মুনশী মোহাম্মদ উবায়দুল্লাহ
আজ ১৬ ডিসেম্বর। ১৯৭১ সালের আজকের এই দিনে মহান পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর শোষণ থেকে মুক্তি লাভ করে বাংলার মানুষ। আজ আমাদের বিজয়ের দিন।এ বিজয় শুধু আনন্দের নয়, এটি পরাধীনতার কবল থেকে মুক্তিলাভের বিজয়। পৃথিবীর সব ধর্ম-দর্শনে স্বাধীনতার অশেষ গুরুত্ব প্রদান করা হয়েছে। শান্তি ও মানবতার ধর্ম ইসলামেও রয়েছে স্বাধীনতার অপরিসীম গুরুত্ব। এই স্বাধীনতা মহান আল্লাহ’র পক্ষ থেকে ব্যক্তি, সমাজ, রাষ্ট্রের জন্য এক বিশেষ নেয়ামত। ইসলাম চায় সব মানুষ যেন শান্তিপূর্ণ ও স্বাধীনভাবে বসবাস করতে পারে। ইসলাম আমাদেরকে এ শিক্ষাই দেয়, আমরা যেন আমাদের ভূখণ্ড তথা মাতৃভূমিকে অত্যধিক ভালোবাসি। এটাই আমাদের প্রিয় রাসুল (সা.)-এর উত্তম আদর্শ।
দেশপ্রেম, রাষ্ট্রের প্রতি অকৃত্রিম ভালোবাসা হচ্ছে মুসলমানের চরিত্র। রাষ্ট্রের সঙ্গে কোনো সত্যিকার ঈমানদার গাদ্দারি করতে পারে না। সুতরাং এদেশের বিজয় দিবস আমাদের গৌরব, আমাদের অহঙ্কার। ইসলামে বিজয় ও স্বাধীনতার তাৎপর্য অপরিসীম। স্বাধীনতার ইসলামী স্বরূপ হচ্ছে, মানুষ মানুষের গোলামি করবে না; বরং একমাত্র তার সৃষ্টিকর্তার গোলামি করবে। এ লক্ষ্যে আমাদের মাতৃভূমি বাংলাকে স্বাধীন করার জন্য ত্যাগ করতে হয়েছে অনেক কিছু। দিতে হয়েছে লাখো প্রাণের তাজা রক্ত।
ইসলামে বিজয়ের রূপরেখা
স্বদেশপ্রেম প্রতিটি মানুষের স্বভাবজাত অভ্যাস, বিশেষত মুসলমানদের প্রতিটি রক্ত-কণিকায়ই দেশপ্রেমের শিহরন থাকা বাঞ্ছনীয়। আমাদের স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্ব রক্ষার পাশাপাশি স্বাধীনতা ও এ বিজয়কে অর্থবহ করতে দল-মত, ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে ঐক্যবদ্ধ ভূমিকা পালন করা, দেশ ও দেশের মানুষকে ভালো কিছু দেওয়ার মনমানসিকতা তৈরি করা উচিত। আল্লামা ইবনুল কাইয়িম জাওযি (রহ.) তার কালজয়ী গ্রন্থ ‘যাদুল মাআদ’-এর দ্বিতীয় খণ্ডে উল্লেখ করেন, ‘দশম হিজরিতে মক্কা বিজয়ের দিন রাসুল (সা.) একটি উটের ওপর আরোহিত ছিলেন। তাঁর চেহারা ছিল নি¤œগামী। আল্লাহর দরবারে বিনয়ের সঙ্গে তিনি মক্কায় প্রবেশ করেন। প্রথমে তিনি উম্মে হানির ঘরে প্রবেশ করেন। সেখানে আট রাকাত নফল নামাজ আদায় করেন। এ নামাজকে বলা হয় ‘বিজয়ের নামাজ’। এরপর তিনি হারাম শরিফে এসে সমবেত জনতার উদ্দেশে ভাষণ দেন।’ তিনি বলেন, ‘হে মক্কার কাফের স¤প্রদায়! তেরো বছর ধরে আমার ওপর, আমার পরিবারের ওপর, আমার সাহাবা (রা.)-এর ওপর নির্যাতনের যে স্টিম রোলার চালিয়েছ, এর প্রতিবদলায় আজ তোমাদের কী মনে হয়, তোমাদের থেকে প্রতিশোধ গ্রহণ করব?’ তারা বলল, ‘হ্যাঁ, আমরা কঠিন অপরাধী। কিন্তু আমাদের বিশ^াস, আপনি আমাদের উদার ভাই, উদার সন্তান। আপনি আমাদের সঙ্গে উদারতা ও মহানুভবতা প্রদর্শন করবেন। এটাই আমরা প্রত্যাশা করি।’ রাসুল (সা.) বললেন, ‘হ্যাঁ, আমি আজ তোমাদের সবার জন্য হজরত ইউসুফ (আ.)-এর মতো সাধারণ ক্ষমা ঘোষণা করলাম। যাও, তোমাদের থেকে কোনো প্রতিশোধ গ্রহণ করা হবে না।’ (সুনানে বায়হাকি : ৯/১১৮)
মুসলমানের বিজয়ের ধরন
