বৃহস্পতিবার, ২৬ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ১৪ ফাল্গুন ১৪৩২

এ যেন আরেক বৈরুত

প্রকাশ: ৬ জুন ২০২২ | ৫:০০ পূর্বাহ্ণ আপডেট: ৬ জুন ২০২২ | ৫:০৫ পূর্বাহ্ণ
এ যেন আরেক বৈরুত

বিশেষ প্রতিনিধি

২০২০ সালের ৪ঠা আগস্ট। হঠাৎ এক বিস্ফোরণে কেঁপে উঠে লেবাননের বৈরুত নৌবন্দর । বিস্ফোরণের সাথে সাথে সেখানে থাকা একটা কন্টেইনারে আগুন ধরে যায়। পরে আগুন একটা থেকে আরেকটি কন্টেনারে ছড়িয়ে পড়ে। ফায়ার সার্ভিসের কয়েক হাজার কর্মী এসেও আগুন নেভাতে পারছিলো না। কন্টেইনারের মুহুর্মুহু বিস্ফোরণে কেঁপে উঠছিলো পুরো বৈরত শহর। শেষ পর্যন্ত প্রায় ৩০ ঘন্টায় শতাধিক কন্টেইনার জ্বালিয়ে ক্ষ্যান্ত দেয় সর্বনাশা সেই আগুন। ওই দুর্ঘটনায় ২ শতাধিক মানুষ মারা যায়। আর আহত হয় ৬ হাজার মানুষ। পরে সরকারের পক্ষ থেকে জানানো হয়, বন্দরের একটা গুদামঘরে রাখা অ্যামোনিয়াম নাইট্রেট থেকে এই ভয়াবহ দুর্ঘটনা ঘটে।

সীতাকুণ্ডের বেসরকারি কন্টেইনার ডিপোতে শনিবারের রাতের বিস্ফোরণ অনেকটা বৈরুতের ঘটনাই মনে করিয়ে দিচ্ছে।যদিও বৈরুতের ঘটনাকে দেশটির সরকার বিরোধীরা ইসরাইলি গোয়েন্দা সংস্থা মোসাদের ষড়যন্ত্র বলে অভিহিত করেছেন।

জানা যায়,শনিবার রাত সাড়ে ১০টার দিকে বিস্ফোরণের পর শুরু হওয়া আগুন আজ সোমবার সকালে এই রিপোর্ট লেখা পর্যন্ত এখনো বন্ধ হয়নি। ৪৯ জনের পোড়া লাশ উদ্ধার করা হয়েছে।৪ শতাধিক মানুষ দগ্ধ হয়েছেন।এদের মধ্যে অর্ধশতাধিকের অবস্থা আশঙ্কাজনক। ফায়ার সার্ভিস কর্মীসহ অনেকেই নিখোঁজ আছেন এখনও। পুরো ডিপো এলাকা যেন একটা যুদ্ধপরবর্তী ধ্বংসস্তুপ।

এদিকে আগুন নিয়ন্ত্রণে অনেকটা হিমশিম খাচ্ছেন ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা।আগুন নিভাতে গিয়ে নিজেদের অনেক সহকর্মী নিহত হওয়ায় ফায়ার সার্ভিসের কর্মীদের মধ্যেও আতঙ্ক তৈরি হয়েছে।কনটেইনারে থাকা হাইড্রোজেন পারক্সাইড থেকে এই বিষ্ফোরণের ঘটনা ঘটেছে বলে জানা যায়।

ঘটনাস্থলে থাকা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সূত্রে জানা যায়, ডিপোর ভেতরে ৫০০ মিটারের একটি টিনের শেড রয়েছে। এই শেডের ভেতরে হাইড্রোজেন পারক্সাইড নামে এক ধরনের কেমিক্যাল রয়েছে। এগুলো চট্টগ্রামের হাটহাজারীর ঠান্ডাছড়ির আল-রাজী কেমিক্যাল কমপ্লেক্সে উৎপাদন করা। রপ্তানির জন্য এগুলো বেশকিছু দিন আগে কনটেইনারে করে এ ডিপোতে রাখা হয়।

বেসরকারি কনটেইনার মালিকদের সংগঠন বিগড়াও বলছে একই কথা।বিগড়া সভাপতি নুরুল কাইয়ুম খান জানিয়েছেন, ওই ডিপোতে হাইড্রোজেন পার অক্সাইডের একটি চালান ছিল। ওইসব রাসায়নিক দাহ্য পদার্থ মূলত অ্যাভিয়েশন শিল্পখাতে ব্যবহৃত হয়। উচ্চ চাপে এই রাসায়নিক বোতলজাত করা হয়ে থাকে। এই হাইড্রোজেন পার অক্সাইড থেকেই বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটেছে।

