বৃহস্পতিবার, ২৬ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ১৪ ফাল্গুন ১৪৩২

‘সংসার যে আর চলেনা’

প্রকাশ: ৩ এপ্রিল ২০২২ | ৩:২৩ অপরাহ্ণ আপডেট: ৩ এপ্রিল ২০২২ | ৩:২৬ অপরাহ্ণ
‘সংসার যে আর চলেনা’

বিশেষ প্রতিনিধি

মোহাম্মদ সাখাওয়াত হোসেন।পেশায় এনজিও কর্মকর্তা স্ত্রী ও তিন সন্তানকে নিয়ে থাকেন চট্টগ্রাম নগরের মুরাদপুরে।দুই পুত্র সন্তানের একজন হাফিজায়া মাদ্রাসায়, আরেকজন পড়েন পার্শ্ববর্তী একটি বেসরকারি স্কুলে।মেয়ে শিশুটা এখনও মায়ের কোলে। প্রতিমাসে চাকরির বেতন যা পেতেন তা দিয়ে ভালোই চলে যাচ্ছিল।তবে কয়েক মাস ধরে নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্রের দাম বেড়ে যাওয়ায় সংসার চালাতে হিমশিম খাচ্ছেন তিনি।শেষপর্যন্ত দাঁড়ালেন টিসিবির ট্রাকের সামনে।

শনিবার (২ এপ্রিল) সকালে মু্হাম্মদপুর মাজার গেইটের সামনের লাইনে দাঁড়িয়ে এই গৃহকর্তা বলেন, ‘দুই বছর ধরে লকডাউন ছিলো।তখনও এরকম হয়নি। চাল, ডাল, তেল থেকে শুরু করে সবকিছুর দাম বেড়ে গেছে। মাছ মাংস থেকে তো হাত দিতে পারছিনা।এভাবে তো আর সংসার চলছেনা।লাজলজ্জা ভুলে আজকে এখানে এসেছি।আজকে লাইনে দাঁড়িয়ে ৪৬০ টাকায় দুই লিটার সয়াবিন তেল, দুই কেজি চিনি ও দুই কেজি মশুর ডালের প্যাকেজ নিয়েছে।কি আর করা, আগে তো বাঁচতে হবে।’

ভোগ্যপণ্যের অস্থির দামে এভাবে অসহায় সাধারণ মানুষ।আসন্ন রমজান উপলক্ষে জিনিসের দাম বেড়েছে আরও। সরকার ইতোমধ্যে কিছু পণ্যের শুল্ক প্রত্যাহার করেছে ।তবে খুচরা বাজারে যেন এসবের কোন প্রভাব দেখা যাচ্ছে না।এনিয়ে চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসন, চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশন, ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর, জেলা প্রশাসন, বিএসটিআই বিচ্ছিন্নভাবে অভিযান পরিচালনা করলেও এসব উদ্যোগের কার্যকর কোনো প্রভাব পরিলক্ষিত হচ্ছে না।

জানা যায়, গত ২২ মার্চ বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ে চিঠি দিয়ে সয়াবিন ও পাম তেলের দাম কমানোর সিদ্ধান্তের কথা জানায় বাংলাদেশ ভেজিটাবল অয়েল রিফাইনার্স অ্যান্ড বনস্পতি ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যাসোসিয়েশন। সেখানে বলা হয়- গত ৬ ফেব্রুয়ারি নির্ধারিত মূল্যতালিকা অনুযায়ী এতদিন পাম তেলের লিটারপ্রতি খুচরা মূল্য ছিল ১৩৩ টাকা, সেটা ২২ মার্চ থেকে ১৩০ টাকায় বিক্রি হবে।
এর আগে গত ২০ মার্চ মিল মালিকদের সঙ্গে বৈঠকে বোতলজাত সয়াবিন তেলের খুচরা মূল্য প্রতি লিটার ১৬৮ টাকা থেকে কমিয়ে ১৬০ টাকা নির্ধারণ করে দেয় বাণিজ্য মন্ত্রণালয়। পাঁচ লিটারের বোতলের দাম নির্ধারণ করা হয় ৭৬০ টাকা, যা এতদিন ৭৯৫ টাকা ছিল।তবে শুল্ক প্রত্যাহারের কারণে সয়াবিন ও পাম তেলের দাম কমানো হলেও খুচরা বাজারে তার কোনো প্রভাব পড়েনি।

