বৃহস্পতিবার, ২৬ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ১৪ ফাল্গুন ১৪৩২

সুপ্রিমকোর্টের আদেশ বৃদ্ধাঙ্গুল দেখিয়ে তেল বিক্রি করছে সল্টগোলার ইমাম শরীফ ফিলিং স্টেশন

প্রকাশ: ২৯ মার্চ ২০২২ | ৬:২০ অপরাহ্ণ আপডেট: ২৯ মার্চ ২০২২ | ৭:২৬ অপরাহ্ণ
সুপ্রিমকোর্টের আদেশ বৃদ্ধাঙ্গুল দেখিয়ে তেল বিক্রি করছে সল্টগোলার ইমাম শরীফ ফিলিং স্টেশন

নিজস্ব প্রতিবেদক


চট্টগ্রাম নগরের সল্টগোলা ক্রসিং এলাকার রাষ্ট্রয়াত্ত যমুনা অয়েল কোঃ লিঃ এর ডিলার ইমাম শরীফ ফিলিং স্টেশনে কাগজে-কলমে বন্ধ রয়েছে তেল সরবরাহ। বাস্তবেও তেল সরবরাহ করছে না বলে দাবি যমুনা অয়েল কর্তৃপক্ষের (জেওসিএল)। তারপরও ফিলিং স্টেশনটিতে চলছে তেল বিক্রি। অভিযোগ রয়েছে বিভিন্ন জায়গা থেকে চোরাই তেল সংগ্রহ করেই বেচা-বিক্রি অব্যাহত রেখেছে প্রতিষ্ঠানটি। সরেজমিনেও এই অভিযোগের সত্যতা মিলেছে।

জানা যায়, ১৯৬৮ সালে ইন্দোবার্মা পেট্রোলিয়াম কোম্পানি লিমিটেড (আইবিপিসিএল) চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ থেকে দক্ষিণ হালিশহর মৌজা এলাকায় শূন্য দশমিক ২৮ একর জায়গা ইজারা নেয়। (আইবিপিসিএল) উক্ত জায়গায় মরহুম ইমাম শরীফ সওদাগর নিজস্ব অর্থায়নে ফিলিং স্টেশন গড়ে তোলার জন্য ১৯৬৮ সালে চুক্তি করেন। এরপর থেকে ইমাম শরীফ সওদাগর প্রতিষ্ঠানটি পরিচালনা করতে থাকে। তার মৃত্যুর পর থেকে ফিলিং স্টেশনটির পরিচালনা নিয়ে উত্তরাধিকারদের মধ্যে দ্বন্দ্ব শুরু হয়। একপর্যায়ে
গত ৮ মার্চ যমুনা ওয়েল কোঃ লিঃ ৪৯৩ তম পর্ষদ সভায় ‘মেসার্স ইমাম শরীফ ফিলিং স্টেশন’বর্তমান পরিচালনাকারী মুসলিম খানের ছেলে এহেতেশাম রসুল খান (রনি)’র সঙ্গে রিটেইলার ডিলারশীপ লাইসেন্স ফর ফিলিং স্টেশন চুক্তি বাতিল করে ফিলিং স্টেশনে তেল সরবরাহ বন্ধ করে দেয় যমুনা ওয়েল কোঃ লিঃ। তবে মুল সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান থেকে তেল না পেলেও ঠিকই তেল বিক্রি অব্যাহত রেখেছে ফিলিং স্টেশনটির বর্তমান কর্তারা। সরেজমিনে গিয়েও অভিযোগের সত্যতা মিলে।

রোববার (২৭ মার্চ) সরেজমিন সল্টঘোলা এলাকায় অবস্থিত ফিলিং স্টেশনটিতে দেখা গেছে, একটি ট্রাক (চট্টমেট্রো-ট ১১-০৯৬২) থেকে স্টোরেজে লোড করা হচ্ছে তেল। একই সময়ে ফিলিং স্টেশনে বিভিন্ন গাড়িতে তেল বিক্রি হচ্ছে একেবারে স্বাভাবিক নিয়মে।

জানা যায়, ফিলিং স্টেশনটির প্রথম ডিলার ইমাম শরীফের মৃত্যুর পর সম্পত্তির ভাগ-বাঁটোয়ারা নিয়ে আদালতে একাধিক মামলা দায়ের হয়। এর মধ্যে ১৯৯৮ সালের ১৫ মার্চ উচ্চ আদালত ইমাম শরীফ ফিলিং স্টেশনটিতে রিসিভার নিয়োগের নির্দেশ দেন। ১৯৯৮ সালে হাইকোর্টে দেওয়া সেই আদেশের পর রিসিভার হিসেবে নিজেকে নিয়োগ দিতে মুসলিম খান আবেদন করেন। তবে আদালত মুসলিম খানের আবেদন খারিজ করে দেয়। অ্যাডভোকেট মাহমুদুর রহমান নামে এক আইনজীবীকে রিসিভার নিয়োগ প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে বলে আদালত। আদালতের আদেশ পাওয়ার পরও দখলে থাকা মুসলিম খান ও যমুনা অয়েল কোঃ লিঃ অসহযোগিতায় রিসিভার নিয়োগ প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে পারেনি অ্যাডভোকেট মাহমুদুর রহমান।

