বুধবার, ২৫ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ১৩ ফাল্গুন ১৪৩২

সন্ত্রাসী সাজ্জাদের স্ত্রীর অন্ধকার জগৎ

প্রকাশ: ১৯ মার্চ ২০২৫ | ১০:৪২ পূর্বাহ্ণ আপডেট: ১৯ মার্চ ২০২৫ | ১০:৪৪ পূর্বাহ্ণ
সন্ত্রাসী সাজ্জাদের স্ত্রীর অন্ধকার জগৎ

নিজস্ব প্রতিবেদক 

চট্টগ্রাম নগরের শীর্ষ সন্ত্রাসী মো. সাজ্জাদ ওরফে ছোট সাজ্জাদকে ঢাকার বসুন্ধরা সিটি শপিং সেন্টার থেকে শনিবার রাতে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ।রোববার (১৬ মার্চ) তাকে চট্টগ্রামে আনার পর তার স্ত্রী তামান্না শারমিন বেজায় চটেছেন। ফেসবুক লাইভে এসে দেখিয়েছেন ‘টাকার গরম’। পাশাপাশি দিয়েছেন হুমকি। যারা তার স্বামীকে গ্রেপ্তার করেছে এবং করতে সহযোগিতা করেছে তাদেরকে দেখে নিবেন বলেও জানিয়েছেন এই লাইভে। তার সেই লাইভ দেশজুড়ে ভাইরাল হয় মুহুর্তেই।

এদিকে সংশ্লিষ্টরা জানান, মুরগির দোকানের কর্মচারী থেকে শীর্ষ সন্ত্রাসী হওয়া সাজ্জাদের স্ত্রীর পূর্ণ নাম তামান্না আহমেদ। তার পরিবার নগরের পূর্ব মাদারবাড়ী গাজীর ডিপু বাই লেইনে বসবাস করেন।মৃত ইউনুস ড্রাইভারের নাতনী ট্রাক কোম্পানি শফির মেয়ে এই তামান্না। ওই এলাকার বাদশা মিয়া সওদাগরের গলির রোকনের সাথে তার পারিবারিকভাবে একবার বিয়েও হয়েছিলো।

জানা যায়,তামান্নার বয়স প্রায় ৩৫। বাড়ি নগরীর সদরঘাট থানার মাদারবাড়ি এলাকায়। তার মা-বাবা বেঁচে আছেন। তবে তামান্নার সঙ্গে তেমন যোগাযোগ নেই বললেই চলে। তার পেশা ড্যান্সার বা নর্তকী। দুবাইয়ের বিভিন্ন নাইট ক্লাবে ড্যান্স করেন তিনি। ট্যুরিস্ট ভিসায় একবার দুবাই গিয়ে তিন মাস থাকেন। বিভিন্ন নাইট ক্লাবে ড্যান্সার হিসাবে চাকরি করেন। এরপর আবার দেশে ফিরে আসেন।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, তামান্না সাজ্জাদকে বিয়ে করেন ৫-৬ মাস আগে। রাউজানের একটি মসজিদে কাজী ডেকে তাদের বিয়ে পড়ানো হয়। পুলিশি তৎপরতা থাকায় ওইদিন তাদের ঘনিষ্ঠ কয়েকজন ছাড়া বাইরের কাউকে থাকতে দেওয়া হয়নি। এটি তামান্নার তৃতীয় বিয়ে আর সাজ্জাদের দ্বিতীয় বিয়ে। সাজ্জাদ প্রথমে শিলা নামে তৃতীয় লিঙ্গের একজনকে বিয়ে করে। শিলার বাড়ি হাটহাজারী উপজেলায়। তবে সে তৃতীয় লিঙ্গের হওয়ায় পরিবারের সঙ্গে হাটহাজারীতে বসবাস করত না।

গত ৩ ফেব্রুয়ারি রাঙামাটির কাউখালী উপজেলার বেতবুনিয়া এলাকা থেকে তার গলাকাটা লাশ উদ্ধার করা হয়। শিলা কাউখালী উপজেলার তৃতীয় লিঙ্গের লিডার হিসাবে পরিচিত ছিল। চার-পাঁচ বছর আগে শিলা সার্জারি করে শারীরিক পরিবর্তন ঘটানোর পর বিভিন্ন রকম স্টেজ শো করত বলে জানা গেছে।