প্রত্যেক জাতিরই বিজয় রয়েছে, মুসলমানেরও আছে। কিন্তু মুসলমানের বিজয় নানা দিক থেকে ভিন্ন ও স্বতন্ত্র্য। চিন্তা-আদর্শ, মূল্যায়ন, লক্ষ্য-উদ্দেশ্য, কর্মপন্থাসহ সব দিক থেকেই ভিন্ন মাত্রা ও ভিন্ন রকমের। কোরআনে কারিমে বিজয়ের দুটি রূপ স্পষ্টভাবে বর্ণনা করা হয়েছে- এক. স্বার্থ ও সাম্রাজ্যবাদী বিজয়, দুই. কল্যাণকামী ও আদর্শবাদী বিজয়। প্রথমটির ব্যাপারে আল্লাহ তায়ালা এরশাদ করেন, ‘রাজা-বাদশা যখন কোনো জনপদে প্রবেশ করে, তখন তা বিপর্যস্ত করে। সেখানকার মর্যাদাবান লোকদের অপদস্থ করে।’ (সুরা নামল : ৩৪)। এ ধরনের যুদ্ধ ও যুদ্ধজয় যত দেশে হয়েছে, সেখানে কত জনপদ তছনছ হয়েছে, কত মানুষের রক্ত প্রবাহিত হয়েছে, কত নারীর সম্ভ্রম ভূলুণ্ঠিত করেছে, তার ইয়ত্তা নেই। কিন্তু বিনিময়ে মানবতা শাসক-প্রভুর বদল ও শোষণের পালাবদল ছাড়া আর কিছুই পায়নি। এ কারণে বিজয়ের এ ধরনটি মানবতার বিজয় নয়, বরং নির্দিষ্ট গোষ্ঠী ও সম্প্রদায়ের বিজয়।
বিজয়ের আরেক রূপের ব্যাপারে আল্লাহ তায়ালা বলেন, ‘আমি এদেরকে পৃথিবীতে প্রতিষ্ঠা দান করলে এরা নামাজ আদায় করবে, জাকাত দান করবে এবং সৎকাজের আদেশ করবে ও অসৎ কাজ থেকে নিষেধ করবে। আর সব কর্মের পরিণাম আল্লাহর ইচ্ছাধীন।’ (সুরা হজ : ২২)। এ ধরনের বিজয় হচ্ছে সত্য ও আদর্শের বিজয়। মানব-মানবতা ও সততার বিজয়। মুসলিম হিসেবে আমাদের বিজয়ের গৌরববোধ থাকা উচিত। আর বিজয়ের দ্বিতীয় রূপটিই আমাদের আদর্শ ও মননে রাখা চাই। শুধু নীতিগত দিক থেকে নয়, বাস্তব ইতিহাসেও এ রূপটিই আমাদের বিজয়ের প্রকৃত রূপ।
বিজয় দিবসে মুসলমানের করণীয়
আল্লাহ তায়ালা এরশাদ করেন, ‘(হে নবী!) যখন আল্লাহর সাহায্য ও বিজয় আসবে, তুমি মানুষকে দলে দলে আল্লাহর দ্বীনে প্রবেশ করতে দেখবে, তখন তুমি তোমার প্রতিপালকের পবিত্রতা বর্ণনা করো; তাঁর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করো। নিশ্চয়ই তিনি ক্ষমাশীল।’ (সুরা নাসর : ১-৩)। মহান রাব্বুল আলামিন বিজয় দিবসে তিনটি কর্মসূচি এ সুরায় ঘোষণা করেছেন। সেগুলো হচ্ছে- এক. ‘ফাসাব্বিহ’ তথা আল্লাহর তাসবিহ পাঠ ও পবিত্রতা বর্ণনা করা। দুই. ‘বিহামদি রাব্বিক’ তথা অর্থাৎ আল্লাহর হামদ ও শোকরিয়া আদায় করা। তিন. ‘ওয়াস্তাগফিরহু’ তথা যুদ্ধের সময় ভুল-ভ্রান্তি তথা সীমা লঙ্ঘন থেকে আল্লাহর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করা। স্বাধীনতা ও বিজয় একমাত্র মহান করুণাময় আল্লাহ তায়ালারই দান। আল্লাহর অশেষ করুণার বদৌলতেই আমরা এদেশ বিজয় করতে পেরেছি। তাই শোকরিয়াও আদায় করতে হবে একমাত্র তাঁরই।
আর হাদিস থেকে জানা যায়, বিজয় দিবসে আট রাকাত নামাজ আদায় করা, যুদ্ধে নিহতদের জন্য ইস্তেগফার-দোয়া ও কোরআন পাঠসহ বিভিন্নভাবে ইসালে সওয়াব করা কর্তব্য। কেননা মক্কা বিজয়ের দিন রাসুল (সা.) দশ বছর পর শত-সহস্র সাহাবায়ে কেরাম (রা.)- এর বিশাল বহর নিয়ে যখন পবিত্র মক্কা নগরীতে প্রবেশ করলেন, তখন তিনি বিজয়ের আনন্দে ঔদ্ধত্য প্রকাশে বা উল্লাসে ফেটে পড়েননি, গর্ব-অহঙ্কার করেননি; বরং তিনি একটি উটের ওপর আরোহিত অবস্থায় চেহারা নিম্নগামী করে অত্যন্ত বিনয়ের সঙ্গে মক্কায় প্রবেশ করেছিলেন। অন্তরে ছিল মহান আল্লাহর স্মরণ এবং মুখে ছিল শুকরিয়া প্রকাশ। এরপর সর্বপ্রথম তিনি উম্মে হানির ঘরে প্রবেশ করে আট রাকাত নফল নামাজ আদায় করেন। এতে বিজয় দিবসে মহান আল্লাহর দরবারে কৃতজ্ঞতা প্রকাশে এভাবে নফল নামাজ আদায় করা ইসলামের শিক্ষা বলে পরিগণিত হয়।
