বৃহস্পতিবার, ২৬ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ১৪ ফাল্গুন ১৪৩২

ভূয়া বাদীর করা গায়েবী মামলায় আন্দোলনকারী জেলে!

প্রকাশ: ১২ ফেব্রুয়ারি ২০২৫ | ১২:৪৮ অপরাহ্ণ আপডেট: ১২ ফেব্রুয়ারি ২০২৫ | ১২:৪৯ অপরাহ্ণ
ভূয়া বাদীর করা গায়েবী মামলায় আন্দোলনকারী জেলে!

রফিক মোহাম্মদ:

চট্টগ্রামে বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনের ৫ মাস পর দায়ের হওয়া এক গায়েবী মামলায় জেল খাটতে হচ্ছে বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনে সক্রিয় অংশ নেওয়া আমজাদ হোসেন শিপন নামে ব্যক্তিকে। যিনি চট্টগ্রামের প্রত্যেক আন্দোলন-সংগ্রামে প্রত্যক্ষভাবে অংশ নিয়েছেন, সংঘটিত করেছেন। তাকে সদরঘাট থানার বিশেষ ক্ষমতা আইনের এক মামলায় গ্রেপ্তার করেছে চট্টগ্রাম নগর গোয়েন্দা পুলিশ। গত বছরের ৩ ও ৪ আগস্ট সদরঘাট থানার ইসলামিয়া কলেজ মোড় এলাকায় সংঘর্ষের ঘটনায় এই মামলা দায়ের হয় গত ৩১ ডিসেম্বর।

অবাক করা বিষয় হলো, এই মামলায় বাদী যে বাড়ির নাম-ঠিকানা উল্লেখ করেছেন সেখানে ওই বাড়ির অস্তিত্বই পাওয়া যায়নি। এমনকি বাদির দেওয়া মোবাইল নম্বরও দীর্ঘদিন ধরে বন্ধ পাওয়া গেছে।

ওই মামলার এজাহার বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, গত বছরের ৩ ও ৪ আগস্ট সিটি কলেজ থেকে ইসলামিয়া কলেজ মোড় পর্যন্ত বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনে ছাত্র-জনতা অংশ নেয়। ওই সময় সেখানে আন্দোলকারীদের উপর আগ্নেয়াস্ত্র, ইট, পাথর, লাঠি, হকিস্টিক হাতে হামলা চালানো হয়। ৫ মাস পর ৩১ ডিসেম্বর সদরঘাট থানায় এ ঘটনায় মামলা দায়ের করা হয়। মামলা নম্বর: ১১।

এতে বাদী হন মাশফিকুর রহমান শান্ত নামে এক ব্যক্তি। এ সময় ওই থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) ছিলেন ডিবি বন্দর জোনের সাবেক পুলিশ পরিদর্শক রমিজ উদ্দিন। এজাহারে এই মামলার বাদী মাশফিকুরের ঠিকানা লিখা হয়েছে হালিশহর থানার ছোটপুল এলাকার শান্তিবাগের ৭ নম্বর রোডের চৌধুরী ম্যানসনের ৫ম তলা। শান্তিবাগ এলাকার ৭ নম্বর গলি এই নামে কোনো বাড়ি নেই। পরবর্তীতে ৬ ও ৮ নম্বর সড়কে ঘুরেও এই নামে কোনো বাড়ির খোঁজ মিলেনি।

জানা গেছে, চন্দনাইশের পূর্ব কেশুয়া গ্রামের দুলা মিয়ার সন্তান আমজাদ হোসেন শিপন পড়াশোনা করেছেন চট্টগ্রামে সরকারি মোহাম্মদ মহসিন কলেজে। চট্টগ্রামের বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনে সামনের সারিতে নেতৃত্ব দিয়েছিলেন তিনি। তাঁর ফেসবুক আইডিতে আছে ওই সময়ের নানা লাইভ ভিডিও, ছবি। ছাত্রজীবনে তিনি জড়িত ছিলেন ইসলামী ছাত্রশিবিরের সঙ্গে। ছাত্রজীবন শেষ করে দীর্ঘদিন ধরে রাজনীতি করছেন পাঁচলাইশ থানা জামায়াত ইসলামীর সঙ্গে। পাঁচলাইশ থানা সাংগঠনিক ওয়ার্ডের দপ্তর সম্পাদক। আবার জামায়াতের বহদ্দারহাট ইউনিটের সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্বও পালন করছেন তিনি। কিন্তু সদরঘাট থানায় গত ৩১ ডিসেম্বর বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন চলাকালে দায়ের হওয়া বিশেষ ক্ষমতা আইনের মামলায় আসামি করা হয়েছে তাকে। এই মামলার ৫৩ নম্বর আসামি তিনি। তাকে গত ৪ ফেব্রুয়ারী বহদ্দারহাট জামায়াতের অফিস থেকে সাংগঠনিক প্রোগ্রাম শেষে বাসায় ফেরার পথে রাত সোয়া ১০টার দিকে গোয়েন্দা পুলিশ তাকে গ্রেপ্তার করে।