শনিবার সকালে মহাম্মদপুর এলাকার মুদির দোকানে গিয়ে দেখা যায় ৫ লিটার বোতলজাত সয়াবিন তেল বিক্রি হচ্ছে ৭৭০ টাকা, প্রতিলিটার বিক্রি হচ্ছে ১৬৫ থেকে ১৭০ টাকায়। প্যাকেট ময়দা কেজি ৫৫ টাকা, খোলা ময়দা ৫০ টাকা, চিনি ৮০ টাকা, মিনিকেট সরু চাল ৭০ টাকা, পাইজাম মাঝারি চাল ৫৬ টাকা প্রতি কেজিতে বিক্রি হচ্ছ।

কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ক্যাব) চট্টগ্রাম বিভাগীয় সভাপতি এসএম নাজের হোসাইন বলেন, ব্যবসায়ীরা সবসময় সুযোগের অপেক্ষায় থাকেন। তারা বর্তমানে যে উচ্চমূল্যে জিনিসপত্র বিক্রি করছেন তা কিন্তু অনেক আগেই আমদানি করা হয়েছিল। তখন জিনিসপত্রের দাম এতো বেশি ছিল না। এছাড়া রমজান আর ইউক্রেনে রাশিয়ার আগ্রাসনের কারণে দাম বৃদ্ধির যে কথা বলা হচ্ছে তা পুরোপুরি সঠিক নয়। বাংলাদেশের বাজারে রমজান ও যুদ্ধের প্রভাব তেমন একটা পড়েনি। ব্যবসায়ীরা যুদ্ধের কথা বলে দাম বাড়িয়ে দিয়েছেন। কিছু পণ্যের দাম অযৌক্তিকভাবে বাড়ানো হচ্ছে।

এদিকে সরকার টিসিবি’র মাধ্যমে সারাদেশে এক কোটি স্বল্প ও নিম্ন আয়ের পরিবারকে সাশ্রয়ীমূল্যে পণ্য দিচ্ছে। এর মধ্যে চট্টগ্রাম জেলায় ৫ লাখ ৩৫ হাজার ৭২ পরিবারের মাঝে নায্যমূল্যে পণ্য বিক্রি করা হচ্ছে। আর এসব উপকারভোগীর বাইরে একটা অংশ নিয়মিত বাজারে গেলেও দামের দিকে তারা কোনো সাশ্রয় পাচ্ছে না। দোকানের নির্ধারিত দামে তাদের পণ্য কিনতে হচ্ছে।

এই বিষয়ে চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসক মুমিনুর রহমান বলেন,বাজার মনিটরিংয় আমাদের বেশ কয়েকটি টিম কাজ করছে।এই শুক্রবার থেকে সিটি করপোরেশন, বিএসটিআই,চেম্বারের সাথে সমন্বয় করে বাজার তদারকি করা হচ্ছে।এই বিষয়ে অনিয়ম করলে কোন ছাড় নেই।আর টিসিবির মাধ্যমে ন্যায্যমূল্যে লাখ লাখ পরিবারের মাঝে খাদ্যসামগ্রী দেয়া হচ্ছে।

তিনি বলেন, ২০ মার্চ থেকে এপর্যন্ত চট্টগ্রাম নগরের ৪১টি ওয়ার্ড, ১৫ উপজেলার ১৯১টি ইউনিয়ন ও ১৫টি পৌরসভায় ৩ লাখ ৩৪ হাজার ২৫৩টি পরিবারের মাঝে টিসিবির পণ্য বিক্রয় করা হয়েছে।সিটি করপোরেশন, উপজেলা প্রশাসন, পৌরসভা ও ইউনিয়ন পরিষদের সমন্বয়ে ট্যাগ টিম গঠন করে সুন্দরভাবে এই কার্যক্রম পরিচালনা করা হচ্ছে।

সম্পর্কিত পোস্ট

সর্বশেষ পোস্ট



Shares