এদিকে দেশের সর্বোচ্চ আদালতের আদেশ অমান্য করে যমুনা অয়েল কোঃ লিঃ কর্তৃপক্ষ মুসলিম খান এবং তার মৃত্যুর পর ছেলে এহেতাশাম রসুল খানকে দিয়ে ব্যবসা পরিচালনা করতে থাকে। তবে বছরের পর বছর নিজেদের বাবার ব্যবসা প্রতিষ্ঠান আলহাজ্ব মোঃ মহসীন খানকে বঞ্চিত করে মুসলিম খানের একাই ভোগ করার বিষয়ে সম্প্রতি সরকারের সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন দপ্তরে অভিযোগ রয়েছে। মোহাম্মদ মহসীন খানের অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম কর্পোরেশনের একটি তদন্ত টিম গঠন করে। তদন্ত শেষে তারা একটা প্রতিবেদন পেশ করে। প্রতিবেদনে যমুনা অয়েল কোঃ লিঃ কর্তৃপক্ষের কিছু অসাধু কর্মকর্তার যোগসাজশ মুসলিম খান ও তার ছেলেরা একাই ফিলিং স্টেশন ভোগদখল করছে বলে উল্লেখ করা হয়।

এদিকে প্রয়াত মুসলিম খানের পুত্র গত ৮ই মার্চ যমুনা অয়েল কোঃ লিঃ ৪৯৩তম পর্ষদ সভার ডিলারশীপ লাইসেন্স বাতিল Challenge করে মহামান্য হাইকোর্টে রিট পিটিশন ৩৬৮৭/২২ দায়ের করেন। উক্ত মামলায় জ্বালানি সচিব , চেয়ারম্যান বিপিসি ও যমুনা, এমডি যমুনা বাদী করা হয়। ১৫ মার্চ হাইকোর্টে শুনানীকালে সরকার পক্ষের আইনজীবী (ডিআইজি) বিরোধিতার কারণে ডিলারশীপ লাইসেন্স বাতিলের আদেশ বহাল রাখেন। তবে দেশের সর্বোচ্চ আদালতের আদেশকে বৃদ্ধাঙ্গুল প্রদর্শন করে এহেতেশাম রসুল খান রনি অবৈধ জ্বালানি তেল বিক্রয় ও সরবরাহ অব্যাহত রেখেছেন।

এদিকে যমুনা অয়েল কর্তৃপক্ষের সরবরাহ বন্ধ করে দেয়ার পরও ফিলিং স্টেশন চালু রাখার বিষয়ে জানতে চাইলে বর্তমানে প্রতিষ্ঠানটি পরিচালনার দায়িত্বে থাকা এহেতাশাম রসুল খান গণমাধ্যমকে বলেন, ‘জেওসিএল কর্তৃপক্ষ আমার সঙ্গে চুক্তি বাতিল করেছে। ফিলিং স্টেশনে তেল সরবরাহ বন্ধ রয়েছে। আমি জেওসিএলের আদেশকে চ্যালেঞ্জ করে হাইকোর্টে রিট পিটিশন দায়ের করেছি। আপাতত ফিলিং স্টেশনের স্টোরেজে থাকা তেল বিক্রি করা হচ্ছে।’ তবে স্টোরেজে ট্রাকযোগে এনে তেল কেন লোড করা হচ্ছে জানতে চাইলে তিনি এর কোনো সদুত্তর দেননি।

জানতে চাইলে ইমাম শরীফের ছেলে মহসিন খান বলেন, ‘আমার আব্বা মারা যাওয়ার পর থেকে মুসলিম খান এবং তার ছেলে ফিলিং স্টেশনটি অন্যান্য ভাইদের বঞ্চিত করে ব্যবসা করে আসছে। আমরা এ বিষয়ে আদালতের দ্বারস্থ হয়েছি। আদালত প্রতিষ্ঠানটিতে রিসিভার নিয়োগ করে লভ্যাংশ ভাইদের মধ্যে বণ্টন করে দিতে বলেছেন। তবে প্রায় দুই যুগ পেরিয়ে গেলে আদালতের সেই আদেশ বাস্তবায়ন হয়নি। সম্প্রতি আমরা অভিযোগ দিলে যমুনা কর্তৃপক্ষ তেল সরবরাহ বন্ধ করে দেয়। এরপরও চোরাই তেল দিয়ে বিক্রি অব্যাহত রেখেছে বর্তমানে দখলে থাকা লোকজন। বিষয়টি আমরা যমুনা কর্তৃপক্ষকে জানিয়েছি। তবে এসবের পরও দৃশ্যমান কোনো ব্যবস্থা নিতে দেখা যাচ্ছে না।’

এ বিষয়ে জানতে জেওসিএলের মহাব্যবস্থাপক (মার্কেটিং) মো. আইয়ুব হোসেন বলেন, আমরা কাগজে-কলমে চুক্তি বাতিল করেছি। তেল সরবরাহও বন্ধ করে দিয়েছি। এখন তারা কীভাবে তেল বিক্রি করছে আমরা জানি না।

সম্পর্কিত পোস্ট

সর্বশেষ পোস্ট



Shares