বৃহস্পতিবার, ২৬ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ১৪ ফাল্গুন ১৪৩২

সত্যি সত্যিই চাকরি চলে গেল সেই দুদক কর্মকর্তার

প্রকাশ: ১৮ ফেব্রুয়ারি ২০২২ | ১২:৪৭ অপরাহ্ণ আপডেট: ১৮ ফেব্রুয়ারি ২০২২ | ১:৩৩ অপরাহ্ণ
সত্যি সত্যিই চাকরি চলে গেল সেই দুদক কর্মকর্তার

বিশেষ প্রতিনিধি

চট্টগ্রাম থেকে বদলি হয়ে পটুয়াখালীতে পোস্টিং হওয়া দুদকের  আলোচিত কর্মকর্তা শরীফ উদ্দিনের বাসায় গত ৩০ জানুয়ারি সন্ধ্যা ৭ টার দিকে কয়েকজনকে নিয়ে আসেন কর্ণফুলী গ্যাস ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি লি. (কেজিডিসিএল) সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. আইয়ুব খান। এসময় আইয়ুব খান  শরীফ উদ্দিনের কারণে তার অনেক ক্ষতি হয়েছে বলে জানিয়ে তাকে  হুমকি ধুমকি দিতে থাকেন। একপর্যায়ে ১ সপ্তাহের মধ্যে  তার চাকরিও ‘খেয়ে দিবেন’ বলে সাফ জানিয়ে  দেন।এই ঘটনার সিসিটিভি ফুটেজ সেসময় বিভিন্ন গণমাধ্যমে ফলাও করা হয়।সেটা নিয়ে শরীফ উদ্দিন থানায় একটি সাধারণ ডায়েরিও করেন।তবে শরীফ উদ্দিনের সেই জিডি অনুসারে  হুমকি দাতাদের বিরুদ্ধে কোন ব্যবস্থা  নেয়া না হলেও কেজিডিসিএল এর সাবেক এমডির কথা একদম  সত্যি হয়েছে।শরীফ উদ্দিনকে  চাকরি  বরখাস্ত করেছে দুদক কর্তৃপক্ষ।

বুধবার (১৬ ফেব্রুয়ারি) দুদক চেয়ারম্যান মোহাম্মদ মঈনউদ্দীন আবদুল্লাহ স্বাক্ষরিত এক অফিস আদেশে চাকরিচ্যুতির নোটিশ পান তিনি। আদেশটি ১৬ই ফেব্রুয়ারি থেকেই কার্যকর হওয়ার কথা বলা হয়েছে।

আদেশে বলা হয়, ‘দুর্নীতি দমন কমিশন (কর্মচারী) বিধিমালা, ২০০৮ এর বিধি ৫৪ (২) তে প্রদত্ত ক্ষমতাবলে মো. শরীফ উদ্দীন, উপ-সহকারী পরিচালক, দুদক, সমন্বিত জেলা কার্যক্রম, পটুয়াখালীকে চাকরি থেকে অপসারণ করা হলো। তিনি বিধি মোতাবেক ৯০ দিনের বেতন এবং প্রযোজ্য সুযোগ-সুবিধা পাবেন।’

জানা যায়,গত  ২০২০-২০২১  সালে বৃহত্তর চট্টগ্রামে দুর্নীতি বিরোধী অভিযান করে বেশ আলোচিত ছিলেন দুর্নীতি দমন কমিশন ( দুদক) এর চট্টগ্রাম সমন্বিত কার্যালয়ের উপ সহকারী পরিচালক মো. শরীফ উদ্দিন।এরমধ্যে শরীফের করা তদন্তে উঠে আসে,  কেজিডিসিএলের সাবেক এমডি আইয়ুব খান চৌধুরী রাষ্ট্রীয় এই প্রতিষ্ঠানে  অবৈধভাবে  তার  দুই ছেলে আশেক উল্লাহ চৌধুরীকে ডেপুটি ম্যানেজার পদে ও অপর ছেলে মহিউদ্দিন চৌধুরীকে অ্যাসিস্ট্যান্ট ম্যানেজার হিসেবে  নিয়োগ দিয়েছেন।দুটি নিয়োগের ক্ষেত্রেই দুর্নীতি ও জালিয়াতির আশ্রয় নেওয়া হয় বলে শরীফের তদন্তে উঠে আসে।

