নিজস্ব প্রতিবেদক
মহেশখালীর মাতারবাড়ী বিদ্যুৎ প্রকল্পের জন্য সাধারণ কিছু ‘হ্যান্ড টুলস’ আমদানিতে বড় ধরনের অনিয়মের বিষয় উঠে এসেছে।এতে ছোট ছোট পাইপ কাটার, হাতুড়ি,মেটালসহ মোট ১৯ টি সাধারণ যন্ত্রাপাতি কিনতে হাজার গুণ পর্যন্ত বেশি মূল্য ধরা হয়েছে। এরমধ্যে একটি পাইপ কাটারের দাম ধরা হয়েছে ৪৬ লাখ ৫০ হাজার টাকা।যেটার সাধারণ বাজারমূল্য সর্বসাকুল্যে ৭ হাজার টাকা।একটি হাতুড়ির দাম ধরা হয়েছে ৯১ হাজার টাকা।যেটার বাজার মূল্য ৮৩৪ টাকা।
জানা যায়, গত ৯ জানুয়ারি রাষ্ট্রায়ত্ত কোল পাওয়ার জেনারেশন কোম্পানি বাংলাদেশ লিমিটেড (সিপিজিসিবিএল) এর অনূকূলে এসেছে জার্মানি থেকে ৩৪৪.৫ কিলোগ্রাম ওজনের একটি চালান আসে। এই ছোট চালানের আমদানিমূল্য মোট ২.৭৫ কোটি টাকা। আর ১১ই জানুয়ারি যাচাইয়ের সময় কাস্টমস্ কর্মকর্তারাএটি দেখেই চমকে উঠেন।সেখানে দেখা যায়, দুটি পাইপ কাটারের দাম দেখানো হয়েছে ৯২ লাখ ৯৯ হাজার টাকা।আর যে দুইটির সাধারণ বাজারমূল্য ১৪ হাজার টাকা। দুটি হাতুড়ির দাম দেখানো হয়েছে এক লাখ ৮২ হাজার টাকা।যার সাধারণ বাজারমূল্য ১৬৮৪ টাকা।পরে কাস্টমস কর্মকর্তারা চালানটি আটকে দেন।
সূত্র জানায়, আমদানিকৃত এই ১৯ টি আইটেমের মধ্যে বাকি ১৫ টি আইটেমএরও এভাবে দাম দেখানো হয়। চালানটির অন্যান্য আইটেমগুলো হলো সেট মেকানিক্যাল পায়ার, মাঙ্কি পায়ার, টুলবক্স, স্ক্রু-ড্রাইভার, রেঞ্জ, চিসেল অ্যান্ড স্পান্সার, স্প্যানার, কার ফিটার সেট। এসব টুলের সরবরাহকারী জার্মানির প্রতিষ্ঠান হলেও উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান হলো জাপানের কেএস টুলস ওয়ার্কডেজ।
এদিকে এনবিআরের নথিতে এসব পণ্যের আমদানি ব্যয় তাদের সার্ভারের (আমদানি-রপ্তানি ডেটাবেস) রেকর্ড মূল্যের চেয়ে ৫ থেকে ১৮ হাজার ৫৪৫ গুণ বেশি। কাস্টমস কর্তৃপক্ষের কায়িক পরীক্ষার প্রতিবেদন অনুযায়ী, পাইপ কাটার টুলের দাম ডেটাবেস মূল্যের চেয়ে ১৮ হাজার ৫৪৫ গুণ, পাইপ রেঞ্চ ১ হাজার ৫৩ গুণ, মাঙ্কি প্লায়ারের দাম ৯১২ গুণ, স্ক্রু ড্রাইভারের দাম ৮৩৩ গুণ এবং হাতুড়ির দাম ১১২ গুণ বেশি।
এদিকে অস্বাভাবিক মূল্যের এই চালানটি আটকে দেয়ার পর চট্টগ্রাম কাস্টমস কর্তৃপক্ষ সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়, সিপিজিসিবিএল ও বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের কাছে চিঠি দেয়।সেই চিঠিতে লেখা হয়, ‘কায়িক পরীক্ষায় প্রাপ্ত পণ্যের ছবি দেখে স্পষ্ট বোঝা যায়, পণ্যগুলো সাধারণ হ্যান্ড টুলস, যা স্বল্পমূল্যের পণ্য হওয়াই যুক্তিযুক্ত। অর্থাৎ আমদানি পণ্যের ঘোষিত মূল্য পণ্যের রেফারেন্স মূল্য অপেক্ষা অস্বাভাবিক বেশি।
