ইবনে জহুর
একটি ইটভাটা নির্মাণের আগে পরিবেশ অধিদফতর, জেলা প্রশাসন, বিএসটিআই, ভূমি অফিসসহ কয়েকটি স্থান থেকে নিতে হয় ছাড়পত্র।তবে চট্টগ্রামের রাঙ্গুনিয়ায় এসব নিয়মের তোয়াক্কা না করেই গড়ে উঠেছে দেড় শতাধিক ইটভাটা। কাঠ পুড়িয়ে, ফসলী জমি কেটে চালানো হচ্ছে এসব অবৈধ ইটভাটা।প্রশাসনের নাকের ডগায় চললেও এসব ইটভাটার বিরুদ্ধে নেয়া হচ্ছে না কোন ব্যবস্থা।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, রাঙ্গুনিয়ার উপজেলার বিভিন্ন পাহাড়ের পাদদেশে, শস্যভান্ডার হিসেবে পরিচিত গুমাইবিলে ও পরিবেশ সংরক্ষণে গড়ে তোলা পক্ষীশালার সবুজ বেষ্টনী ঘিরে একের পর এক গড়ে উঠেছে ইটভাটা। এরমধ্যে ইসলামপুর, দক্ষিণ রাজানগর এবং রাজানগর ইউনিয়নেই রয়েছে প্রায়ে ১১০টি ইটাভাটা।আবার এসব ইটভাটার মধ্যে ১৯ টি ছাড়া কোনটিরই নেই ছাড়পত্র। আবার ২০১৩ সালের পর এসব ইটভাটার কোনটারই ছাড়পত্র নবায়ন করেনি পরিবেশ অধিদপ্তর। সেই হিসেবে রাঙ্গুনিয়ার সব ইটভাটায় এখন অবৈধ।
২০১৩ সালে প্রণীত ইট প্রস্তুত, ইটভাটা স্থাপন ও নিয়ন্ত্রণ সংক্রান্ত্র আইনের ৪নং ধারায় লাইসেন্স ছাড়া ইট তৈরি নিষিদ্ধ করা হয়েছে। এতে বলা হয়েছে, ‘বলবৎ অন্য কোনো আইনে যা কিছুই থাকুক না কেন, ইটভাটা যে জেলায় অবস্থিত সেই জেলার জেলা প্রশাসকের থেকে লাইসেন্স গ্রহণ ছাড়া, কোনো ব্যক্তি ইটভাটায় ইট প্রস্তুত করিতে পারিবে না।’এ আইনে বলা হয়েছে, লাইসেন্স ছাড়া ইট উৎপাদন করলে অনধিক এক বছরের কারাদণ্ড বা অনধিক এক লাখ টাকা অর্থদণ্ড বা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত হইবে। তবে রাঙ্গুনিয়ার জেলা প্রশাসনের অনুমোদনহীন এসব ইটভাটার মালিকানায় স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও ক্ষমতাসীন দলের লোকজন থাকায় প্রশাসন তাদের বিরুদ্ধে নিচ্ছে না কোন ব্যবস্থা।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, রাঙ্গুনিয়া উপজেলায় সবচেয়ে বেশি ইটভাটা আছে ইসলামপুর ইউনিয়নে।এখানে আছে প্রায় ৭০টি অবৈধ ইটভাটা। স্থানীয় ইউপি চেয়ারম্যান সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী এবং ইউপি সদস্য মহিউদ্দীন তালুকদার মোহনের পশ্রয়ে চলে এসব ইটভাটা।এরমধ্যে সিরাজুল ইসলাম চৌধুরীর সরাসরি মালিকানায় আছে বেশ কয়েকটি ইটভাটা। এছাড়া ইটভাটা থেকে নিয়মিত মাসোহারা, ইটভাটার জন্য টপসয়েল বিক্রি, জ্বালানি কাঠ সরবরাহ-সবকিছু নিয়ন্ত্রণ করে এই দুই জনপ্রতিনিধি।
জানা যায়, চেয়ারম্যান সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সভাপতি। আর মহিউদ্দিন মোহন উপজেলা যুবলীগের উপ ত্রাণ বিষয়ক সম্পাদক। রাজনৈতিকভাবে খুব প্রভাব প্রভাবশালী হওয়ায় স্থানীয় গণমাধ্যম কর্মীরাও কিছু লেখার সাহস পায়না তাদের বিরুদ্ধে ।এছাড়া বিভিন্নভাবে তাদেরকে ম্যানেজ করা হয়।এরমধ্যে এইসব অবৈধ ইটভাটা নিয়ে প্রতিবেদন তৈরি করতে গেলে গত সোমবার একটি ইংরেজি দৈনিকের প্রতিবেদককে সিরাজুল ইসলাম চেয়ারম্যানের নির্দেশে জিম্মি করে বেধড়ক পিটিয়েছে ইউপি মেম্বার মোহন ও তার লোকজন।এই ঘটনায় ভুক্তভোগী সাংবাদিক বাদী হয়ে ইউপি চেয়ারম্যানসহ ৬-৭ জনকে আসামী করে একটি মামলা দায়ের করেন।মামলার ৪ নম্বর আসামীকে আটক করা হলেও বাকিরা এখনও ধরাছোঁয়ার বাইরে আছেন।