এইদিকে ভয়াবহ এই বিস্ফোরণ বিশেষ কোন গোষ্ঠীর নাশকতা কিনা সন্দেহ পোষণ করেছেন স্মার্ট গ্রুপের জিএম মেজর (অব.) শামসুল হায়দার সিদ্দিকী। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে এক লাইভ ভিডিওতে তিনি বলেন, বিএম কনটেইনার আমাদের একটি অঙ্গ প্রতিষ্ঠান। আমাদের কনটেইনার ডিপোতে ভয়াবহ আগুন এবং হতাহতের জন্য আমরা গভীর দুঃখ প্রকাশ করছি এবং এই মুহূর্তে নিহতদের পরিবারের প্রতি গভীর সমবেদনা জানাচ্ছি। এই ঘটনায় আমাদের কর্তৃপক্ষ ৫ সদস্যের তদন্ত কমিটি গ্রহণ ও সরকারের গঠিত তদন্ত কমিটিকে সর্বোচ্চ সহায়তা প্রদানের ঘোষণা দিচ্ছি। এছাড়া ঘটনাটি দুর্ঘটনা নাকি নাশকতা বা কোন প্রতিপক্ষ দ্বারা স্যাবোটাস ঘটেছে কিনা তা খতিয়ে দেখার জন্য সরকারের প্রতি অনুরোধ জানাচ্ছি। আমাদের এই চরম দুর্দিনে আপনাদের সহযোগিতা কামনা করছি।’

হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিজিটিং সাইনটিস্ট হিসেবে বাংলাদেশি গবেষক ড. আবু আলী ইবনে সিনা জাতীয় একটা গণমাধ্যমকে বলেন, ‘চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডে বিএম কনটেইনার ডিপোতে আগুন ও বিস্ফোরণের ধরন ভিন্ন বার্তা দিচ্ছে। এটি আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসী চক্রের নাশকতার প্রচেষ্টাও হতে পারে। এমন ধারনা উড়িয়ে দেয়া যায় না। ‘

পৃথিবীর বিখ্যাত দুই ক্যান্সার ইনস্টিটিউট, হার্ভার্ড ইউনিভার্সিটির ডানা ফারবার ক্যান্সার ইনস্টিটিউট এবং কলম্বিয়া ইউনিভার্সিটি হার্বার্ট আরভিন কম্প্রিহেনসিভ ক্যান্সার সেন্টারে কর্মরত আবু আলী ইবনে সিনা বলেন, হাইড্রোজেন পার অক্সাইডকে প্রাথমিক ভাবে বিস্ফোরণের সুচনার জন্য চিহিৃত করা হলেও – বিষয়টির বৈজ্ঞানিক ব্যাখা খুবই দূর্বল। আমি হার্ভার্ডের ল্যাবরেটরিতে কর্মরত বেশ কিছু গবেষকদের সাথে আলাপ করেও ফায়ার সার্ভিস কর্মকর্তার এমন বক্তব্যের যৌক্তিকতা খুঁজে পাই নি।এই হাইড্রোজেন পার অক্সাইড কোন জৈব কেমিক্যালের সংস্পর্শে আসলে বিকট শব্দে বিস্ফোরণ ঘটতে পারে, নতুবা নয়। ‘

ভয়াবহ এই বিষ্ফোরণের সাথে নাশকতার সম্পৃক্ততা আছে কিনা জানতে চাইলে বিষ্ফোরক পরিদপ্তরের সহকারী পরিদর্শক মেহেদী ইসলাম খান সাম্পান নিউজকে বলেন ‘ বিষয়টি ঠিক বলা যাচ্ছে না।এটা তদন্তাধীন বিষয়।আপনি প্রয়োজনে আমাদের ঊর্ধ্বতনদের সাথে কথা বলেন।তবে প্রাথমিকভাবে যতটুকু জেনেছি হাইড্রোজেন পারঅক্সাড থেকে ওই বিষ্ফোরণ ঘটেছে। এটি একটা শক্তিশালী
রাসায়নিক যৌগ। উত্তপ্ত করা হলে তাপীয় বিয়োজনে হাইড্রোজেন পারক্সাইড বিস্ফোরক হিসেবে আচরণ করে।যদিও এই কনটেইনার ডিপোতে এই পদার্থ রাখার জন্য আমাদের কাছ থেকে কোন অনুমতি নেয়া হয় নি।

এদিকে সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে তথ্যমন্ত্রী ড. হাছান মাহমুদ বলেন, ‘প্রধানমন্ত্রী নিজে বিষয়টি দেখছেন, সবাইকে প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দিয়েছেন। আমাদের দলের নেতাকর্মীদের নির্দেশনা দেয়া আছে যেখানে রক্ত লাগে সেখানে রক্ত দেয়া এবং সার্বিক সহযোগিতা করার জন্য। যুবলীগ, ছাত্রলীগ, স্বেচ্ছাসেবকলীগসহ আওয়ামী লীগ ও অন্যান্য সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মীরা ঝাঁপিয়ে পড়েছে। বিষয়টি দুর্ঘটনা না নাশকতা সেটিও খতিয়ে দেখা হবে। কারণ এতবড় একটি ঘটনা কি সত্যিকার অর্থে দুর্ঘটনা না কি নাশকতা, সেটিও খতিয়ে দেখা প্রয়োজন।’

সম্পর্কিত পোস্ট

সর্বশেষ পোস্ট



Shares