বৃহস্পতিবার, ২৬ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ১৪ ফাল্গুন ১৪৩২

বিশ্বজুড়ে গণহত্যার বিচার ও প্রশ্ন

প্রকাশ: ৩ মার্চ ২০২৩ | ৫:১৫ অপরাহ্ণ আপডেট: ৩ মার্চ ২০২৩ | ৫:১৫ অপরাহ্ণ
বিশ্বজুড়ে গণহত্যার বিচার ও প্রশ্ন

আহমেদ ইয়াসীর আবরার

“ইহুদিদের উচিত আমাদের ক্যাম্পগুলোতে এসে সরাসরি দেখা এবং আমরা প্রতিদিন যে বোমা হামলার শিকার হই তা প্রত্যক্ষ করা। এইসব দেখলে তারা তাদের ‘মহান ইসরায়েল’ ও জেরুজালেমকে নিজেদের রাজধানী বানানোর স্বপ্ন মুহূর্তের মধ্যে ভুলে যাবে। যদি একজন ইহুদি আমাদের কষ্ট-দুর্দশা একদিন সরাসরি প্রত্যক্ষ করে, তাদের জেরুজালেম দখলের কাজ ছেড়ে দিবে। আমি এখানে দেখি ধ্বংস হয়ে যাওয়া অসংখ্য মৃতদেহ ও স্থাপনার স্তুপ। আর অকথ্য নির্যাতন। এসবের পর, যার ভিতর দিয়ে আমি যাচ্ছি, আমার এই জীবনের কী হবে? তারা আমার সব স্বপ্ন ভেঙে দিয়েছে। আমার আর কী বা বলার আছে? এখানে কোনো জীবন অবশিষ্ট নেই।”

এই বর্ণনাটুকু দিয়েছেন ফিলিস্তিনের একজন শিশু। ক্ষোভের এই বাক্যগুলো দীর্ঘকাল ধরে ঘটে আসতে থাকা অত্যাচার ও দখলদারিত্বের একটি ক্ষুদ্র কিন্তু শক্তিশালী বহিঃপ্রকাশ। অথচ ফিলিস্তিনে চলমান এই গণহত্যাকে বিশ্ব এখনো ‘গণহত্যা’ হিসেবে বিচার করতে পারছে না। এই না পারার বিষয়টি নিছক অপরাগতা নাকি রাজনীতি?

“জেনোসাইড বা গণহত্যা শব্দটি সামনে নিয়ে আসেন পোলিশ ইহুদি আইনজীবী রাফায়েল ল্যামকিন। তিনি বলেন যে একটি গোষ্ঠীর সংস্কৃতি মূলত পুরো মানবগোষ্ঠী ও সভ্যতার একটি অংশ। তাই জাতিসংঘের ১৯৪৬ সালের একটি সিদ্ধান্তে উল্লেখ করে যে, গণহত্যা হলো একটি নির্দিষ্ট মানবগোষ্ঠীর অস্তিত্বকে অস্বীকার করা, যেভাবে একটি হত্যা একজন ব্যক্তির অস্তিত্বের অধিকারকে লঙ্ঘন করে। জাতিসংঘের ১৯৪৮ সালে হওয়া *Convention on the Prevention and Punishment of the Crime of Genocide (CPPCG)’ বা, ‘জেনোসাইড কনভেনশন’-এর ২নং ধারা অনুযায়ী, কোনো জাতি, বর্ণ, গোত্র বা ধর্মীয় জনগোষ্ঠীকে যদি পুরোপুরি বা আংশিকভাবে ধ্বংস করে দেয়ার উদ্দেশ্যে সেই গোষ্ঠীর সদস্যদের হত্যা করা হয়, শারীরিক বা মানসিক ক্ষতি করা হয়, সদস্যদের জীবনমানের উপর যদি ইচ্ছাকৃত আরোপ জারি করা হয় যাতে শারীরিকভাবে সেই গোষ্ঠী পুরোপুরি বা আংশিকভাবে ধ্বংস হয়ে যায়, গোষ্ঠীর ভিতরে জোরপূর্বক শিশু জন্মের উপর বাধা আরোপ করলে অথবা, গোষ্ঠীর শিশুদেরকে অন্য গোষ্ঠীতে স্থানান্তর করা হলে, তাকে জাতিসংঘ ‘গণহত্যা’ হিসেবে বিবেচনা করা হবে।

