বৃহস্পতিবার, ২৬ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ১৪ ফাল্গুন ১৪৩২

ফটিকছড়ির হাজারিখিল অভয়ারণ্যে বিলুপ্তপ্রায় প্রাণীদের শেষ আশ্রয়

প্রকাশ: ২ নভেম্বর ২০২৫ | ১:৪৪ অপরাহ্ণ আপডেট: ২ নভেম্বর ২০২৫ | ১:৪৪ অপরাহ্ণ
ফটিকছড়ির হাজারিখিল অভয়ারণ্যে বিলুপ্তপ্রায় প্রাণীদের শেষ আশ্রয়

মো: আজগর আলী, ফটিকছড়ি

চট্টগ্রামের ফটিকছড়ি উপজেলার হাজারিখিল বন্যপ্রাণী অভয়ারণ্য এখন বিলুপ্তপ্রায় প্রাণীদের শেষ আশ্রয়ে পরিণত হয়েছে। পাহাড়, ছড়া আর ঘন সবুজ বনভূমিতে ঘেরা এ বন যেন প্রকৃতির এক জীবন্ত মঞ্চ— যেখানে এখনো টিকে আছে মায়া হরিণ, অজগর, বুনো বিড়াল, গেছো বাঘ, খেকশিয়াল, কচ্ছপসহ নানা প্রজাতির পাখি এবং সবচেয়ে আশার বিষয়, মহাবিপন্ন বনরুইয়ের অস্তিত্ব।

প্রত্যক্ষদর্শীদের মতে, অভয়ারণ্যের কালাপানি ছড়া ও পার্শ্ববর্তী পাহাড়ে এসব বিরল প্রাণীর দেখা মেলে প্রায়ই। সূর্যাস্তের পর নিস্তব্ধ অন্ধকারে তাদের অবাধ বিচরণে যেন প্রকৃতি ফিরে পায় নিজের ছন্দ।

বিশেষজ্ঞরা জানান, বনরুই সাধারণত ৮ থেকে ১০ ফুট গভীর গর্তে বাসা বানিয়ে থাকে এবং রাতে খাবারের সন্ধানে বের হয়। পিঁপড়া, উইপোকা ও ক্ষুদ্র কীটপতঙ্গই এদের প্রধান খাদ্য।

বাংলাদেশের বন্যপ্রাণ সংরক্ষণের ইতিহাসে হাজারিখিল অভয়ারণ্য এক গুরুত্বপূর্ণ স্থান দখল করেছে। ফটিকছড়ি ও খাগড়াছড়ির রামগড় উপজেলার সীমান্তজুড়ে বিস্তৃত এ বনভূমি এখন মহাবিপন্ন প্রজাতির প্রাণীদের নিরাপদ আশ্রয়স্থল হিসেবে পরিচিত। একই সঙ্গে এটি সম্ভাবনাময় একটি ইকো-ট্যুরিজম কেন্দ্র হিসেবেও বিবেচিত হচ্ছে।

আইইউসিএন বাংলাদেশ ২০১৫ সালে প্রকাশিত ‘রেড লিস্ট অব বাংলাদেশ’-এ দেশীয় দুই প্রজাতির বনরুই—চায়না বনরুই ও ভারতীয় বনরুই—কে ‘মহাবিপন্ন’ হিসেবে ঘোষণা করে। দেশের অন্যান্য এলাকায় প্রজাতিটি প্রায় বিলুপ্ত হলেও হাজারিখিলের পাহাড়ি অরণ্যে এখনো তাদের অস্তিত্ব টিকে আছে।

বন বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, ১,১৭৭ দশমিক ৫৩ হেক্টর পাহাড়ি এলাকাজুড়ে বিস্তৃত এই অভয়ারণ্য চট্টগ্রাম শহর থেকে প্রায় ৪৫ কিলোমিটার উত্তরে অবস্থিত। ২০১০ সালের ৬ এপ্রিল সরকার এটিকে আনুষ্ঠানিকভাবে বন্যপ্রাণী অভয়ারণ্য ঘোষণা করে।

অভয়ারণ্যের রেঞ্জ কর্মকর্তা সিকদার আতিকুর রহমান বলেন, হাজারিখিল দেশের বন্য জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণের এক বিরল পাহাড়ি অঞ্চল। বর্তমানে একমাত্র এখানেই মহাবিপন্ন বনরুইয়ের দেখা মেলে। বিশেষ করে কালাপানি ছড়া পয়েন্টে সন্ধ্যার পর বনরুই অবাধে বিচরণ করে।

বন্যপ্রাণী গবেষক ও পরিবেশবিদ অধ্যাপক ড. ইদ্রিস আলী বলেন, হাজারিখিল অভয়ারণ্য এখন বন্যপ্রাণ সংরক্ষণের এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। এখানে প্রায় ১৫০ প্রজাতির পাখি, ২৫ প্রজাতির স্তন্যপায়ী, ২৫ প্রজাতির সরীসৃপ ও ৮ প্রজাতির উভচর প্রাণী নিরাপদে বসবাস করছে। পাশাপাশি রয়েছে প্রায় ২৫০ প্রজাতির উদ্ভিদ। এটি শুধু প্রাণীদের আবাস নয়, প্রকৃতির ভারসাম্য রক্ষার এক জীবন্ত দুর্গ।

তিনি আরও বলেন, বনরুইয়ের মতো বিলুপ্তপ্রায় প্রাণী এখানে টিকে আছে—এটাই আমাদের জন্য আশার আলো। এই সংরক্ষণ কার্যক্রম টিকিয়ে রাখতে হলে স্থানীয় জনগণ ও প্রশাসনের সমন্বিত উদ্যোগ অপরিহার্য।

ফটিকছড়ি উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) ও এক্সিকিউটিভ ম্যাজিস্ট্রেট মো. নজরুল ইসলাম বলেন, বাংলাদেশে যেখানে দ্রুত বিলুপ্ত হচ্ছে বন্যপ্রাণ, সেখানে হাজারিখিল যেন প্রকৃতির এক শেষ দুর্গ। বনরুইয়ের মতো প্রাণ এখনো এখানে জীবনের স্পন্দন ছড়াচ্ছে। বন বিভাগ, স্থানীয় জনগণ ও পরিবেশবিদদের সম্মিলিত প্রচেষ্টা অব্যাহত থাকলে আমরা আবারও ফিরে পেতে পারি আমাদের হারানো জীববৈচিত্র্যের গৌরব।

প্রকৃতিপ্রেমী ও গবেষকরা মনে করেন, হাজারিখিল বর্তমানে বাংলাদেশের একমাত্র এলাকা যেখানে বনরুইকে দেখা যায়। তারা বলেন, বন্যপ্রাণীদের টিকিয়ে রাখতে হলে নিয়মিত পাহারা, অবৈধ শিকার প্রতিরোধ ও সচেতনতা বৃদ্ধি জরুরি।

সম্পর্কিত পোস্ট

সর্বশেষ পোস্ট



Shares