বৃহস্পতিবার, ২৬ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ১৪ ফাল্গুন ১৪৩২

শান্তি আলোচনার শর্ত লংঘনের ব্যাখ্যা দিলো কেএনএফ

প্রকাশ: ৫ এপ্রিল ২০২৪ | ১১:১২ পূর্বাহ্ণ আপডেট: ৫ এপ্রিল ২০২৪ | ১২:১২ অপরাহ্ণ
শান্তি আলোচনার শর্ত লংঘনের ব্যাখ্যা দিলো কেএনএফ

আমিনুল ইসলাম খন্দকার, বিশেষ প্রতিনিধি  

একের পর এক ব্যাংক লুট, থানচি ও আলিকদমে আইন শৃঙ্খলা  বাহিনীর সাথে ব্যাপক গোলাগুলির পর আজ সকালে কেএনএফ সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে তাদের এমন কর্মকান্ডের ব্যাখ্যা দেয়।

মিডিয়া ও ইন্টেলিজেন্স উইং, কুকি-চিন ন্যাশনাল ফ্রন্ট (কেএনএফ) এর প্রাধান “কর্ণেল সলোমন ”  এর বরাত দিয়ে ফেইসবুকে একটি পোস্ট দেওয়া হয়। এতে জানানো হয়,

কেএনএফ কেন শান্তি আলোচনার শর্ত লংঘন করেছে? আজ এই প্রশ্ন শান্তি প্রতিষ্ঠা কমিটি সহ দেশের সকল বিজ্ঞা মহল ও উচ্চ মহলের। কেএনএফ বৈঠক কালীন সময়ে স্বাক্ষরিত সমঝোতা শর্তাবলী ভঙ্গের কারণগুলো নিম্নে বিশদভাবে তুলে ধরা হল-

১) সরকার প্রথম সশরীর বৈঠকে উভয়পক্ষ স্বাক্ষরিত শর্ত মোতাবেক কোন রকমের কাজ সম্পাদন করেনি সরকার পক্ষ বরং পুরোপুরি লংঘন করেছে। যেমন-

ক) জেলে বন্দিদেরকে (যারা কেএনএফ-এর সদস্য নয় ও নিরীহ) এক মাসের মধ্যে ধাপে ধাপে মুক্তি দেবার কথা থাকলেও তা পাঁচ মাস পেরিয়ে গেলেও মুক্তি দেওয়া হয়নি। শুধু মুক্ত করা হয়েছে সেনাবাহিনীর ক্যাম্প থেকে জেলে বন্দি থাকা মেয়েটি ( যে মেয়েটি জেলে বন্দি অবস্থায় গর্ভপাত হয়েছিল) সেই মেয়েটিকে মুক্তি দেওয়া হয়েছে।

২) বাংলাদেশ সেনাবাহিনী বৈঠকের শর্তাবলী মারাত্মকভাবে লংঘন করেছে। যেমন- ক) সিভিলদের দ্বারা সেনাবাহিনীর পটার কাজ বন্ধ হয়নি। আর প্রতিদিন ক্যাম্পে কাজ করতে দেওয়া হলেও গরীবদের হাতে কোন ন্যায্য পারিশ্রমিক দেওয়া হয়নি; খ) সেনাবাহিনী সরকারের শান্তি আলোচনার প্রতি অনিহা প্রকাশ স্বরূপ নিরীহ জনগণের উপর অহেতুক হয়রানি ও গ্রেপ্তারের হুমকি দিয়ে আসছে।

গ) যে ক্যাম্পগুলি সরিয়ে নেবার কথা সেগুলি সরিয়ে নেওয়া হয়নি। বরং সেখানে ক্যাম্প স্থাপন করে উল্টোভাবে চেকপোস্ট বসিয়ে সেখানে নিরীহ জনগনকে প্রতিনিয়ত হয়রানি করা হচ্ছে।

২) দুজন সেনা ক্যাম্পে গুম হয়ে যাওয়া দ্বিতীয় বৈঠকেও সদোত্তর দিতে ব্যর্থ সরকারী পক্ষ তথা শান্তি কমিটি।

৩) কেএনএফ-এর উত্থাপিত ৬ দফা দাবির প্রসঙ্গে সরকার কর্তৃক গ্রাহ্য-অগ্রাহ্যের ব্যাপারে আলোচনায় শান্তি কমিটি সত্যতা প্রকাশ করতে ব্যর্থ হয়েছেন।