চেয়ারম্যান সিরাজুল ইসলাম চৌধুরীকে তার অবৈধ ইটভাটার বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি মানবজমিনকে বলেন, ‘শুধু আমার কথা বলছেন কেন।রাঙ্গুনিয়ার একটি ইটভাটারও অনুমোদন নেই।কথা বললে সবার গুলোর কথা বলেন।’
ইসলামপুরের একটি ইটভাটার ম্যানেজার নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, এখানকার ইটভাটার মালিকরা খুব প্রভাবশালী। আর প্রতিটি ইটভাটা থেকে স্থানীয় প্রশাসন, বন বিভাগ, পুলিশ ফাঁড়ি, বিট অফিসে মাসিক মাসোহারা পাঠানো হয়। এছাড়া কিছু স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও সাংবাদিক পরিচয়ধারী ব্যক্তিরাও মাসিক মাসোহারা নেন।যেকারণে অনুমোদন না থাকলেও কোন সমস্যা হয় না
শুধু ইসলামপুর নয়, উপজেলার রাজানগর, দক্ষিণ রাজানগর, হোচনাবাদের নিশ্চিন্তাপুর, লালানগরের শনখোলা বিল, চন্দ্রঘোনা ঘুরে দেখা গেছে একই অবস্থা। সংরক্ষিত বনাঞ্চল ও পাহাড়বেষ্টিত এলাকায় পাহাড় থেকে স্কেভেটর দিয়ে মাটি কেটে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে ইটভাটায়। ইটভাটার কালো বিষাক্ত ধোয়ায় স্বাস্থ্য ঝুঁকিতে উপজেলার লক্ষাধিক মানুষ। ইটভাটার জন্য কাঠ সংগ্রহ করতে রাঙ্গুনিয়ার সংরক্ষিত বন ও পাহাড় উজাড় করছে চক্রটি। এতে প্রাকৃতিক বনজ সম্পদ ধ্বংসের পাশাপাশি হুমকির মুখে পড়ছে পরিবেশ। এমনকি কোদালা বনবিটের সংরক্ষিত বনাঞ্চলের ৬০০ একর বনভূমিতে তৈরি পক্ষীশালার পাশেই গড়ে উঠেছে ১১টি ইটভাটা। চিমনির ধোঁয়ায় পক্ষীশালায় এখন পাখি নেই বললেই চলে।
অবৈধ ইটভাটার বিষয়ে জানতে চাইলে পরিবেশ অধিদপ্তর চট্টগ্রাম জেলার উপ পরিচালক ফেরদৌস জাহান বলেন, ইটভাটা করতে আমাদের ছাড়পত্র লাগে ঠিক।তবে ডিসি অফিস, বিএসটিআইসহ বেশ কয়েকটি সংস্থা থেকে লাইসেন্স নেয়া লাগে।কাজেই আমাদের পাশাপাশি এসব সংস্থার এখানে ভূমিকা থাকতে হয়।এরপরও আমরা দেখছি বিষয়টি ।এরমধ্যে সাতকানিয়াসহ বিভিন্ন জায়গায় অভিযান চালাচ্ছি।রাঙ্গুনিয়ায়ও অভিযান চালানো হবে।
রাঙ্গুনিয়া উপজেলার নির্বাহী কর্মকর্তা আতাউল গণি উসমানী বলেন, এখানে অবৈধ ইটভাটায় আমরা বিভিন্ন সময় অভিযান চালাতাম।তবে ইটভাটা মালিক সমিতি কিছুদিন আগে হাইকোর্টে রিট করেছিল।যে কারণে আমাদের অভিযান আপাতত বন্ধ আছে।
ইটভাটার বিষয়ে জানতে চাইলে চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসক আবুল বাশার মোহাম্মদ ফখরুজ্জামান বলেন, এই ইটভাটার বিষয়ে আমাদের পাশাপাশি আরও কয়েকটি সংস্থা জড়িত।সবার সাথে সমন্বয় করেই অভিযানে যেতে হয়।এছাড়া কিছু আইনি জটিলতা তো আছেই।এরপরও আমাদের ভ্রাম্যমাণ আদালত বিভিন্ন জায়গায় অভিযানে যাচ্ছে।আর রাঙ্গুনিয়ার এই ইটভাটার বিষয়ে কেউ স্পেসিফিক অভিযোগ করলে আমরা ব্যবস্থা নিবো।