এদিকে তামান্নার পরিবারের একজন সদস্য জানান, ২০২২ সালের পর ট্যুরিস্ট ভিসায় দুবাইয়ে যায় তামান্না। বিভিন্ন ক্লাবে নাচত। শীর্ষ সন্ত্রাসী সাজ্জাদও দুবাই যায়। সেখানে ড্যান্স ক্লাবে তাদের পরিচয় হয়। মোবাইল নম্বর দেওয়া-নেওয়া হয়। মাঝে-মধ্যে মোবাইল ফোনে তাদের মধ্যে কথা হতো। বিভিন্ন বিষয় নিয়ে ঝামেলার কারণে ২০২৩ সালের দিকে তাদের মাঝে সম্পর্কের অবনতি ঘটে। তখন প্রায় ছয় মাসের মতো কথা বলা বন্ধ ছিল। ২০২৪ সালের শুরুতে আবার সম্পর্ক উষ্ণ হয়।

কয়েকটি জানিয়েছেন, তামান্না চট্টগ্রাম মহানগর যুবলীগের উপ-অর্থ সম্পাদক হেলাল আকবর চৌধুরী বাবরের ডানহাত হিসেবে পরিচিত অমিত মুহুরীর বান্ধবী ছিলেন। ২০১৯ সালের ৩০শে মে অমিত মুহুরী চট্টগ্রাম কেন্দ্রীয় কারাগারে আরেক আসামির ইটের আঘাতে নিহত হন। কুমিল্লার একটি মাদকাসক্ত নিরাময় কেন্দ্রে থাকার পর জোড়া খুন মামলার আসামি অমিত ২০১৭ সাল থেকে কারাগারে ছিলেন। জানা গেছে, অমিতের সঙ্গে তামান্নার দীর্ঘ দিনের প্রেমের সম্পর্ক ছিল। তামান্না শারমিন এমইএস কলেজে পড়াকালীন নিজেও ছাত্রলীগের রাজনীতিতে যুক্ত ছিলেন। ওই সময় থেকেই অমিত মুহুরীর সঙ্গে প্রেমের সম্পর্কে জড়ান তামান্না।

তামান্না শারমিনের বিরুদ্ধে আছে বিস্তর অভিযোগ। একেকবার একেক যুবককে কথিত বিয়ে করার অভিযোগ আছে তার বিরুদ্ধে। বিয়ের পর ওই যুবকদের কাছ থেকে টাকা পয়সা হাতিয়ে সটকে পড়তেন তামান্না। সাজ্জাদও তার তেমনই এক স্বামী। বর্তমানেও তামান্নার আগের ঘরের এক সন্তান রয়েছে। তাকে অনেকে ‘লেডি ডন’ হিসেবে চিনে। বোয়ালখালীর মেয়ে তামান্না ছেলেদের মোটরসাইকেল চালানো ও কথাবার্তায় কঠোরতার জন্য লেডি ডন পরিচিতি পান।

তামান্নার এক প্রতিবেশী  জানিয়েছেন ,’ যুবলীগ নেতা হেলাল আকবর চৌধুরী বাবর ও নোয়াখালীর সাবেক এমপি একরামুল করিমের ভাই খলিলুর রহমান নাহিদের সাথে বিশেষ সখ্যতা ছিলো তামান্নার। বাবরের হাত ধরে সে বিভিন্ন সময় দুবাই শহরে যেত।দুবাইতে বারে সে ডান্সও করতো।তার বয়স কমপক্ষে ৩৫ বছর হলেও উচ্চ ম্যাকআপের কারণে সেটা বুঝা যায় না।তার প্রথম ঘরের কমপক্ষে ১২ বছরের একটা সন্তানও আছে।’

স্থানীয় এক বিএনপি নেতা জানান,চট্টগ্রাম মহানগর ছাত্রলীগের ক্রীড়া সম্পাদক আবু তারেক রনির সাথে দীর্ঘদিন ধরে সম্পর্ক ছিলো তামান্নার।এছাড়া মাঝিরঘাট এলাকার বাসিন্দা নগর জাসাসের এক শীর্ষ নেতার সাথে বিশেষ সম্পর্ক আছে তার।

