আমিনুল ইসলাম খন্দকার, বিশেষ প্রতিনিধি
প্রতিটি ফোঁটা-ই হোক শান্তির দুত, পৃথিবী হোক শান্তিময় জলধারায়’ এই স্লোগানে আগামী শনিবার থেকে চারদিন ব্যাপী বান্দরবান পাহাড়ী অঞ্চলে শুরু হচ্ছে জলকেলী উৎসব বা মাহা: সাংগ্রাই পোয়ে।
শুক্রবার (১২ এপ্রিল) সকালে সাঙ্গু নদীতে ‘মা’ গঙ্গাকে এ ফুল নিবেদন করে চাকমা, মারমা ও তঞ্চঙ্গ্যা সম্প্রদায়ের হাজারো শিশু- নারী পুরুষ। প্রতিবছর ১২ এপ্রিল তিন পার্বত্য জেলায় ১১টি সম্প্রদায় উৎসব মুখর পরিবেশে সাংগ্রাই উৎসব পালন করে থাকে।
আজ সাঙ্গু নদীতে ফুল ভাসিয়ে দেওয়ার মধ্য দিয়ে পুরাতন বছরকে বিদায় এবং নতুন বছরকে বরণ করে নিতে শুরু হচ্ছে তঞ্চঙ্গ্যা সম্প্রদায়ের তিন দিন ব্যাপী ঐতিহ্যবাহী বিষু উৎসব। বিষু উৎসবে ফুলবিষু, মূলবিষু ও নয়া বছর মোট তিন দিন পালন করে থাকে তঞ্চঙ্গ্যা জনগোষ্ঠী। এছাড়াও ফুল ভাসানোর মধ্যে দিয়ে শুরু হয়েছে চাকমা সম্প্রদায়ের বিজু উৎসব। বাংলা বর্ষপঞ্জিকা অনুসারে বছরের শেষ দুদিন ও বাংলা নববর্ষের প্রথম দিন চাকমারা ফুল বিজু, মূল বিজু ও গজ্যাপজ্যা বিজু পালন করে থাকে।
পার্বত্য জেলা বান্দরবানের প্রধান ৩টি ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর বর্ষ বরণ উৎসব বৈসাবি। এটি তাদের প্রধান সামাজিক অনুষ্ঠানগুলোর একটি। এই উৎসবটি ত্রিপুরাদের কাছে বৈসুব, বৈসু বা বাইসু , মারমাদের কাছে সাংগ্রাই এবং চাকমা ও তঞ্চঙ্গ্যাদের কাছে বিজু নামে পরিচিত। বৈসাবী নামকরণও করা হয়েছে এই তিনটি উৎসবের প্রথম অক্ষর গুলো নিয়ে। বৈ শব্দটি ত্রিপুরাদের বৈসু থেকে, সা শব্দটি মারমাদের সাংগ্রাই থেকে এবং বি শব্দটি চাকমাদের বিজু থেকে। এই তিন শব্দের সম্মিলিত রূপ হলো ‘বৈসাবি’।
সাঙ্গু নদীর তীরে ঐতিহ্যবাহী পোশাকে সেজে পাহাড়ি তরুণ তরুণীরা সবার মঙ্গল কামনায় কলাপাতায় করে ভক্তি শ্রদ্ধাভরে গঙ্গাদেবীর পূজা করেন। পরে দেবীর উদ্দেশে ফুল ভাসিয়ে পুরাতন বছরের গ্লানী ভুলে নতুন বছরের শুভ কামনা করেন। গঙ্গাদেবীর পূজার শেষে সকাল থেকে ঘরে ঘরে ২০ থেকে ৩০ ধরনের সবজি দিয়ে তৈরি করা হচ্ছে ঐতিহ্যবাহী পাজন। নতুন পোশাক পরিধান করে একে অপরের বাসায় পাজন খেতে যাচ্ছেন সকলেই। নতুন কাপড় পরে দলবেঁধে পুরো গ্রাম ঘুরে বেড়াবে সবাই। বন্ধু-বান্ধব, পাড়া-প্রতিবেশী, আত্মীয়-স্বজন এমনকি কারও সঙ্গে অতীতের বৈরিতা থাকলে এদিন একে অপরকে ক্ষমার মাধ্যমে নিজের বাড়িতে আমন্ত্রণ করেন।
পার্বত্য চট্টগ্রামে বসবাসরত ১১টি সম্প্রদায়ের মধ্যে শুধু বম, লুসাই, পাংখোয়া তিনটি সম্প্রদায় ব্যতীত অন্য সকল সম্প্রদায় ভিন্ন ভিন্ন নামে এই উৎসব প্রতিবছর পালন করে আসছে।
এবার বান্দরবানের সার্বিক পরিস্থিতি বিবেচনায় বিঝু, সাংগ্রাইং, বৈসু উৎসব আয়োজন একটু ভিন্ন। গত ২ এপ্রিল ও ৩ এপ্রিল রুমা ও থানচি তে কেএনএফ কর্তৃক প্রকাশ্যে ব্যাংক ডাকাতি অস্ত্রলুটের ঘটনায় যৌথবাহিনীর সাোড়াশি অভিযান চলছে সমগ্র পাহাড় জুড়ে। তাই রুমা, থানচি ও রোয়াংছড়ি দুর্গম এলাকাগুলোতে আতঙ্ক বিরাজ করছে। এ কারণে রুমা থানচি ও রোয়াংছড়ি এই তিন উপজেলায় বৈসাবি উৎসব তেমন উৎসবমুখর পরিবেশে উৎসব পালন করা হচ্ছে না।
এদিকে বৈসাবি উৎসবে প্রধান আকর্ষণ জলকেলি (পানি বর্ষণ)। ১৫ ও ১৬ এপ্রিল দুইদিন এই জনকেলি উৎসবটি অনুষ্ঠিত হবে বান্দরবান শহরে রাজার মাঠে।
গত বুধবার (১০ এপ্রিল) বান্দরবানে সাংগ্রাইং উৎসব উদযাপন পরিষদের উদ্যোগে এক সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়, এবারে উৎসব আগের চেয়েও প্রাণবন্ত হবে। আগামী শনিবার (১৩ এপ্রিল) সকাল ৮টায় বর্ণাঢ্য মঙ্গল শোভাযাত্রার মাধ্যমে সাংগ্রাই উৎসব শুরু হবে। এছাড়া ৪দিন ব্যাপী অনুষ্ঠানের মধ্যে রোববার (১৪ এপ্রিল) বুদ্ধ স্নান, পিঠা উৎসব, সোমবার (১৫ এপ্রিল) রাজার মাঠে মৈত্রী পানি বর্ষণ ও মঙ্গলবার (১৬ এপ্রিল) মৈত্রী পানি বর্ষণের মাধ্যমে এ উৎসবের সমাপ্তি ঘটবে।