জেনোসাইড কনভেনশনের পর জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদ এখন পর্যন্ত দুইটি গণহত্যার বিচার করতে সক্ষম হয়েছে। রোয়ান্ডা ও যুগোস্লাভিয়ার গণহত্যা। অথচ, এই দুটি ছাড়াও আরো গণহত্যার চিহ্ন বহন করে এমন ঘটনা বিশ্ব প্রত্যক্ষ করেছে। ১৯৯০ সালে জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদ ইরাক রাষ্ট্রের উপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে। জাতিসংঘের তথ্যমতে, ১৯৯৫ এর শেষ নাগাদ, নিষেধাজ্ঞার ফলস্বরূপ প্রায় ১০ লক্ষ ইরাকি মারা যায়, যার মধ্যে অর্ধেক ছিল শিশু। এই বিষয়টি নিয়ে ১৯৯৬ সালে সাংবাদিক লেসলি স্টেল একটি প্রশ্ন করেন, “আমরা জানতে পেরেছি যে প্রায় পাঁচ লক্ষ শিশু মারা গিয়েছে। তার মানে, হিরোশিমার চেয়েও অধিক সংখ্যক শিশু মারা গিয়েছে। আপনি জানেন, এই যে মূল্য দিতে হচ্ছে, তা কি ন্যায্য?” প্রশ্নটি তিনি করেন যুক্তরাষ্ট্রের তৎকালীন জাতিসংঘ প্রতিনিধি মেডেলিন অলব্রাইটকে। আব্রাইট উত্তর দেন, “আমি মনে করি, এটি খুবই কঠিন সিদ্ধান্ত। কিন্তু এই মূল্য- আমরা মনে করি এই মূল্য ন্যায্য। ” অথচ জেনোসাইড কনভেনশন বলছে যে ‘সংরক্ষিত’ কোনো গোষ্ঠীর সদস্যদের জীবনমানের উপর যদি ইচ্ছাকৃত কোনো আরোপ জারি করা হয় যার ফলাফলে সেই গোষ্ঠী শারীরিকভাবে পুরোপুরি বা আংশিক ধ্বংস হয়ে যায়, তাহলে তাকে গণহত্যা বলা হবে। অথচ এই স্পষ্ট গণহত্যাকে জাতিসংঘ আজও স্বীকৃতি দিতে পারেনি।

১৯৬৫ সালে ইন্দোনেশিয়ায় একটি ক্যু সংঘটিত হয়। এই ক্যুতে ৬ জন জেনারেল ও ১ জন সহকারী নিহত হয়। ঘটনার ২৪ ঘন্টার মধ্যেই জেনারেল সুহার্তো এই ক্যুর জন্য কমিউনিস্টদের দায়ী করেন এবং দেশব্যাপী কমিউনিস্ট নিধনের জন্য ডাক দেন। তার এই ডাকে ইন্দোনেশিয়ায় রক্তগঙ্গা বয়ে যায় এবং ১৯৬৬ সালের ফেব্রুয়ারি নাগাদ প্রায় ৫ লক্ষ কমিউনিস্টকে হত্যা করা হয়। এই ঘটনাটিকে নিকোলে রাফটার এই ঘটনাকে একটি “রাজনৈতিক গণহত্যা” হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। এই গণহত্যার পিছনে সম্পূর্ণ ভূমিকা রাখে জেনারেল সুহার্তো। এমনকি, এই গণহত্যার তদন্তে সকল বাধা-বিপত্তিও জেনারেল সোহাতেরই তৈরি করা। এবং, এখনো পর্যন্ত এই ঘটনাকে স্বীকার করে নিয়েই একটি ন্যায্যতা দেয়ার প্রবণতা ইন্দোনেশিয়ান রাষ্ট্রের মধ্যে লক্ষ্য করা যায়। কিন্তু আরেকটি অদৃশ্য হাত ছিল যে এই গণহত্যাকে জ্বালানী দিয়েছিল। প্রকাশ হওয়া বিভিন্ন দলিল থেকে জানা যায় যুক্তরাষ্ট্র এই গণহত্যার ব্যাপারে সম্পূর্ণ জ্ঞাত ছিল। তারা এটাও জানতো যে হত্যাকান্ডের শিকার মানুষগুলো সম্পূর্ণ নির্দোষ ছিল। প্রকাশিত দলিলগুলো পর্যবেক্ষণ করে জন রোসা মন্তব্য করেন যে, যুক্তরাষ্ট্র এই সময় নীরব ভূমিকা নিয়েছিল এটি একটি মিথ্যা ফ্রেমিং। বাস্তবে, যুক্তরাষ্ট্র এই গণহত্যার সাথে অঙ্গাঙ্গিকভাবে জড়িত ছিল। তারা ইন্দোনেশিয়ার আর্মিকে কৌশলগতভাবে সাহায্য করেছিল এবং পিকেআই দমনের জন্য উৎসাহিত করেছিল। এই ঘটনাগুলোর পরেও,আজ পর্যন্ত কোনো বিচার প্রক্রিয়া শুরু হয়নি। তার সাথে যুক্ত হয়েছে আরেকটি বিতর্ক: এই ঘটনাকে আদৌ গণহত্যা বলা যাবে কিনা! কারণ জেনোসাইড কনভেনশন রাজনৈতিক গনহত্যাকে অপরাধ হিসেবেই স্বীকৃতি দেয় না।

