আবু রোহামা, বিশেষ প্রতিনিধি
সরকার পতনের এক দফা দাবিতে গত ২৮ অক্টোবর থেকে সারাদেশের মতো চট্টগ্রামেও টানা হরতাল -অবরোধ চালিয়ে আসছে বিএনপি। আর ‘নাশকতা’ প্রতিরোধে শান্তি সমাবেশসহ নানা কর্মসূচি পালন করছে আওয়ামী লীগ। এসব কর্মসূচিতে বিএনপির সাথে একাত্মতা ঘোষণা করে মাঠে থাকার কথা দিয়েছিল গণতন্ত্র মঞ্চ,১২ দলীয় জোট, এলডিপি, জেএসডিসহ নির্বাচন বর্জন করা দলগুলো।বিপরীতে জাসদ, ওয়ার্কার্স পার্টি, তরিকতসহ মহাজোটভুক্ত দলগুলো আওয়ামী লীগের সাথে থেকে নির্বাচন বর্জনকারীদের প্রতিহত করার ঘোষণা দিয়েছিল। তবে বাস্তবে সর্বশেষ ৫০ দিনের কঠিন সময়েও এসব বন্ধুদের কাছে পায়নি আওয়ামী লীগ।আর বিএনপিও তাদের সমমনা দলগুলোর কোন সহযোগিতা পাচ্ছেনা চলমান আন্দোলনে। যদিও প্রকাশ্য কোন সম্পর্কে না থাকা জামায়াত ইসলামী বিএনপির সাথে তাল মিলিয়ে হরতাল, অবরোধ কর্মসূচি পালন করে আসছে।
২০০৪ সালে বিএনপি জামায়াতের নেতৃত্বাধীন ৪ দলীয় জোট সরকারের বিরুদ্ধে আন্দোলন সংগ্রাম করতে আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে গঠিত হওয়া ১৪ দলীয় জোট।বর্তমানে এই জোটে রয়েছে জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল (ইনু), ওয়ার্কাস পার্টি,সাম্যবাদী দল, গনতন্ত্রী পার্টি, গনআজাদী লীগ, বাংলাদেশ সমাজতান্ত্রিক দল(বিএসডি), গণতান্ত্রিক মজদুর পার্টি, কমিউনিস্ট পার্টি অব বাংলাদেশ (সিপিবি),গণফোরাম, বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দল- বাসদ,শ্রমিক কৃষক সমাজবাদী দল,ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি- ন্যাপ প্রধান( মোজাফফর),তরিকত ফেডারেশন ও জেপি।আর শুরু থেকেই এরশাদের জাতীয় পার্টি এই জোটে থাকলেও দলটির বর্তমান অবস্থান পরিস্কার নয়।
জানা যায়, বিএনপি – জামায়াতসহ সমমনাদের চলমান হরতাল – অবরোধের বিরুদ্ধে ২৮ অক্টোবর থেকে আওয়ামী লীগের পাল্টা কর্মসূচিতে মাঠে থাকার ঘোষণা দিয়েছিল মহাজোটভুক্ত এসব দল।তবে চট্টগ্রামে এপর্যন্ত সরকারপন্থীদের কোন কর্মসূচিতেই তাদের কাউকে দেখা যায়নি।এমনকি সাম্যবাদী দলের প্রধান দিলীপ বড়ুয়ার জন্মস্থান মীরসরাই ও তরিকত ফেডারেশনের চেয়ারম্যান সৈয়দ নজিবুল বশর মাইজভান্ডারির এলাকা ফটিকছড়িতেও হরতাল অবরোধের বিরুদ্ধে দল দুইটি কোন কর্মসূচি পালন করেনি। আর এইসব বিষয়ে অনেকটা ক্ষুব্ধ আওয়ামী লীগের বড় একটা অংশ।