শরীফ দুদকের চট্টগ্রামে দায়িত্ব পালনকালে  বিভিন্ন সরকারি বেসরকারি কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে প্রায় ৫০ টি মামলা করেছিলেন।কক্সবাজারে কয়েকটি মেগা প্রকল্পে ভূমি অধিগ্রহণ বাবদ কয়েক শ কোটি টাকা আত্মসাৎ, চট্টগ্রাম মেডিকেলে অনিয়ম-দুর্নীতি, কর্ণফুলী গ্যাসে নিয়োগ দুর্নীতি, এনআইডি জালিয়াতি, রোহিঙ্গাদের ভোটার করা নিয়ে দুর্নীতি, ইয়াবা কারবারিদের গোপন সম্পদের অনুসন্ধান এরমধ্যে উল্লেখযোগ্য।এসব প্রভাবশালী ব্যক্তিদের নানামুখী চেষ্টায় তাঁকে গত বছরের জুন মাসে চট্টগ্রাম থেকে বদলি করা হয় পটুয়াখালী। এরপর আটকে দেওয়া হয়েছিল পদোন্নতিও।সর্বশেষ ১৫ ফেব্রুয়ারী  কোন ধরনের কারণ দর্শানোর নোটিশ না দিয়ে ও কোন ধরনের সুনির্দিষ্ট কারণ ছাড়াই  তাকে চাকরি থেকে বরখাস্ত করা হয়।

এই বিষয়ে শরীফ উদ্দিন বলেন, গত ৩০ জানুয়ারি সন্ধ্যায় আইয়ুব খান আরো কয়েকজনকে নিয়ে আমার বাসায় এসে আমাকে হেনস্তা করে ও এক সপ্তাহের মধ্যে আমাকে চাকরিচ্যুত করবে বলে হুমকি দেয়।আমাকে হত্যা  করবে বলেও জানানো হয়।তখন  আমি সিসিটিভি ফুটেজ নিয়ে সেই রাতেই খুলশী থানায় জিডি করি।কিন্তু তাদের বিরুদ্ধে কোন ব্যবস্থা নেয়া হয়নি।উল্টো  আইয়ুব খানের কথায় সত্য  সহয়েছে।এক সপ্তাহের মধ্যে না পারলেও ১৬ দিনের মাথায় আমার চাকরি এই প্রভাবশালীরা কেড়ে নিয়েছে।আমি  সততা ও  নিষ্ঠার সাথে রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব পালনের পুরস্কার শেষ পর্যন্ত এটাই পেলাম।’

তিনি বলেন, ‘ এরা আমাকে চাকরি থেকে বের করে দিয়েছে।এখন আমি জীবন নিয়েই শঙ্কিত। যেকোন মুহুর্তে আমাকে গুম করতে পারে। আমি ও আমার পরিবার গুম আতঙ্কের মধ্যে আছি।”

এদিকে কোন সুনির্দিষ্ট কারণ ছাড়াই চৌকস কর্মকর্তা শরীফ উদ্দিনের চাকরিচ্যুতি নিয়ে ক্ষুব্ধ  স্বয়ং দুদকের কর্মকর্তারা।তার অপসারণের প্রতিবাদে আজ দুপুর ১২টায় দুদকের প্রধান কার্যালয়ের সামনে সংস্থাটির কর্মকর্তা-কর্মচারীরা  মানববন্ধন করেন  ও  দুদক সচিব বরাবর স্মারকলিপি দেন।

  নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক দুদক চট্টগ্রামের এক কর্মকর্তা বলেন,’শরীফ উদ্দিন কাজের ক্ষেত্রে খুবই আন্তরিক ও পরিশ্রমী ছিল।সততা ও সাহসিকতার কারণে সাধারণ মানুষেরও আস্থা অর্জন করেছিল সে।আর তার সাথে এভাবে ন্যাক্কারজনক আচরণ করলে অন্য কর্মকর্তারা আর কাজ করতে সাহস পাবেন না।’

সুশাসনের জন্য নাগরিক ( সুজন) এর চট্টগ্রাম জেলার সেক্রেটারি আকতারুল কবির বলেন, দুদকের প্রতি মানুষের আস্থা এখন এমনিতেই তলানিতে।আর শরীফ উদ্দিনের এই ধরনের চাকরিচ্যুতি এই আস্থার কফিনের শেষ পেরেকই মনে হচ্ছে। এভাবে করলে এখানে  কেউ সততার সাথে কাজ করার সাহস পাবেন না।আমি আশা করছি দুদকের নীতিনির্ধারকরা এই গর্হিত সিদ্ধান্ত থেকে এখনই  সরে আসবেন।

সম্পর্কিত পোস্ট

সর্বশেষ পোস্ট



Shares