২০১১ সালের ফেব্রুয়ারি, এই সময় লিবিয়ার বেনগাজীতে মানবাধিকার কর্মী ও আইনজীবী ফাতেহি তারবেলের গ্রেফতারের প্রতিবাদে গাদ্দাফি সরকার বিরোধী আন্দোলন শুরু হয়। লিবিয়ার সরকার আন্দোলন দমনের জন্য প্রাথমিক পদক্ষেপ গ্রহণ করা শুরু করে। খুব দ্রুত এই দমন রক্তাক্ত পর্যায়ে চলে যায়। জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদ শীঘ্রই এই ঘটনার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয় ও বিভিন্ন নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে। আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত পর্যন্ত মামলা গড়ায়। যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপিয়ান ইউনিয়নও আলাদা নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে এবং এপ্রিলে ন্যাটো গাদ্দাফির বাসভবনে বিমান হামলা করে এবং এই হামলায় গাদ্দাফির ছেলেসহ পরিবারের চারজন নিহত হয়। অতি দ্রুতই পশ্চিমা মিডিয়াতে গাদ্দাফিকে একজন উন্মাদ খুনি হিসেবে তুলে ধরার প্রক্রিয়া শুরু হয় এবং কিছু কিছু ক্ষেত্রে তার বিরুদ্ধে ‘গণহত্যা’র অভিযোগও আসতে। থাকে। অক্টোবর ২০, ২০১১-এ বিদ্রোহী গোষ্ঠী গাদ্দাফিকে হত্যা করে এবং পশ্চিমা বিশ্বে আনন্দের ঢেউ বয়ে যায়।

কিছুটা একই ঘটনা ঘটেছিল শ্রীলংকায়। ২০০৯ সালের শুরুর দিকে প্রায় ৪ লক্ষ তামিল জনগোষ্ঠীকে শ্রীলঙ্কান সরকার ‘নো ফায়ার জোন’ এর মধ্যে একত্র হতে বাধ্য করে। এরপর শুরু হয় নারকীয় হত্যাকান্ডের নতুন অধ্যায়। জাতিসংঘের রিপোর্ট অনুযায়ী যুদ্ধের শেষ কয়েক মাসে ৭০,০০০ বা তারও বেশি তামিলকে হত্যা করে শ্রীলঙ্কার রাষ্ট্রীয় বাহিনী। জানুয়ারি থেকে মে পর্যন্ত পুরো সময় জুড়ে জাতিসংঘ ও অন্যান্য আগ্রহী রাষ্ট্রগুলোর কাছে আহ্বান করা হয় যেন তারা দুই বাহিনীর সংঘর্ষে আটকে পড়া জনগণের জন্য “সুরক্ষার অধিকার” তত্ত্বের ভিত্তিতে সহযোগীতার হাত বাড়িয়ে দেয়। এই বিষয়ে ভারতীয় তামিলরা জাতিসংঘকে শ্রীলঙ্কার ঘটনায় হস্তক্ষেপের জন্য বারবার আহ্বান করলেও জাতিসংঘ তা করেনি। এই ঘটনার বিরুদ্ধে কোনো মামলাও করা হয়নি আন্তর্জাতিক আদালতে। সরকার যে অঞ্চলকে ‘নো ফায়ার জোন’ বলে ঘোষণা দিয়েছিল, তা মূলত তামিল বিরোধী ‘ফ্রি ফায়ার জোনে পরিণত হয়।