চট্টগ্রাম উত্তর জেলা আওয়ামী লীগের এক সিনিয়র নেতা নাম প্রকাশে না করার শর্তে সাম্পান নিউজকে বলেন,”মহাজোটের যে দলগুলোর কথা বলছেন তাদের এখানে কোন কার্যক্রম নেই।সরকারের জন্য এখন খুব কঠিন সময় যাচ্ছে।এই সময়েও তাদের কোন তৎপরতা আমরা দেখছি না।ফটিকছড়ি ও মীরসরাইয়েও যদি হরতাল নৈরাজ্যের বিরুদ্ধে অন্তত একটা কর্মসূচি দিতো, আমরা মনকে সান্ত্বনা দিতে পারতাম। উপজেলা দুইটি এই দুই দলের প্রধানের( সাম্যবাদী ও তরিকত) নির্বাচনী এলাকা।কিন্তু তাদের কোন হদিস নেই।আর এখন তারা বসে আছেন নৌকায় চড়ে এমপি হতে।আবার নৌকা না পেতেই ইতিমধ্যে বেঁকে বসেছেন একজন।তাদেরকে আগে নিজেদের ওজন বুঝা দরকার ছিলো।”
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, মীরসরাই থেকে সাবেক শিল্প মন্ত্রী দীলিপ বড়ুয়া ও ফটিকছড়ি থেকে সৈয়দ নজিবুল বশর মাইজভান্ডারির জন্য নৌকা প্রতীক দেয়া হচ্ছিল বলে গুঞ্জন চলছিল।এরমধ্যে ফটিকছড়ি থেকে তরিকত প্রধানের হাতে নৌকার বৈঠা যাওয়ার বিষয়ে অনেকেই নিশ্চিত ছিলেন। বিশেষ করে জামায়াতের বিরুদ্ধে শক্ত অবস্থান ও ‘ভারত কানেকশন’ থাকার কারণে তার নৌকা জয়ের বিষয়টা অনেকটা নিশ্চিত ধরা হয়েছিল।তবে রহস্যজনক কারণে এবার তাকে নৌকা বঞ্চিত করেছেন আওয়ামী লীগ সভানেত্রী।এটা নিয়ে অনেকটা ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়াও ব্যক্ত করেছেন তিনি।
সোমবার ( ১৭ ডিসেম্বর) তিনি বলেন,আমার প্রতি অন্যায়, অবিচার করা হয়েছে। নৌকা দিলে দেবে, না দিলে নাই। আমার কোনো চাওয়া পাওয়া নেই। এত বছর ধরে এক সঙ্গে ছিলাম। নৌকার পক্ষে ছিলাম। এখন তারা যদি আমার আত্মীয়কে (সুপ্রিম পার্টির চেয়ারম্যান শাহাজাদা সৈয়দ সাইফুদ্দীন আহমদ) পছন্দ করে করুক। এসব নিয়ে কথা না বলাই ভালো। আমার প্রতি অবিচার করুক আর যাই করুক আমি না থাকলে কিন্তু জামায়াতের নিবন্ধন বাতিল কিংবা মানবতাবিরোধী অপরাধ মামলার বিচার হতো না। কেন আমাকে বাদ দেয়া হয়েছে প্রধানমন্ত্রী ভালো জানেন। আমি বিচারের ভার জনগণ ও দেশের আলেম-ওলামার কাছে ছেড়ে দিলাম। আমি বেজার হইনি। তবে আগামী দিনে এটা প্রমাণ হবে যে, আজকের দিনটিই শেষ দিন না। নির্বাচন পরবর্তী যে যুদ্ধ সে যুদ্ধে প্রমাণ হবে কাদের দরকার ছিল আর কাদের নয়। কাজ ফুরিয়ে গেলে ছেড়ে দেয়া ঠিক নয়।”
মহাজোটের চট্টগ্রামের সমন্বয়ক খোরশেদুল আলম সুজন বলেন “আমি চেষ্টা করছি সবাইকে মাঠে নামাতে। এরমধ্যে কয়েকটা ঘরোয়া প্রোগ্রামও করেছি।তবে তাদের তো কিছু সীমাবাদ্ধতা আছে।যে কারণে সেভাবে পাওয়া যাচ্ছেনা তাদেরকে।”