৪) ৪ হাজারেরও অধিক নিক্ষিপ্ত হওয়ার ফলে বমদের ধ্বংসপ্রাপ্ত গ্রামগুলোতে (যে গ্রামের লোক জন মিজোরামে শরণার্থী হিসেবে জীবন যাপন করছে) তথা সেই পরিত্যক্ত পাড়া গুলোতে জাতিগত সমস্যা সৃষ্টির অসৎ উদ্দেশ্যে বিজাতিদেরকে গ্রামগুলোতে বেদখলের নির্দেশ দিয়েছে সেনা ক্যাম্প।

৫) সীমানা সড়ক নির্মাণ বন্ধ হয়নি এবং সেখানে বিল্ডিং নির্মাণের মাধ্যমে পর্যটন শিল্প গড়ে উঠাবার চেষ্টা করা হচ্ছে যা সীমান্তবর্তী অঞ্চলের জনগোষ্ঠীর জন্যে হুমকিস্বরূপ।

৬) শান্তি প্রতিষ্ঠার নামে শুধুমাত্র প্রহসন ও কালক্ষেপণ করে কেএনএফ কে দূর্বল ও নিস্তেজ করবার পাঁয়তারা চালিয়ে যাচ্ছে তা দিবালোকে কেএনএফ-এর ইন্টেলিজেন্স উইং-এর নজরে এসেছে।

৭) সরকারের কাছে কেএনএফ-এর উত্থাপিত যৌক্তিক দাবিগুলো অনুষ্ঠিত কয়েক দফা ভার্চুয়াল ও মুখোমুখি বৈঠকে কোন স্থান পায়নি। বরং উপঢৌকন প্রদান সহ কিছু চাকুরির বিনিময়ে স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আনার জন্য আপ্রাণ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছিলেন সরকার পক্ষ যা কেএনএফ-এর সাথে বিশ্বাস ঘাতকতার সামিল। আর যেটি শান্তির আলোচনাকে মারাত্মকভাবে ব্যাঘাত ঘটিয়েছে।

৮) ২য় বার মুখোমুখি বৈঠকে কেএনএফ-এর দাবির প্রসঙ্গে সরকারের প্রতিনিধির কাছে উত্থাপিত প্রশ্ন কোন সদোত্তর দিতে পারেনি সরকারি পক্ষ। বরং কেএনএফ-এর অবস্থান ও আচরণ নিয়ে আমাদের কাঠগড়ায় দাঁড় করিয়েছেন।

৯) একদিকে পিস টককে কেন্দ্র করে সকল সশস্ত্র তৎপরতা কেএনএফকে বন্ধ করে দেওয়া হচ্ছে, অন্যদিকে রাস্ট্র বাহিনী মদদপুষ্ট সংস্কারপন্থী সন্ত্রাসী বাহিনী ও সরকারপন্থি জেএসএসকে বাংলাদেশ গুয়েন্দা সংস্হা কেএনএফ-এর বিরুদ্ধে লেলিয়ে দিচ্ছে। তাহলে কেএনএফ -এর পক্ষ থেকে তথা একপাক্ষিক শান্তির প্রক্রিয়া কতটুকু সুফল বয়ে আনবে এই প্রশ্ন রাস্ট্র ও রাষ্ট্রের সকল সচেতন মহলের কাছে।

১১) এলসিপিই তথা শান্তি প্রতিষ্ঠা কমিটি গঠন করা হয়েছে দৃশ্যতঃ শুধুমাত্র লোক দেখানো আর কুকি-চিন জনগোষ্ঠীর প্রতি মিথ্যা আশ্বাস প্রদানের জন্যে। তাঁরা শুধুমাত্র নিয়ম বা শর্তাবলি বজায় রাখতে এবং সরকারের নিকট ইমেজ রক্ষার্থে কাজ করেছেন। প্রকৃতপক্ষে, সরকারের প্রতিনিধির মধ্যে আন্তরিকতা ও স্বদিচ্ছার অনেক ঘাটতি রয়েছে।

১২) শর্ত মোতাবেক সরকার পক্ষ আজ পর্যন্ত ক্ষতিগ্রস্ত কুকি-চিন জনগোষ্ঠীর জনসাধারণের জন্য কাজ করবার আশ্বাস প্রদান করলেও মানবিক সাহায্য ও ত্রাণ সহায়তার বিষয়ে আজও কোন পদক্ষেপ গ্রহণ করেনি। প্রথমে ৩০ মে.টন খাদ্যশষ্য পৌঁছে দেওয়া হয় দূর্গতদের মাঝে সে সময় মাথাপিছু ৪/৫ কেজি যা একটা পরিবারের কাছে তুচ্ছ মাত্র। এখনও বান্দরবান জেলা পরিষদে ৫৭ মে.টন খাদ্যশষ্য পড়ে আছে যা এখনও বিতরণ করা হয়নি।

