বুধবার, ২৫ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ১৩ ফাল্গুন ১৪৩২

চট্টগ্রামের আদালতে মামলার জট,চরম ভোগান্তিতে বিচার প্রার্থীরা

প্রকাশ: ২৮ ডিসেম্বর ২০২১ | ৮:১৯ অপরাহ্ণ আপডেট: ২৪ এপ্রিল ২০২২ | ১০:৫৫ অপরাহ্ণ
চট্টগ্রামের আদালতে মামলার জট,চরম ভোগান্তিতে বিচার প্রার্থীরা

জালাল রুমি, বিশেষ প্রতিনিধি

চট্টগ্রামের আদালতগুলোতে পড়েছে মামলার জট । এখানের ছোটবড় ৯০ টি আদালতে ঝুলে আছে প্রায় আড়াই লক্ষ মামলা। যার ফলে চরম ভোগান্তিতে পড়েছেন বিচারপ্রার্থীরা । এদের অনেকেই ছেড়ে দিয়েছেন বিচার পাওয়ার আশা। আবার মামলার সুরহা না হওয়ায় অন্যরকম এক অনিশ্চয়তায় দিন পার করছে বিবাদী পক্ষ। যার দৃশ্যত প্রভাব মিলেছে চট্টগ্রাম কেন্দ্রীয় কারাগারে ।এখানে ধারণক্ষমতার প্রায় ৪ গুণ কয়েদি আটকে আছে।

জেলা আইনজীবী সমিতি সূত্রে জানা যায় , চট্টগ্রামের ১৪টি জজশিপে এখন ২ লাখ ৪১ হাজার মামলা বিচারাধীন আছে । এরমধ্যে চট্টগ্রাম জেলা ও দায়রা জজ আদালতে বিচারাধীন আছে ১ লাখ ২৫ হাজার ৫৪৬ টি মামলা ।মামলা জটের তালিকায় দ্বিতীয় স্থানে আছে মহানগর দায়রা জজ আদালত। চলতি বছরের নভেম্বর পর্যন্ত এখানে পড়ে আছে ৪১ হাজার ৩৯৪ টি মামলা । ম্যাট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে এখন ৩৫ হাজার ১৫৭ টি মামলা বিচারাধীন আছে। এরপর চীপ জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে বিচারাধীন আছে ১৩ হাজার ৫১২টি মামলা । অর্থঋণ আদালতে গেলো নভেম্বর পর্যন্ত ৫ হাজার ১৮৪ টি মামলা বিচারাধীন রয়েছে। বাকি আদালত গুলোতেও এভাবে জট লেগে আছে মামলার।

‘পরিসর ও গুরুত্ব অনুসারে যেখানে আদালত সংখ্যা এখন যা আছে তার দ্বিগুণ করা দরকার, সেখানে চট্টগ্রামের ৯০ টি আদালতের অনেকগুলোতে অধিকাংশ সময় বিচারক থাকেন না।অনেক বিচারক বিভিন্ন কারণে নিয়মিত ছুটি কাটান।বিচারক সংকট ছাড়াও সাক্ষীর অনুপস্থিতি, পুলিশের ভুল বা পক্ষপাতমূলক তদন্ত রিপোর্ট, আর আদালতের পদ্ধতি সম্পর্কে ওয়াকিবহাল না থাকায় বিচারপ্রার্থীরা অনেক সময় ভোগান্তিতে পড়েন। অনেক সময় মামলার ব্যয় নির্বাহ করতে না পেরে বাদি অনুপস্থিত থাকেন।এসব কারণে মামলা গুলোতে দীর্ঘসূত্রিতা তৈরি হচ্ছে।’ ঠিক এমনটি বলছিলেন চট্টগ্রাম জজ আদালতের শিক্ষানবিশ আইনজীবী আকরাম হোসেন।

জানা যায়, চট্টগ্রামের আদালতে মামলা জটের পেছনে প্রধানত দায়ী হচ্ছে দীর্ঘদিন ধরে বিচারক শূন্যতা।চট্টগ্রামে গুরুত্বপূর্ণ বিভাগীয় স্পেশাল জজ আদালতসহ অন্তত ১৪টি আদালতে বিচারক ছিলোনা কয়েক বছর ধরে ।যদিও গত মাসে জেলা দায়রা জজ আদালতের একটি ছাড়া সবকটি আদালতে বিচারক নিয়োগ দেয়া হয়েছে।

জানা যায়, দীর্ঘদিন ধরে বিচারক না থাকায় একজন বিচারক একাধিক আদালতের চার্জে দায়িত্ব পালন করেছেন।এদের অনেকে আবার কিছুক্ষণ এজলাসে থেকে চলে যেতেন। প্রতিদিন নিয়মিত নতুন নতুন মামলা হয়।আর বিচারের জন্য প্রস্তুত হলেও মামলা আর নিষ্পত্তি হয়না । তাছাড়া দেওয়ানি আদালতগুলোতে একই দিনে পাঁচটির বেশী মামলা সাক্ষ্য গ্রহণের সুযোগ থাকেনা। ফলে বিপুল সংখ্যক মামলা বিচারের জন্য তৈরি হলেও আর শেষ হয়নি।

