জালাল রুমি, বিশেষ প্রতিনিধি
এক সময়ের চরম প্রতাপশালী জয়নাল হাজারী মারা গেছেন। মহান মুক্তিযুদ্ধে অসামান্য ভূমিকা রাখলেও স্বাধীনতা পরবর্তী সময়ে এসে নানা বিতর্কিত কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়েন ফেনী জেলায় জম্ম নেয়া এই রাজনীতিক। হাজারীর বিরুদ্ধে যেন শেষ ছিলোনা অভিযোগের। শুধুমাত্র ১৯৯৬ থেকে ২০০১ সাল পর্যন্ত সময়কালের ফেনীতে প্রায় ৩ শতাধিক খুন হয়।বলা হয়ে থাকে এর অর্ধেকেরই বেশি হাজারীর অনুসারীদের হাতে সংগঠিত হয়। তখন তার বিরুদ্ধে সাধারণ মানুষ তো দুরের কথা, গণমাধ্যম কর্মীরাও কথা বলার সাহস করতো না।এরমধ্যে একটি প্রতিবেদন তার বিরুদ্ধে যাওয়ায় হাজারীর নির্দেশে টিপু সুলতান নামে সেইসময়কার স্থানীয় এক সাংবাদিককে মধ্যযুগীয় কায়দায় নির্যাতন করা হয়।বিষয়টি সেসময় সারাদেশে বেশ আলোচিত হয়।
মুলত টিপু সুলতানকে নির্যাতনের ঘটনা দেশ-বিদেশে প্রচার হওয়ার বেশ বেকায়দায় পড়েন হাজারী।একপর্যায়ে বিচারপতি লতিফুর রহমানের তত্বাবধায়ক সরকার ক্ষমতায় আসার পর ফেনী থেকে ফটিকছড়ি হয়ে ভারতে পালিয়ে যেতে বাধ্য হন তিনি। আর এই পালিয়ে যাওয়ার ঘটনার মধ্য দিয়েই মুলত ফেনীর রাজনীতিতে জয়নাল হাজারী অধ্যায়ের পরিসমাপ্তি ঘটে।
বিএনপি সরকারের আমলে একটি খুনের ঘটনায় হাজারীর বিরুদ্ধে ফাঁসির রায়ও হয়। এছাড়া ২০০৪ সালে দল থেকেও বহিষ্কার করা হয় তাকে।যদিও নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পর দেশে ফেরেন হাজারী।এরপর একে একে সব মামলা থেকে দ্রুত খালাস পেয়ে যান।তবে আগের সেই ক্ষমতা আর ফিরে পাননি তিনি।এমনকি এক সময়কার তার একান্ত অনুসারী নিজাম উদ্দিন হাজারীর কারণে নিজের এলাকা ফেনীতে ফিরতেই পারেননি তিনি।যদিও গতবছর তাকে আওয়ামী লীগের উপদেষ্টা মন্ডলীর সদস্য করা হয়।তবে এই পদের দৃশ্যতঃ কোন কাজ ছিলো না।
এদিকে সাংবাদিক টিপু সুলতানের ওপর নির্যাতন করে আলোচনায় আসা জয়নাল হাজারী শেষ বয়সে এসে নিজেই সাংবাদিক হয়ে উঠার চেষ্টা করেন। রাজনৈতিক ক্ষমতা হারিয়ে অনেকটা দন্তহীন বাঘ হয়ে যাওয়া ফেনীর একসময়ের এই আলোচিত রাজনীতিক ‘ হাজারিকা প্রতিদিন’ নামে একটি পত্রিকা প্রকাশ করেন। মৃত্যুর আগ পর্যন্ত তিনি এই পত্রিকার সম্পাদক ছিলেন।
এখন জেনে নেই সাংবাদিক টিপু সুলতানের সাথে সেদিন কি করেছিলেন জয়নাল হাজারী।সেসময় বেসরকারি সংবাদ সংস্থা ইউনাইটেড নিউজ অব বাংলাদেশের ফেনী প্রতিনিধি হিসেবে কাজ করতেন সাংবাদিক টিপু সুলতান।তিনি ২০০১ সালের জানুয়ারিতে ফেনীর ওমরপুরের সুলতানা মেমোরিয়াল জুনিয়র গার্লস স্কুল-এর বিভিন্ন সমস্যা নিয়ে একটি প্রতিবেদন তৈরি করেন।প্রতিবেদনে এই স্কুলের বিভিন্ন অনিয়মের সাথে স্থানীয় সাংসদ জয়নাল হাজারীর সম্পৃক্ততা আছে বলে উল্লেখ করেন।
এদিকে প্রতিবেদনটি প্রকাশ হওয়ার ৮ দিন পর ২৫ জানুয়ারি ১৪- ১৫ জন মুখোশধারী এসে টিপু সুলতানকে অপহরণ করে নিয়ে যায়।এরপর তারা রড, লাঠি-সোটা, ক্রিকেট ব্যাট তাকে প্রচণ্ড মারধর করে হাত – পা ভেঙ্গে দেয়।আর সেটি হাজারীর নির্দেশ ছিলো বলে তাকে জানানো হয় হয়।একপর্যায়ে তাকে অচেতন অবস্থায় রাস্তার পাশে ফেলে দেন।
এদিকে ঘটনার পর মুমূর্ষু টিপু সুলতানকে উদ্ধার করে প্রথমে ফেনীর হাসপাতালে পাঠানো হয়।সেখানে হাজারীর ক্যাডাররা তাকে চিকিৎসা নিতে দেননি।একপর্যায়ে ঢাকার পঙ্গু হাসপাতালে ভর্তি করানো হলে সেখানেও বাঁধা দেয়া হয়। পরে তাকে উন্নত চিকিৎসার জন্য প্রথমে থাইল্যান্ড ও পরে ভারতে পাঠানো হয়। টিপু সুলতানের চিকিৎসার জন্য সেসময় সাংবাদিকদের পাশাপাশি বিভিন্ন সংস্থা এগিয়ে আসেন। এসময় তার চিকিৎসার ব্যয় মেটাতে গঠন করা হয় বিশেষ তহবিল।যেখানে বিভিন্ন পেশার মানুষজন অনুদান দেন।
সাংবাদিক টিপু সুলতানের ওপর হামলার বিষয়টি সেসময় বিভিন্ন আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমেও ফলাও করে প্রকাশ করা হয়।মেয়াদের শেষ পর্যায়ে এসে বিষয়টি নিয়ে বেশ বিপাকে পড়েছিল তৎকালীন শেখ হাসিনার সরকার। সেসময় এ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের পক্ষে থেকে হাজারীর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে সরকারকে চিঠি দেয়া হয়েছিল।
তবে সেসময় টিপু সুলতানের পক্ষ থেকে থানায় মামলা করতে চাইলে পুলিশ মামলা নেননি।শেষ পর্যন্ত আদালতে গিয়ে মামলা করা হলেও পুলিশ তদন্ত করতে অস্বীকার করেন।যদিও আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতা থেকে যাওয়ার পর পুলিশ এই হামলার তদন্ত শুরু করে।২০০৩ সালের ১৬ এপ্রিল এই ঘটনায় হাজারীসহ ১২ জনের বিরুদ্ধে চার্জশিট দেয়া হয়।পরে এই ঘটনায় মোট ৮ জনকে আটক করা হয়। যদিও পরবর্তীতে ক্ষমতার পালাবদলের সাথে মামলাটি শেষ করে সব আসামীকে খালাস দেয়া হয়।