একটা উদাহরণ দিয়ে এলসিপিই তথা “শান্তির প্রতিষ্ঠা কমিটি” তাদের কার্যক্রম তুলে ধরলাম, এভাবে অনেক আলোচনা বিষয়বস্তু রয়েছে যা বাস্তবায়নের কোন পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়নি।

বাংলাদেশ গুয়েন্দা সংস্হা ডিজিএফআই এবং শান্তি প্রতিষ্ঠা কমিটি’র কাছে উপরোক্ত অভিযোগ গুলি সতর্কতার বাণী হিসেবে নয়-দশ বার কেএনএফ-এর পক্ষ থেকে বলা বা উত্থাপন হয়েছে যা পুরোপুরি কার্যকর হয়নি।

এখানে বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য এবং দেশের বিজ্ঞ মহল বা নীতিনির্ধারকগণের বিজ্ঞাতার্থে কেএনএফ-এর স্পষ্ট বক্তব্যঃ – বিগত এক বৎসর বাংলাদেশ সেনাবাহিনী তাদের কম্বিং অপারেশন কালীন সময়ে একজন বম নাবালিকা সহ ষাটোর্ধ নিরীহ জনগণকে বিভিন্ন মামলায় ফাঁসিয়ে জেলে বন্দি করে রেখেছে। বন্দীর কেউই কেএনএফ-এর সশস্ত্র সদস্য নয়। সেনা ক্যাম্পে দু’ জনকে গুম করা হয়েছে, ১৪ জনের উপর গণহত্যা চালিয়েছে। আলোচনায় যাবার সময় গ্রেফতার হওয়া দুজন কেএনএফ নিরস্ত্র সদস্য এখনও ক্যান্টনমেন্টে বন্দি করে রাখছে। এদিকে কেএনএফ অপারেশন চলাকালীন সময়ে কোন নিরীহ বাঙ্গালীকে ধরে নিয়ে যাওয়া হয়নি, কিডনেপ করলেও পরে ছেড়ে দেওয়া, যেমন- সেনাবাহিনির ইঞ্জিনিয়ার ও ব্যাংক ম্যানেজার। এ যাবৎ কোন বাঙ্গালী বন্দি অবস্থায় কেএনএফ ক্যাম্পে নেই।  আর কেএনএফ এখন পর্যন্ত কোন বাঙালিকে হত্যা করেনি। এখানে একেবারেই পরিষ্কার – কে আসলে উশৃংখল আর কে সুশৃঙ্খল? শান্তিপ্রিয় আর কে পাহাড়ে অশান্তি সৃষ্টি করছে? এই দেশের বিজ্ঞ মহল ও উচ্চ মহলের কাছে?

“রাষ্ট্রের প্রতিনিধি বা উচ্চ মহলকে বুঝতে হবে কুকি-চিন জনগোষ্ঠী এবং কেএনএফ-এর নেতৃত্বে যারা আছেন তাঁরা অত্যন্ত সৎ ও নিষ্ঠাবান। স্বাক্ষরিত শর্তাবলি প্রতি কোন পক্ষ গাফিলতি দৃশ্যমান হলে বা এদিক-সেদিক হলে সব শর্তই নিমেষেই ভঙ্গ হবে এটা অস্বাভাবিক বা হতভম্ব হওয়ার কিছু নয়।”

এর আগে, বান্দরবানের রুমার সোনালী ব্যাংকের ম্যানেজার নেজাম উদ্দিনকে উদ্ধারের পর থানচিতে কুকি চিন ন্যাশনাল ফ্রন্টের (কেএনএফ) সন্ত্রাসীদের সঙ্গে  পুলিশ ও বিজিবির ব্যাপক গোলাগুলি হয়।
বৃহস্পতিবার (৪ এপ্রিল) সন্ধ্যার পর থেকেই মুন্নমপাড়া, আত্তাপাড়া সীমান্তবর্তী এলাকায় এই গোলাগুলি চলে।

এর পর শুক্রবার (৫ এপ্রিল) রাত ১টার দিকে বান্দরবান জেলার থানচি থানা লক্ষ্য করে গুলির পর এবার আলীকদমের ২৬ মাইলের ডিম পাহাড় এলাকায় পুলিশ ও সেনাবাহিনীর একটি যৌথ তল্লাশি চৌকিতে হামলা চালিয়েছে অস্ত্রধারী সন্ত্রাসীরা। এ ঘটনা ঘটে বলে নিশ্চিত করেছে আলীকদম থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) তবিদুর রহমান।

সম্পর্কিত পোস্ট

সর্বশেষ পোস্ট



Shares