জালাল রুমি,বিশেষ প্রতিনিধি
১৭০০ খ্রিস্টাব্দের শেষের দিকের কথা।দক্ষিণ চট্টগ্রামের বাঁশখালী থানার অন্তর্গত সাধনপুর গ্রাম থেকে এসে শহরের কাট্টলীতে বসত গড়েন দুই ভাই ইমাম উদ্দীন ও আইন উদ্দীন। জ্ঞান গরিমা ও সামাজিক বিচারকার্য পরিচালনায় দক্ষতার কারণে ওই এলাকার স্থানীয়রা তাদেরকে পন্ডিত নামে ডাকতেন।এরপর ‘পন্ডিত বাড়ি’ নামে বিস্তৃত হতে থাকে তাদের পরিবারের আকার। বংশ পরম্পরায় বর্তমানে এই পন্ডিত বাড়িতে আছে ৮০ টি পরিবার।তবে পরিবারের অনেক সদস্য বৈবাহিক ও জীবিকার প্রয়োজনে ছড়িয়ে পড়েছেন বিভিন্ন জায়গায়। সেই বিশাল পরিবারের সহস্রাধিক সদস্য এবার মিলিত হয়েছেন একসাথে।হরেক রকম আয়োজনের মধ্য দিয়ে তাঁরা করেছেন পারিবারিক মিলনমেলা ।
নতুন বছরের প্রথম দিন (শনিবার) সকালে কুরআন তিলাওয়াতের মধ্য দিয়ে শুরু হয় এই মিলনমেলা ।যদিও শ্বশুর বাড়ি থেকে মেয়েরাসহ বিভিন্ন স্থানে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা পরিবারের অনেক সদস্য প্রোগ্রামের দু’একদিন আগেই শেকড়ের কাছে এসে অবস্থান নেন। তাদের হৈ – হুল্লোড় আর উচ্ছ্বাসে মুখর হয়ে ওঠে বাড়ির আশপাশ। দীর্ঘদিন পর পরিবারের সব সদস্যকে একসাথে পেয়ে আবেগাপ্লুত হয়ে যান অনেকে।
ব্যতিক্রমী এই পারিবারিক মিলনমেলায় ছিলো ২ টি পর্ব। সকালে প্রথম পর্বে ছিলো সম্মিলিত কোরআন তিলাওয়াত। সকাল এগারোটায় বাড়ীর মুরুব্বী আবদুল মোমেন পায়রা উড়ানোর মধ্য দিয়ে মিলনমেলার আনুষ্ঠানিক উদ্ভোধন করেন।এরপর ছিলো জাতীয় সঙ্গীত ও জাতীয় পতাকার প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন। পরিবারের সদস্য প্রাক্তন সরকারী কর্মকর্তা ফারুক চৌধুরীর সভাপতিত্বে এরপর বাড়ীর ছয় মুক্তিযোদ্ধা সদস্য ও কৃতিজনদের সংবর্ধনা দেয়া হয়।তাদের কর্মযজ্ঞ নিয়ে নির্মিত স্লাইড শো মোহবিষ্ট করে রাখে সবাইকে।দুপুরে একসাথে বসে ঐতিহ্যবাহী চাটগাঁইয়া মেজবানে ভুড়ি ভোজনের পর ছিলো খতমে কোরআন, মিলাদ মাহফিল ও বাড়ির প্রয়াত সদস্যদের কবর জেয়ারত।
বিকেল থেকে আবার শুরু হয় আনুষ্ঠানিকতা।এরমধ্যে ছিলো ১২ টি ইভেন্টে বিভিন্ন ক্রিড়া প্রতিযোগিতা। শিশুদের জন্য ছিলো গান ও চিত্রাঙ্কন প্রতিযোগিতা।এবারের এসএসসিও দাখিলে জিপিএ ফাইভ পাওয়া পরিবারের শিক্ষার্থীদের দেয়া হয় উপহার।বাড়ির বউদের নিয়ে দর্শনীয় ‘যেমন খুশি তেমন সাজো’র আয়োজন মুগ্ধ করে সবাইকে।
এরপর ব্যবস্থাপনা কমিটির আহ্বায়ক আব্দুল হান্নান চৌধুরীর সভাপতিত্বে শুরু হয় ২য় পর্বের অনুষ্ঠান।এতে সভাপতি ও ব্যবস্থাপনা কমিটির সদস্যরা পরিবারের কৃতিজনদের হাতে ক্রেস্ট তুলে দেন।
পরিবারের কৃতি সন্তানদের মধ্যে বাংলাদেশ পল্লী উন্নয়ন বোর্ডের সাবেক প্রজেক্ট ডিরেক্টর ওমর ফারুক চৌধুরী, বি সি এস(কর) কমিশনার মোহাম্মদ মাহমুদুর রহমান,ইনস্টিটিউট অব অ্যাপ্লাইড হেল্থ সাইন্স এর বিভাগীয় প্রধান ডাঃ সুলতানা চৌধুরী বক্তব্য রাখেন।
এরপর বাড়ীর সদস্যদের পরিবেশনায় অনুষ্ঠিত হয় জমজমাট সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান ও র্যাফেল ড্র।সর্বশেষ সভাপতির বক্তব্যের মধ্য দিয়ে রাত ১২ টায় পুর্নমিলনীর আনুষ্ঠানিকতা শেষ হয়।
এই বিষয়ে পুনর্মিলনীর আয়োজন কমিটির আহবায়ক আব্দুল হান্নান চৌধুরী বলেন, এখন সমাজ থেকে ধীরে ধীরে হারিয়ে যাচ্ছে পারিবারিক বন্ধন।শহর ও গ্রাম – দুটিতেই মানুষগুলো হয়ে যাচ্ছে আত্নকেন্দ্রীক। এমন একটি অবস্থায় পারিবারিক মিলনমেলা করেছে আমাদের পন্ডিত পরিবার। পরিবারের প্রায় সব সদস্যকে এক সাথে পেয়ে মনটা ভরে গেছে। ইনশাআল্লাহ আমরা প্রতিবছর এমন আয়োজন করবো।আর আশা করছি আমাদের দেখাদেখি অন্যরা এইরকম উদ্যোগ নেবেন।কারণ পারিবারিক বন্ধন শক্ত থাকলেই টিকে থাকলে সমাজ।