কাস্টমস কমিশনার ফায়জুর রহমানের স্বাক্ষরিত সেই চিঠিতে আরও বলা হয়, আমদানি পণ্য চালানটি অস্বাভাবিক উচ্চ ঘোষিত মূল্যে শুল্কায়ন করা ঝুঁকিপূর্ণ হবে এবং মূল্যের বিষয়টি সংশ্লিষ্ট দপ্তর ও মন্ত্রণালয় থেকে নিশ্চিত হওয়া প্রয়োজন বলে দপ্তর মনে করে। এ সংক্রান্ত প্রয়োজনীয় কাগজপত্র ও পণ্যমূল্যের বিষয়ে যৌক্তিক ব্যাখ্যা প্রদানের আহ্বান জানানো হয়।তবে জবাবে এই তিন পক্ষের পক্ষ থেকে উল্লেখিত মূল্য স্বাভাবিক আছে জানিয়ে শুল্কায়নের অনুরোধ জানানোর কারণে কাস্টমস কর্তৃপক্ষ শুল্কায়ন করেন।
সূত্র জানায়,অস্বাভাবিক আমদানি মূল্য দেখিয়ে প্রকল্প সংশ্লিষ্টরা ব্যক্তিগতভাবে লাভবান হয়েছে।
আর বাণিজ্যিকভাবে এসব আইটেম প্রচুর আমদানি হয়। এ কারণে বাজারে এসব পণ্য সহজলভ্য। চট্টগ্রাম কাস্টমসের আমদানি ডেটাবেজে এ ধরনের পণ্য প্রচুর পরিমাণে আমদানি ও শুল্কায়নের তথ্য রয়েছে। এরমধ্যে অন্যান্য আমদানিকারকরা চট্টগ্রাম বন্দর দিয়ে গত ৩ মাসে এসব পণ্যের অন্তত শতাধিক চালান খালাস করেছেন। সেসব পণ্যের আমদানি মূল্য সিপিজিসিবিএল-এর আমদানি পণ্যের চেয়ে কয়েক শ গুণ কম।
তবে মাতারবাড়ী পাওয়ার প্ল্যান্ট প্রকল্পের পরিচালক ও সিপিজিসিবিএল-এর কর্মকর্তা আবুল কালাম আজাদ বলেন, এই চালানের প্রোডাক্টগুলো বিশেষভাবে বিশেষ উপকরণ দিয়ে তৈরি করা হয়েছে। তাই বাজারের পণ্যের সঙ্গে এসব পণ্য মেলানো যাবে না।
তিনি বলেন ‘ সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানের সাথে ঠিকাদারের চুক্তি অনুযায়ী চালানটি এসেছে। একটি চালানে হাজার হাজার আইটেম থাকতে পারে। পুরো চালানের জন্য ঠিকাদারের সঙ্গে যে চুক্তিমূল্য ধরা হয়েছে, এর চেয়ে এক টাকাও বেশি দেওয়ার বা ব্যয় করার কোনো সুযোগ নেই। আলোচ্য চালানটি আমদানির ক্ষেত্রে বিভিন্ন আইটেমের মূল্য ঘোষণায় তারতম্য বা বাজারমূল্যের চেয়ে কমবেশি হতে পারে। প্রকৃত অর্থে ওই চালানে সরকার চুক্তিমূল্যের চেয়ে এক টাকাও বেশি পরিশোধ করেনি বা করার সুযোগ নেই। প্রয়োজনীয় কাগজপত্র জমা দেওয়ার পর তাতে সন্তুষ্ট হয়ে কাস্টম হাউজ চালানটি ছাড় করেছে।
এদিকে আলোচ্য চালানের বিষয়ে জানতে চাইলে চট্টগ্রাম কাস্টম হাউজের কমিশনার ফাইজুর রহমান বলেন,’চালানটি আসার পর পণ্যগুলোর মূল্য নিয়ে আমাদের কাছে সন্দেহ হয়েছিল।যে কারণে আমরা চালানটি আটকে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে চিঠি দেই। তাদেরকে এই অস্বাভাবিক মূল্যের বিষয়টি জানাই।তবে তারা জানিয়েছেন সবকিছু ঠিকঠাক আছে। উল্লেখিত মূল্যে কোন অসংগতি নেই। যে কারণে আমরা পরে এটি শুল্কায়ন করেছি।কারণ আমদানিকারক ও সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ক্লিয়ারেন্স দেয়ার পর এগুলো আটকে রাখার এখতিয়ার আমাদের নেই। এগুলো উনারাই ভালো জানবেন।’