এ আমজাদ হোসেনের বিষয়ে জানতে চাইলে চট্টগ্রামের পাঁচলাইশ থানা জামায়াতে ইসলামের আমীর বলেন, আমজাদ জামায়াতে ইসলামীর কর্মী। পাঁচলাইশ থানাে সাংগঠনিক ওয়ার্ডের দপ্তর সম্পাদক ও চান্দগাঁও থানার সেক্রেটারি। সে ২০০১ সাল থেকে চান্দগাঁও শিবিরের বিভিন্ন দায়িত্ব পালন করেন। জুলাই বিপ্লবে সামনের সারিতে নেতৃত্ব দেন।

চন্দনাইশ উপজেলা জামায়াতের আমীর বলেন, আমজাদ ছোটবেলা থেকে শিবিরের সাথে জড়িত ছিল। সে কোনদিন ছাত্রলীগের রাজনীতির সাথে সম্পৃক্ত ছিল না। তাকে মিথ্যা মামলায় ফাঁসানো হয়েছে। এর সাথে যারা জড়িত তাদের শাস্তি দাবি করেছেন তিনি।

চট্টগ্রামের বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনে নেতৃত্ব দেওয়া ছাত্রনেতা ইব্রাহিম রনি বলেন, জুলাইয়ের শুরু থেকে আমজাদ হোসেন শিপন আন্দোলনে প্রত্যক্ষভাবে অংশ নিয়েছে। যার ভিডিও, ছবি ওই সময়েই ফেসবুকে আছে। তাকে বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনে হামলার ঘটনার ৫ মাস পর দায়ের হওয়া মামলায় আসামি করা উদ্দেশ্যপ্রণোদিত। আমরা তার মুক্তি দাবি করছি।

স্থানীয়দের অভিযোগ, ঘটনার ৫ মাস পর যাচাই-বাছাই না করেই সদরঘাট থানার (ওসি) রমিজ উদ্দিন এই মামলা রুজু করেছেন। স্থানীয় বিভিন্ন এলাকার গণমান্য ব্যক্তির বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করেছেন রমিজ উদ্দিন। ব্যক্তিগত বিভিন্ন স্বার্থ সংশ্লিষ্ট কারণে যাদের মধ্যে দ্বন্দ্ব আছে, তাদের এসব মামলায় রমিজ উদ্দিন ফাঁসিয়েছেন। এসব গায়েবী মামলায় আসামি করতে রমিজ উদ্দিন নিয়েছেন লাখ লাখ টাকা।

এ বিষয়ে মামলার রেকর্ডকারী সদরঘাট থানার সাবেক ওসি রমিজ উদ্দিন বলেন, এটা বৈষম্য বিরোধী ছাত্ররা এই মামলা করেছে। এর ভিত্তিতে আমরা আসামীকে গ্রেফতার করি। টাকার বিনিময়ে মামলার বিষয়টি তিনি অসত্য বলে দাবি করেছেন।

এ বিষয়ে চট্টগ্রাম আদালতের সিনিয়র আইনজীবী এডভোকেট রোকন উদ্দিন বলেন, ‘ঘটনার ৫ মাস পর যখন কোনো মামলা হয় তখন কাদের আসামি করা হচ্ছে তা চেক করার দায়িত্ব সংশ্লিষ্ট থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তার। এসব মামলার ইন্টেনশন হচ্ছে মানুষকে ফাঁসানো। আগস্ট মাসের শুরুর দিকের ঘটনার মামলা আগস্ট মাসে কোনো কারণে যদিও নাও হয়, তাহলে সেটি সেপ্টেম্বরেও রুজু হতে পারতো। কিন্তু এই মামলা যখন ৫ মাস পর দায়ের হয়েছে, তখন এখানে নিশ্চিত গণহারে নাম ঢুকিয়ে কেউ না কেউ ফায়দা নিয়েছে। একজন ওসির দায়িত্বই হচ্ছে যেন নিরপরাধ কেউ যেন বিপদে না পরে তা নিশ্চিত করা। যদিও দায়িত্বশীল পুলিশ অফিসারের নিশ্চয় কাণ্ডজ্ঞান বা ইন্টেশন ভাল না হলে এমন মামলা হওয়া অস্বাভাবিক কিছু নয়। এ বিষয়ে তদন্ত করে সংশ্লিষ্ট ওসির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া উচিত।’

সম্পর্কিত পোস্ট

সর্বশেষ পোস্ট



Shares