এদিকে আদালতে মামলার জটের পেছনে এতোদিন ধরে চলা বিচারক সংকটের পাশাপাশি আরো কয়েকটি বিষয়কে দায়ী করছেন আদালত সংশ্লিষ্টরা। যথাযথ তথ্য ছাড়া মামলা দায়ের, বাদীপক্ষের বারবার আর্জি সংশোধন ,মামলা চলাকালীন অন্তর্বর্তীকালীন আদেশ,দেরিতে মামলার সমন ও নোটিশ জারি,এডভোকেট কমিশনের নিয়োগে বিলম্ব, বারবার কমিশনের দরখাস্ত করা ও কমিশনার নিয়োগ, কমিশন রিপোর্ট দাখিলে অস্বাভাবিক বিলম্বের কারণে মামলায় দীর্ঘসূত্রতা তৈরি হচ্ছে।তদন্ত প্রতিবেদন দিতে পুলিশের অবহেলাকেও মামলার দীর্ঘসূত্রতার পেছেনে দায়ী করা হচ্ছে।আবার অনেক সময় সংশ্লিষ্ট আদালতের প্রসিকিউটর ও আইনজীবীরা মক্কেল থেকে অতিরিক্ত টাকা পাওয়ার আশায় মামলার দীর্ঘসূত্রিতা করেন বলে অভিযোগ উঠে। করোনা কালীন সময়ে দীর্ঘদিন ধরে স্বশরীরে আদালত কার্যক্রম বন্ধ থাকার কারণেও এই জট বড় হয়েছে বলে জানাচ্ছেন আদালত সংশ্লিষ্টরা।

মামলা জটের বিষয়ে জেলা আইনজীবী সমিতির সাবেক সভাপতি ও চট্টগ্রাম মহানগর আওয়ামী লীগের আইন বিষয়ক সম্পাদক এডভোকেট শেখ ইফতেখার সাইমুল চৌধুরী বলেন , মামলা জটের প্রধান কারণ হচ্ছে এতোদিনের বিচারক শূণ্যতা।আর পরিসর অনুসারে কোর্ট সংখ্যাও কম।অনেক আদালতে কোর্ট অফিসার নেই।বিভিন্ন সময় মামলার তদবির কারীদের কারসাজির কারণেও কোর্টে জট তৈরি হচ্ছে।

চট্টগ্রামের এই সিনিয়র আইনজীবী বলেন,এই বিভাগের ৮ টি জেলার জন্য সাইবার আদালত মাত্র একটি। ক্রমবর্ধমান সাইবার অপরাধ ঠেকাতে জেলা ভিত্তিক আরো ৪-৫ টি সাইবার আদালত গঠন করা দরকার। দেশের বাণিজ্যের প্রাণকেন্দ্র এই চট্টগ্রাম।আর এখানে অর্থঋণ আদালত আছে মাত্র একটি।যেখানে কমপক্ষে ৫ টি আদালত থাকা দরকার।যেকারণে হাজার হাজার মামলা ফাইল হয়ে আটকে আছে।অতিরিক্ত চীফ জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতের সংখ্যা উপজেলার অনুপাতে বাড়ানো উচিত। তাহলে মামলা ট্রায়াল স্টেজে গিয়ে দ্রুত নিষ্পত্তি হবে।

এই বিষয়ে জেলা আইনজীবী সমিতির সাবেক সভাপতি এডভোকেট এনামুল কবির এই প্রতিবেদককে বলেন, এখানে মামলা জটের প্রধান কারণ হচ্ছে আদালত সংখ্যা কম থাকা।চট্টগ্রামের গুরুত্ব অনুসারে আদালত সংখ্যা বাড়ানো দরকার।এটি নিয়ে আমরা দীর্ঘদিন ধরে মন্ত্রণালয়ে জানিয়ে আসছি।কিন্তু যেভাবে আশ্বাস দেয়া হয়,সেভাবে কাজ হয়না।আর যে আদালতগুলো আছে, সেখানেরও অনেক জায়গায় দীর্ঘদিন ধরে থাকেনা বিচারক।যেসব কারণে মামলার জট পাকছে।

এই আইনজীবী নেতা বলেন, ‘এখনকার এভাবে মামলা জটের আরো একটি বড় কারণ হচ্ছে রাজনৈতিক মামলা।নিয়মিত গায়েবি মামলা হচ্ছে।কোথাও একটি ঢিল পড়লেও কয়েকটি মামলা হয়ে যায়।আর অন্তত এই মামলার সমানতালে তো বিচারক বাড়ানো দরকার।কিন্তু তা হচ্ছে না।আর এসব রাজনৈতিক মামলায় পাওয়া যায় না সাক্ষী, বাদী পক্ষের উপস্থিতিও থাকেনা তেমন।যে কারণেও মামলার জট পাকছে।

সম্পর্কিত পোস্ট

সর্বশেষ পোস্ট



Shares