বৃহস্পতিবার, ২৬ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ১৪ ফাল্গুন ১৪৩২

সাকিবের পথেই কি তামিম?

প্রকাশ: ১৯ অক্টোবর ২০২৫ | ৭:৫৭ অপরাহ্ণ আপডেট: ১৯ অক্টোবর ২০২৫ | ৭:৫৭ অপরাহ্ণ
সাকিবের পথেই কি তামিম?
আহনাফ হাসান
চট্টগ্রাম নগরীর কাজীর দেউড়ি মোড় থেকে এক মিনিট দক্ষিণে হাঁটলেই দেখা যাবে পশ্চিমে মুখ করে চলে গেছে ছোট্ট এক শহুরে গলি। সেই গলি ধরে দু’পা সামনে বাড়ালেই চোখে ধরা দেবে দেশের ক্রিকেট আবেগের সবচেয়ে বড় ঠিকানাটি। লাল রংয়ের টাইলসে মোড়ানো পাঁচতলা ভবন। এই বাড়ি থেকেই বেরিয়ে এসেছিল এমন এক ব্যাটসম্যান, যার শটের ফল্গুধারায় উল্লাসে কেঁপে উঠত পুরো দেশ, যার দুঃখের দিনে চোখ ভিজত সবার। শহরের এই বিখ্যাত বাসিন্দার নাম কি আর বলতে হয়? নামটা তামিম ইকবাল, চট্টগ্রামের আবেগের ‘খানসাহেব’।
কিন্তু আজ প্রশ্ন উঠছে-সেই প্রিয়মুখ তামিমকে নিয়ে। তিনি কি ধীরে ধীরে সরে যাচ্ছেন ভক্তদের হৃদয়ের নিঃশর্ত ভালোবাসার আসন থেকে? তিনি কি নাম লিখছেন সাকিব আল হাসান ও মাশরাফি বিন মুর্তজার পাশে, যাদের জন্য এখন বরাদ্দ শুধুই দুয়োধ্বনি? তামিম ইকবালের ক্রিকেট থেকে অবসর নিয়ে কম নাটক হয়নি। এবার বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের নির্বাচন নিয়েও বহু ‘নাটক করলেন’ বলে তাঁর দিকে অভিযোগ উঠছে। শুরুতে নির্বাচনকে ঘিরে বাংলাদেশ ক্রিকেটের আরেক বড় চরিত্র আমিনুল ইসলাম বুলবুলের সঙ্গে অনেকটা মুখোমুখি অবস্থানে চলে যান তামিম। সেখানেই থেমে থাকেনি বিষয়টি।
তামিম এক সংবাদ সম্মেলনে নিয়ে যান বিএনপি নেতা ইশরাক হোসেনকে। সেখানে ‘প্রয়োজনে বিসিবি ঘেরাও করা হবে’ বলেও হুঁশিয়ারি দেন বিএনপির তরুণ নেতা সাদেক হোসেন খোকাপুত্র ইশরাক। এর ফলে বিসিবি নির্বাচন ঘিরে তামিম-বুলবুল দ্বন্দ্ব আর ক্রিকেট বোর্ডের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকেনি, অনেকেই এখানে খুঁজে পান ক্রীড়া উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদের সঙ্গে বিএনপির ইশরাক হোসেন দ্বন্দ্বের সমীকরণ, যা এর আগে বেশ কিছু ঘটনায় দেখা গিয়েছে। একপর্যায়ে আসিফও বলে দেন, ‘নির্বাচনকে ঘিরে বেশ কিছু বিষয়ে তামিমকে সামনে রেখে সুবিধা আদায় করতে চাইছে একটা পক্ষ। তামিমকে সামনে রেখে সন্ত্রাসী কার্যক্রম হচ্ছে।’ এরপর নানা নাটকীয়তায় অনেকটাই কোনঠাসা হয়ে পড়েন তামিম। যার শেষ ‘পরিণতি’ ঘটলো নির্বাচন থেকে সরে আসার মধ্যে দিয়ে।
বাংলাদেশ ক্রিকেটের ইতিহাসে খেলোয়াড়দের রাজনৈতিক উপস্থিতি নতুন কোনো বিষয় নয়। তবে যেভাবে বিসিবি নির্বাচন ঘিরে তামিম ইকবাল ‘রাজনৈতিক ছায়া’ব্যবহার করতে চেয়েছেন, তা সমালোচনার ঝড় তুলেছে। প্রিয় খেলোয়াড়েরা মাঠের বাইরে রাজনৈতিক প্রভাব নিয়ে এগোতে চাইলে ক্রিকেটের ভাবমূর্তি কি ক্ষুণ্ণ হয় না-এই প্রশ্ন এখন ঘুরপাক খাচ্ছে। গত কয়েক মাস ধরে বিসিবির নির্বাচনকে ঘিরে নানা আলোচনায় বারবার তামিম ইকবালের নাম উঠে এসেছে। সবাই ভেবেছিল নিজের জনপ্রিয়তা ও ক্রিকেটে অর্জিত সুনামকে নির্বাচন প্রক্রিয়ায় ব্যবহার