এইখানে স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে যে প্রায় একই ঘটনায় জাতিসংঘ এবং যুক্তরাষ্ট্র ও তার সহযোগী রাষ্ট্রসমূহ ভিন্ন অবস্থান নিয়েছে। হারমেন ও পিটারসন বলছেন, “পশ্চিমা রাষ্ট্রের সাথে ভালো সম্পর্ক রাখা সত্ত্বেও গাদ্দাফি নিজের স্বাধীন ক্ষমতা বজায় রেখে আফ্রিকার বিভিন্ন দেশকে পশ্চিমা আধিপত্যের বিরুদ্ধে সংঘবদ্ধ করেছিল।লিবিয়ার নতুন শক্তিতে অংশীদার হতে চীনকে আহ্বান করেছিল। কিন্তু শ্রীলঙ্কার সাথে পশ্চিমা দেশগুলোর সম্পর্ক সম্পূর্ণ ভিন্ন। যুক্তরাষ্ট্র ও তাদের সহযোগী রাষ্ট্র শ্রীলঙ্কার সিংহলী প্রধান সরকারের সাথে সম্পর্ক রেখেছে, যাতে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় তাকে ন্যাটোর হাত হিসেবে ব্যবহার করা যায়।”

শুধুমাত্র রাজনৈতিক উদ্দেশ্য হাসিলের জন্য একটি ঘটনাবে পশ্চিমা রাষ্ট্র ও মিডিয়া ‘গণহত্যা’ হিসেবে প্রচার করছে এবং অন্য একটি ঘটনাকে না দেখার ভান করেছে। গণহত্যা শ তখনই কোনো একটি ঘটনার সাথে জুড়ে দেয়া হচ্ছে খ সে ঘটনার কর্তা পক্ষ যুক্তরাষ্ট্রের সহায়ক হয় না বা হচে না। যেমনটি লিবিয়ার ঘটনায় হয়েছে। আবার কোনো গণহত্যার মতো চিহ্ন বহন করার পরেও তাকে ‘গণহত্য স্বীকৃতি দেয়া যায় না, কারণ কর্তা পক্ষ যুক্তরাষ্ট্রের সহযো মিডিয়া, একাডেমি এবং সামরিক, সকল ধরণের সহায়তা দিয়ে গণহত্যা কার্যকরে ভূমিকা রাখলেও যুক্তরাষ্ট্রের কখনো বিচয় হয়নি।

গণহত্যাকে শুধু জাতিসংঘের জেনোসাইড কনভেনশনের দৃষ্টিতে দেখলে সংকীর্ণতার সমস্যায় পতিত হওয়ার প্রবণতা দেখা দিবে। রোনাল্ড ক্রেমার অপরাধবিজ্ঞানীদের আইনের ফাঁদ থেকে বের হওয়ার পরামর্শ দিচ্ছেন। তার মতে, আইন তৈরি করে এবং অপরাধবিজ্ঞানীরা যদি এই আইনতে প্রশ্ন না করতে পারে বা এই আইনের বাইরে অপরাধকে চিহ্নিত করতে না পারে, তাহলে সমস্যার মূল কারণসমূহের বিশাল একটি অংশ তাদের দৃষ্টিসীমার বাইরেই থেকে যাবে।

লেখক :
শিক্ষার্থী,অপরাধবিজ্ঞান বিভাগ
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

সম্পর্কিত পোস্ট

সর্বশেষ পোস্ট



Shares