বিশেষ প্রতিনিধি
চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডের বিএম কনটেইনার ডিপোর আগুন শেষ পর্যন্ত নিয়ন্ত্রণে এসেছে। আগুন লাগার তিন দিনের মাথায় মঙ্গলবার সেনাবাহিনীর পক্ষ থেকে আগুন নিয়ন্ত্রণে আসার কথা গণমাধ্যমকে জানানো হয়।তবে এটাও জানানো হয়, কয়েকটি কনটেইনারে আগুন বন্ধ হচ্ছে না।তবে সেখান থেকে আর বড় বিষ্ফোরণের সম্ভাবনা নেই। এই সেনাকর্মকর্তার বক্তব্যের সত্যতাও পাওয়া গেছে।মঙ্গলবার রাত ১০ টায় এই রিপোর্ট লেখা পর্যন্ত কোন বিষ্ফোরণের খবর পাওয়া যায়নি।তবে কয়েকটি কনটেইনার থেকে উড়ছে ধোঁয়া, সাথে চলছে ফায়ার সার্ভিস, পুলিশ ও সেনাবাহিনীর যৌথ উদ্ধার কাজ।আর এই সময়ে উদ্ধার করা হয়েছে আরও দুইজনের ভস্মীভূত লাশ,বেশ কয়েকটি হাড়ের খণ্ড।
মঙ্গলবার বেলা সাড়ে ১১টায় সেনাবাহিনীর ২৪ পদাতিক ডিভিশনের ১৮ ব্রিগেডের কমান্ডিং অফিসার লেফটেন্যান্ট কর্নেল আরিফুল ইসলাম হিমেল বলেন, এখন যে আগুনটা আছে তা প্রায় পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে।এখান থেকে আর কোনোভাবে আগুন ছড়ানোর সুযোগ নেই।কিছু কনটেইনার জ্বলছে।তবে আমরা নিশ্চিত হয়েছি এখানে কোন বিষ্ফোরক নেই।কাজেই এখান থেকে আর আগুন ছড়ানোর সুযোগ নেই।তবে কয়েকটি কনটেইনারে এখনও জ্বলছে।সেগুলো আস্তে ধীরে বন্ধ হয়ে যাবে।আর এসব জ্বলন্ত কনটেইনারের পাশে কিছু ভালো কনটেইনার ছিল। সেগুলো আমরা পৃথক করে রেখেছি। যাতে আগুনটা আর না বাড়ে এবং ক্ষয়ক্ষতি না হয়।
তিনি বলেন,এই ডিপো এলাকাটি প্রায় ২৬ একর জায়গার উপর অবস্থির।ঘটনার সময়ই সেখানে প্রায় ৪ হাজার কনটেইনার ছিলো।কনটেইনারগুলো একটির পর আরেকটি লাগানো ছিল। কনটেইনারগুলো নিচে নামিয়ে কাজ করতে সময় লেগেছে বেশি।আর কোন কনটেইনারে বিষ্ফোরক ছিলো সেটা নিশ্চিত না হওয়ার কারণেও আমাদের বেকায়দায় পড়তে হয়েছে।
এদিকে ফায়ার সার্ভিস সূত্রে জানা যায়,আগুন নিয়ন্ত্রণের পর মূল অগ্নিকাণ্ডের স্থান থেকে দুটি মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। এছাড়া উদ্ধার করা হয়েছে বেশকিছু হাড়।উদ্ধারকৃত লাশের মধ্যে একটা ফায়ার সার্ভিস কর্মীর বলে ধারণা করা হচ্ছে।তবে লাশ অনেকটা পুড়ে কঙ্কাল হয়ে যাওয়ায় বিষয়টি নিশ্চিত হওয়া যায়নি।
ফায়ার সার্ভিসের উপপরিচালক আনিসুর রহমান বলেন, আগুন বলতে গেলে নিয়ন্ত্রণে চলে এসেছে।এখন উদ্ধার অভিযান চলছে।এই পর্যন্ত ৪৩ জনের লাশ উদ্ধার করা হয়েছে।আজ সকালেই দুইটা লাশ ও কিছু হাড়গোড় পাওয়া গেছে।লাশের সংখ্যা আরো বাড়বে।আর এই ঘটনায় আহত হয়েছে তিন শতাধিক।এরমধ্যে প্রায় সবাই হাসপাতালে ভর্তি আছেন ।
তিনি বলেন,ফায়ার সার্ভিসের ৯ কর্মী নিহত হয়েছেন। ১২ জন সিএমএইচে চিকিৎসা নিচ্ছেন। তিনজন এখনও নিখোঁজ আছেন। তাদের পরিবারের সদস্যরা এসে ডিএনএ পরীক্ষার জন্য নমুনা দিয়েছেন।
ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ কতো হতে পারে বলে জানতে চাইলে।তিনি বলেন, ‘ বিষয়টি এখনও বলা যাচ্ছে না।কর্তৃপক্ষ এখনও বিষয়টি খোলাসা করে নি।তবে এতটুকু বলতে পারি ওই প্রতিষ্ঠানের স্থাবর সম্পত্রি বাবদ খরচ হয়েছে কয়েক হাজার কোটি টাকা।আর এতোগুলো মানুষ লাশ হলো, এখনও অনেকেই নিখোঁজ আছেন।পঙ্গু হয়ে হাসপাতালে কাতরাচ্ছেন এতগুলো মানুষ।সেগুলো আপনি টাকায় হিসাব করবেন কিভাবে? ‘
এদিকে এই ঘটনায় এখনও কোন মামলা হয়নি।এছাড়া কেউ অভিযোগও দায়ের করেন নি।তবে বিভাগীয় কমিশনার, জেলা প্রশাসন, ফায়ার সার্ভিস আলাদাভাবে মোট ৩ টি তদন্ত কমিটি গঠন করেছে। বিএম ডিপো কর্তৃপক্ষও একটা আলাদা কমিটি গঠন করেছে।ঘটনায় নিহত ও আহতদের জন্য সরকারি ও বেসরকারিভবে অনুদান দেয়া হয়েছে।এরমধ্যে ডিপো কর্তৃপক্ষ নিহত চাকুরেদের পরিবারের জন্য জন্য ১০ লাখ ও আহতদের জন্য ৫ লাখ করে ক্ষতিপূরণ দিয়েছে।এছাড়া ফায়ার সার্ভসের নিহত ও আহত কর্মীদের জন্যও বড় অঙ্কে অনুদান ঘোষণা করেছে প্রতিষ্ঠানটি।
এই ঘটনায় কোন মামলা হয়েছে কিনা জানতে চাইলে চট্টগ্রাম জেলা পুলিশ সুপার এস এম রশিদুল হক বলেন, বিষয়টি তদন্তাধীন আছে।কয়েকটি সংস্থা তদন্ত কমিটি গঠন করেছে। তদন্ত কমিটি গুলোর সুপারিশের আলোকে দোষীদের আইনের আওতায় আনা হবে।
এদিকে সীতাকুণ্ডের বিএম কন্টেইনার টার্মিনালের অগ্নিকাণ্ডের ঘটনাকে নিছক অগ্নি দুর্ঘটনা কিনা তা নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করেছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল।মঙ্গলবার ঢাকায় ফায়ার সার্ভিস সদরদপ্তরে নিহত ফায়ার ফাইটার মো. শাকিল তরফদারের জানাজায় অংশগ্রহণ শেষে তিনি সাংবাদিকদের বলেন,দুটি উচ্চপর্যায়ের তদন্ত দল দুর্ঘটনাস্থলে কাজ করছে। তদন্তের ফল প্রকাশ না পাওয়া পর্যন্ত কার গাফিলতি কিংবা নাশকতা বা উদ্দেশ্যপ্রণোদিত ঘটনা কি না তা বলতে পারছি না। কিছু একটা ঘটেছে, তা না হলে এত প্রাণ যায় না, এটাও আমি বিশ্বাস করি।
এদিকে আবার মঙ্গলবার দুপুর ১২টার দিকে চট্টগ্রাম বন্দরের ৭ নম্বর ইয়ার্ডের একটা কনটেইনারে হঠাৎ ধোঁয়া উঠতে থাকে। এ সময় কর্মরত শ্রমিকদের মাঝে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। পরে সেটি নিরাপদ জায়গায় সরিয়ে নেওয়া হয়।পুরনো এই কন্টেইনারে এসিড জাতীয় পদার্থ ছিলো।
এ বিষয়ে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের সচিব ওমর ফারুক বলেন, ‘দুপুর ১২টার দিকে বন্দরের ৭ নম্বর ইয়ার্ডে এক কর্মী পুরনো এই কন্টেইনার থেকে ধোঁয়া উঠতে দেখেন। এরপর আমরা দ্রুত কন্টেইনারটি নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নিয়েছি। এখন বন্দর চেয়ারম্যানের নির্দেশে কন্টেইনারটি আলাদা করে বন্দরের ভেতরের অকশন গোলায় নিষ্পত্তির জন্য কাস্টমস কর্তৃপক্ষকে হস্তান্তর করা হয়েছে।