জানা যায়, তামান্না শারমিন ও সাজ্জাদ দু’জনই বেপরোয়া জীবনযাপন করেন। চালান একাধিক ফেসবুক পেইজ, আইডি, টিকটক অ্যাকাউন্ট। নিয়মিত টিকটক করে আলোচনায় থাকেন তামান্না শারমিন। এ ছাড়াও সাজ্জাদও তার আইডি ও ‘অল ইটস হোপ’ নামে একটি ফেসবুক পেইজে পোস্ট করেন হরহামেশা। মূলত সাজ্জাদ বিএনপি ও ছাত্রদলকেন্দ্রিক পোস্ট এবং নিউজ শেয়ার করে বিএনপি’র প্রতি নিজের ভালোবাসার কথা জানান দেয়ার চেষ্টা করেন।

শরীরে ট্যাটু লাগানো, রকেট, স্টাইলিশ প্যান্ট ও জুতাই বলে দেয় সাজ্জাদ বিলাসী জীবনে অভ্যস্ত। একই হাল তার স্ত্রী পরিচয় দেয়া তামান্নারও। চুলে রঙ করে নিয়মিত টিকটকে হাজির হন সাবেক ছাত্রলীগ নেত্রী। সম্প্রতি পুলিশের কাজকেও সহজ করে দেয় তামান্না। তামান্নার একটি ভিডিও টিকটকসহ সোশ্যাল মিডিয়ায় ছড়িয়ে পড়ার পর পুলিশের হাতে আসে গুরুত্বপূর্ণ সূত্র। সেই সূত্র ধরেই তাকে গ্রেপ্তার করা হয়।

এদিকে অপরাধ প্রবণতায় সাজ্জাদের চেয়ে কম যায় না তামান্না শারমিন। গত ২৮শে জানুয়ারি রাত ১০টা ৩৯ মিনিটে ফেসবুক লাইভে এসে চট্টগ্রামের বায়েজিদ বোস্তামি থানা পুলিশের ওসিকে প্রকাশ্যে তুলে নিয়ে উলঙ্গ অবস্থায় পেটানোর হুমকি দেন সাজ্জাদ। একইভাবে সাজ্জাদকে ঢাকা থেকে গ্রেপ্তারের পর গ্রেপ্তারকারীদেরও দেখে নেয়ার হুমকি দেন তামান্না। বলেন, ‘এতদিন আমরা পালিয়ে ছিলাম, এবার তোমাদের পালানোর দিন শুরু। কাঁড়ি কাঁড়ি টাকা ঢেলে জামাইকে আমার কাছে নিয়ে আসবো ১৪ দিনের মধ্যে।’

তামান্নার পোস্ট করা ভিডিও থেকেই তাদের অবস্থান নিশ্চিত করে পুলিশ। ভিডিওতে থাকা একটি গাড়ি শনাক্ত করে বিআরটিএ থেকে মালিকের তথ্য সংগ্রহ করে পুলিশ। এরপর চালককে জিজ্ঞাসাবাদ করে জানা যায়, সাজ্জাদ ও তার স্ত্রী অক্সিজেন মোড় থেকে রাউজান গিয়েছিলেন। সিসিটিভি ফুটেজ বিশ্লেষণ করে তার অবস্থান নিশ্চিত করা হয়।

জানা যায়,গত ১২ই ডিসেম্বর সাজ্জাদকে ধরতে গিয়ে তামান্না শারমিনকে গ্রেপ্তার করে নিয়ে আসে পুলিশ। পরে ৬ই জানুয়ারি তিনি জামিনে বের হন। এরপর বায়েজিদ বোস্তামী থানার ওসি আরিফুর রহমান, আরও দুই এসআই ও অন্যান্য কয়েকজনের বিরুদ্ধে মামলা করেন তামান্না শারমিন। সেই মামলায় তিনি ওসির বিরুদ্ধে নিজের ভ্রূণ হত্যার অভিযোগ করেন। এ নিয়ে ফেসবুকে লাইভেও আসেন তিনি। যদিও ভ্রূণ হত্যার কোনো প্রমাণ তিনি উপস্থাপন করতে পারেননি।

এদিকে শীর্ষ সন্ত্রাসী ছোট সাজ্জাদ কোন দলের রাজনীতি করেন তা নিয়ে ধোঁয়াশা রয়েছে। অনেকেই বলেন, তিনি শিবিরের কর্মী। তবে তার ফেসবুকে এ সম্পর্কিত কোনো প্রমাণ মেলেনি। বিএনপি’র কেন্দ্রীয় সহ সাংগঠনিক সম্পাদক মীর হেলালের সঙ্গে তার একাধিক ছবি রয়েছে। বিএনপি’র এই তরুণ নেতার উদ্যোগে আয়োজিত সবক’টি প্রোগ্রামে সাজ্জাদ অংশ নিতেন। তারেক জিয়ার ছবি হাতে নিয়ে সমাবেশে গিয়ে ছবি পোস্ট করেন তিনি। নিয়মিতই ছাত্রদল ও বিএনপি’র সব ছবি, ভিডিও পোস্ট করে প্রচার চালান। তবে সে আরেক সন্ত্রাসী শিবির সাজ্জাদ খানেরও ঘনিষ্ঠ অনুসারী বলে পরিচিত।

