো. তোফাজ্জল হোসেন বলেন, প্লান্টে অক্সিজেন ছাড়াও কার্বন ডাই-অক্সাইড ও নাইট্রোজেনের সিলিন্ডার দেখা গেছে।কাজেই অক্সিজেন সিলিন্ডারের মাধ্যমেই যে বিষ্ফোরণ হয়েছে – তা ঠিক বলা যাচ্ছে না। প্ল্যান্টের চারটি পয়েন্টে সিলিন্ডারে গ্যাস ভরার ব্যবস্থা রয়েছে।প্রাথমিকভাবে মনে হচ্ছে প্ল্যান্ট থেকে যে কলামের মাধ্যমে অক্সিজেন সিলিন্ডারে ভরা হয়, সেটি বিস্ফোরিত হয়েছে।বাকিটা তদন্ত করে বলা লাগবে।

চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন কারখানাটির কম্প্রেসার অপারেটর মো. ওসমান বলেন, এখানে বাতাস থেকে অক্সিজেন উৎপাদন করা হতো।অক্সিজেনের অতিরিক্ত চাপের কারণে বিস্ফোরণ হয়েছে।বিস্ফোরণের সময় আমি ঘটনাস্থলের পাশেই ছিলাম।

ঘটনার পর থেকে নিরুদ্ধেশ থাকলেও রবিবার দুপুরে প্রকাশ্যে আসেন অক্সিজেন প্লান্টটির ম্যানেজার আবদুল আলীম। এ সময় তিনি সাংবাদিকদের বলেন, সর্বোচ্চ যত্নের সাথে আমাদের কার্যক্রম চলতো। আমাদের কাছে পক্ষে ফায়ার সার্ভিস, বিস্ফোরক পরিদপ্তরসহ সব সংস্থার ছাড়পত্র, সনদ রয়েছে।কি কারণে এই দূর্ঘটনা ঘটেছে তা বলতে পারছি না।আমাদের ৫০ কোটি টাকার বেশি ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে।আর এখন যারা হতাহত হয়েছে সবাইকেই কোম্পানির পক্ষ থেকে সহযোগিতা করা হবে।এক্ষেত্রে প্রশাসনের সাথে আমরা সমন্বয় করবো।

এদিকে বিস্ফোরণের ঘটনায় চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসন সাত সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করেছে।অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট রাকিব হাসানকে প্রধান করে গঠিত এই কমিটিকে পাঁচ কর্মদিবসের মধ্যে প্রতিবেদন জমা দিতে বলা হয়েছে। কমিটিতে পুলিশ সুপারের প্রতিনিধি, কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদপ্তর চট্টগ্রামের উপ-মহাপরিদর্শক (ডিআইজি), সীতাকুণ্ড উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও), উপজেলা ভূমি অফিসের সহকারী কমিশনার (এসিল্যান্ড), ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের প্রতিনিধি, বিস্ফোরক পরিদপ্তরের প্রতিনিধিকে সদস্য করা হয়েছে। এছাড়া বিস্ফোরণে আহতদের তাৎক্ষণিকভাবে সাড়ে ৭ হাজার টাকা এবং নিহতদের পরিবারকে ৫০ হাজার টাকা দিয়েছে জেলা প্রশাসন। পরবর্তী নিহতের পরিবারকে আরও ২ লাখ টাকা দেওয়া হবে বলে জানানো হয়েছে।

সীতাকুণ্ড উপজেলার নির্বাহী কর্মকর্তা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) শাহাদাত হোসেন বলেন, আমাদের উদ্ধার অভিযান শেষ। ৬ জনের লাশ উদ্ধার করা হয়েছে।হাসপাতালে ২০ জন চিকিৎসাধীন আছেন।হতাহতদের জন্য জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে প্রাথমিকভাবে কিছু সহযোগিতার ব্যবস্থা করা হয়েছে।এখন মালিকপক্ষকে ডেকেছি।তারাও সহযোগিতা করবেন হতাহতদের। আর তাদের কাগজপত্র যা আছে তা নিয়ে আসতে বলে হয়েছে।এগুলো সব খতিয়ে দেখবো।

প্রসঙ্গত, সীতাকুণ্ডের কদম রসুলপুরে অবস্থিত সীমা অটো রি-রোলিং মিলস এর একটি অঙ্গপ্রতিষ্ঠান সীমা অক্সিজেন ‘প্লান্ট’ লিমিটেড। সীতাকুণ্ডে এটি ছাড়াও ৭টি অক্সিজেন উৎপাদনকারী কারখানা আছে। করোনা পরিস্থিতির সময় এসব কারখানা থেকে উৎপাদিত অক্সিজেন সারা দেশে সরবরাহ করা হয়েছিল।তবে প্রতিষ্ঠানটির বিরুদ্ধে মাত্রাবহির্ভূত অপরিশোধিত বিষাক্ত বায়ু ছেড়ে দীর্ঘদিন ধরে পরিবেশ দূষণ করার অভিযোগ আছে। পরিবেশের শর্ত ভঙ্গ এবং পরিবেশের ক্ষতি সাধন করার অপরাধে প্রতিষ্ঠানটিকে বেশ কয়েকবার জরিমানা করেছিল পরিবেশ অধিদপ্তর।

সম্পর্কিত পোস্ট

সর্বশেষ পোস্ট



Shares