এদিকে চট্টগ্রামে মহাজোটভূক্ত দলগুলোর মতো নির্বাচন বয়কট করে বিএনপির সাথে আন্দোলনে থাকা সমমনা দলগুলোরও একই অবস্থা। গত ২৮ অক্টোবরের পর থেকে চলমান নক আউট আন্দোলনের কোথাও দেখা যায়নি দলগুলোর কার্যক্রম।এমনকি সরকার বিরোধী আন্দোলনে থাকা আলোচিত রাজনীতিবিদ কর্নেল অলি আহমদের জন্মস্থান চন্দনাইশেও হরতাল অবরোধের সমর্থনে কোন কর্মসূচি পালন করেনি তার দল এলডিপি।আর চট্টগ্রামে বিএনপির তিন সাংগঠনিক শাখার কোন দপ্ততরও সমমনা দলগুলোর চট্টগ্রামের অবস্থান সম্পর্কে ওয়াকিবহাল নয়।এছাড়া আওয়ামী লীগ দলের বর্ষীয়ান নেতা চসিকের সাবেক প্রশাসক খোরশেদ আলম সুজনকে মহাজোটের সমন্বয়ক বানালেও চট্টগ্রামে সমমনাদের সাথে বোঝাপড়ার জন্য কাউকে আনুষ্ঠানিকভাবে দায়িত্ব দেয়নি বিএনপি।
তবে প্রকাশ্য সম্পর্কে না থাকলেও চট্টগ্রামে বিএনপির সাথে সমানতালে ঝটিকা মিছিল পালন করছে জামায়াত ইসলামী।প্রতি হরতাল অবরোধ কর্মসূচিতে দলটির নেতাকর্মীরা ফজরের নামাজের পরই মহানগর ও জেলার বিভিন্ন স্থানে ঝটিকা মিছিল করেন।এরমধ্যে সর্বশেষ ৫০ দিনে চট্টগ্রামে দলটির দুই শতাধিক নেতাকর্মী আটক হয়েছেন।যদিও আগের মতো জ্বালাও – পোড়াও কর্মসূচীতে দেখা যায়নি দলটির নেতাকর্মীদের। প্রায়ই ১০-১২ মিনিটের ঝটিকা মিছিল করেই যেন আন্দোলনের দায় সারেন তারা।
এদিকে বিএনপির সাথে জামায়াতের এই রহস্যময় সম্পর্ক নিয়ে নগর জামায়াতের এক সিনিয়র নেতা নাম প্রকাশের শর্তে বলেন,” বিএনপি আমাদের দীর্ঘদিনের বন্ধু।কিছুদিন মান অভিমানের কারণে একটু দূরত্ব তৈরি হয়েছিল।তবে দেশ ও জনগণের প্রয়োজনে আবার একসাথে কাজ করছি। কেন্দ্রের সাথে তাদের যোগাযোগ হচ্ছে।চট্টগ্রামে আমাদের সাথেও তাদের কয়েক দফা অনানুষ্ঠানিক কথাবার্তা হয়েছে।আশা করছি সামনে ভালো কিছু দেখবেন। দেশের মানুষের মৌলিক অধিকার রক্ষায় আমরা আবারও এক কাতারে প্রকাশ্যে আসবো।”
তবে চট্টগ্রাম জামায়াতের সাথে কোন বৈঠক হয়েছে কি- না জানতে চাইলে মহানগর বিএনপির আহবায়ক ডা. শাহাদাত হোসেন বলেন, “এরকম বিষয় আমার ঠিক জানা নেই।ঢাকায় যোগাযোগ হচ্ছে সেটা জানি।এমনকি সেখানে তাদের সাথে সমন্বয়ের জন্য নজরুল ইসলাম খান সাহেবকে দায়িত্ব দেয়া হয়েছে।চট্টগ্রাম বিভাগের বিষয় সালাহউদ্দিন আহমেদ( স্থায়ী কমিটির সদস্য) দেখছেন।”
চট্টগ্রামে সমমনা দলগুলোর কোন কর্মসূচি না থাকার বিষয়ে জানতে চাইলে ডা. শাহাদাত বলেন,”আসলে কিছু গেপ হয়ে গেছে।কেন্দ্র থেকে এখন সমন্বয় করতে তাগিদ দেয়া হচ্ছে।আশা করছি আমরা সামনে সবাইকে মাঠে পাবো।”