জানা যায়,নগরীর পাঁচলাইশ, খুলশী, বায়েজিদ থানা এবং জেলার হাটহাজারী, ফটিকছড়ি ও আশেপাশের থানা এলাকাগুলোতে ব্যাপক ত্রাস সৃষ্টি করতো এই ছোট সাজ্জাদ। কোথাও নতুন ভবন উঠলে হাজির হতো চাঁদার দাবি নিয়ে। এছাড়াও কর্ণফুলীর কয়েকটি বালু মহালসহ অন্তত দশটি পয়েন্ট থেকে বিদেশে পলাতক সাজ্জাদকে ভিডিও কলে দেখিয়ে মাসিক হারে চাঁদা আদায় করতো ছোট সাজ্জাদ। চাঁদা আদায়কে কেন্দ্র করে আরেক শীর্ষ সন্ত্রাসী সরোয়ারের সঙ্গে তার বিরোধ চলছে। প্রায় সময় তাদের বিরুদ্ধে বিরোধকে ঘিরে ওইসব এলাকায় চলতো গোলাগুলি।

গেল বছরের ২৯ আগস্ট নগরের অক্সিজেন-কুয়াইশ সড়ক এলাকায় আনিস ও মাসুদ কায়সার নামে আওয়ামী লীগের দুজনকে গুলি করে হত্যা করে সাজ্জাদের ক্যাডাররা। ২১ অক্টোবর চান্দগাঁওয়ে তাহসীন নামে এক যুবককে গুলি করে হত্যা তার বাহিনী। গত বছরের ৫ ডিসেম্বর গ্রেপ্তার এড়াতে পাঁচতলা ভবন থেকে লাফিয়ে পালিয়ে যায় সাজ্জাদ । ওইদিন পুলিশকে লক্ষ্য করে গুলিও ছুড়েন সাজ্জাদ। এতে ২ পুলিশ ও ১ সোর্স আহত হন। এছাড়াও গত বছরের ১৪ ডিসেম্বর তৃতীয় লিঙ্গের শিলা ও আরেক নারীকে নিয়ে ফেসবুকে আপত্তিকর পোস্ট করেন সাজ্জাদ।

ওই পোস্টে তিনি লিখেন, ‘আমার চোখের সামনে পড়িস না, পড়লে তোদের বাবারা তোদেরকে আর বাঁচাতে পারবে না।’ পোস্টে ওই দুজনের ছবিতে লাল ক্রস চিহ্ন দেন। সেই পোস্টের এক মাস ১৯ দিন পর গত সোমবার সন্ধ্যায় রাঙামাটির বেতবুনিয়ার একটি বাসা থেকে পুলিশ শিলার লাশ উদ্ধার করে। এদিকে বায়েজিদ বোস্তামী থানার ওসি আরিফুর রহমানকে হুমকি দিয়ে ফেসবুকে নিয়মিত পোস্ট করতেন সাজ্জাদ।

একটি সূত্র জানিয়েছেন,গত শনিবার রাজধানীর বসুন্ধরা থেকে সাজ্জাদকে গ্রেফতারের সময় সাজ্জাদ ও তার স্ত্রো পুলিশকে ২০ লাখ টাকা অফার করে। কিন্তু তাদের সেই অফার গ্রহণ করেনি পুলিশ। সিএমপির উত্তর বিভাগের ডিসি আমিরুল ইসলামের নেতৃত্বাধীন টিম তাকে গ্রেফতার করে রোববার চট্টগ্রামে নিয়ে আসে। তাহসিন হত্যা মামলায় ৭ দিনের রিমান্ডে আনার পর ছোট সাজ্জাদকে জিজ্ঞাসাবাদ শুরু করেছে পুলিশ। আর তামান্না এখন কোথায় আছে, সেই তথ্য জানা যায়নি।

সম্পর্কিত পোস্ট

সর্বশেষ পোস্ট



Shares