করে এগিয়ে যাবেন তামিম। কিন্তু সবাই দেখলেন, তামিমের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম থেকে শুরু করে গণমাধ্যমে দেওয়া সাক্ষাৎকার-সবই যেন এক সূত্রে আবদ্ধ, যেখানে তামিম শুধু একজন ক্রিকেটার নয়, বরং ‘ছায়া রাজনৈতিক শক্তি’ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হওয়ার চেষ্টা করেছেন। এই ধরনের প্রচেষ্টা তামিমের ভক্তদের মধ্যে বিভ্রান্তি এবং সমালোচকদের মধ্যে সন্দেহ উস্কে দিয়েছে।
তামিমের এই পদক্ষেপ অনেকের কাছে সাকিব আল হাসান-মাশরাফির সঙ্গে তুলনাযোগ্য মনে হচ্ছে। সাকিব-মাশরাফি খেলোয়াড় থাকার সময়েই রাজনৈতিকভাবে সক্রিয় হন। আওয়ামী লীগের প্রশ্নবিদ্ধ নির্বাচনের মাধ্যমে এমপিও হয়ে বসেন। চব্বিশের ঐতিহাসিক বিপ্লবে যখন ছাত্রজনতার রক্ত ঝরছে রাজপথে, তখন তাদের মৌন থাকা বাংলাদেশের মানুষের হৃদয় থেকে তাদের নাম অনেকটাই মুছে গেছে। সেইদিক থেকে তামিমের প্রতি সব পক্ষের আলাদা সমীহ ছিল, ছিল ভালোবাসাও। কিন্তু একটা রাজনৈতিক দলের ছায়ায় থেকে যেভাবে তিনি বিসিবির নির্বাচনী বৈতরণী পার হতে চেয়েছিলেন তা মানুষকে হতাশ করেছে। উপমহাদেশের অন্য দেশগুলোর মতো বাংলাদেশেও ক্রিকেট শুধু খেলা নয়; এটি একটি সামাজিক ও সাংস্কৃতিক প্রতীক। এই প্রতীককে রাজনৈতিক প্রভাবের ছায়া দিয়ে ব্যবহার করলে খেলা ও খেলোয়াড়দের গ্রহণযোগ্যতা ক্ষুণ্ণ হয়ে যায়। এখানে মানুষ যেমন কোনো তারকাকে মাথায় তোলেন, আবার নিচেও নামান।
রাজনীতি সচেতনরা বলছেন, খেলোয়াড়রা যখন রাজনৈতিক প্রভাবের মধ্যে প্রবেশ করেন, তখন তারা অনিচ্ছাকৃতভাবে সমাজে বিভাজনও তৈরি করেন। ভক্তরা ভিন্ন ভিন্ন দলের হলেও ক্রিকেটারদের তারা অভিন্ন দেখতে চান। ক্রিকেটাররাও কোনো রাজনৈতিক দলের প্রতি অনুরক্ত হতে পারেন। তবে কোনো ক্রিকেটার যখন সরাসরি রাজনীতিতে নেমে পড়েন তখন আর সেটি কতটা ভালোভাবে নেয়, তা সাকিব-মাশরাফির বেলাতেই দেখা গেছে।
অবশ্য তামিমের পক্ষেও যুক্তি রয়েছে। তাঁর মতে, ক্রিকেটের উন্নয়নে সরাসরি অভিজ্ঞ খেলোয়াড়দের অংশগ্রহণ অপরিহার্য। বোর্ডে অভিজ্ঞ ক্রিকেটাররা থাকলে খেলোয়াড়দের সমস্যার সমাধান দ্রুত এবং কার্যকরভাবে করা সম্ভব। তামিম চাইছেন, খেলোয়াড়দের ভেতরের দিকগুলো বোঝে এমন কেউ নেতৃত্বে থাকুক। এটাই তাঁর মূল উদ্দেশ্য-যা নিতান্তই প্রগতিশীল এবং খেলার উন্নয়নের জন্য প্রাসঙ্গিক।
সমালোচনার প্রধান কারণ হলো তার উপস্থাপনা কৌশল। শুধু অভিজ্ঞতা বা দক্ষতার ভিত্তিতে নয়, তামিম তাঁর খ্যাতি, সামাজিক প্রভাব দিয়ে এমনিতেই হয়তো বোর্ডে সবার আস্থা অর্জন করে নিতে পারতেন। কিন্তু যেভাবে তাকে ঘিরে একধরনের রাজনৈতিক প্রভাব দেখা গেছে, তা অনেকের কাছে প্রাসঙ্গিক মনে হলেও ভক্তদের উদ্বিগ্ন করেছে। এই পরিস্থিতি বাংলাদেশের খেলোয়াড়-রাজনীতির ইতিহাসকে নতুন আলোকে দেখা প্রয়োজন। ক্রিকেটাররা সাধারণত সামাজিক ও মানবিক কর্মকান্ডে অংশ নেন, কিন্তু নির্বাচনী প্রক্রিয়ায় সরাসরি পদক্ষেপ তাদের দায়িত্ব ও কর্তব্যের সঙ্গে জটিল সম্পর্ক তৈরি করে। তামিম আরও সময় নিয়ে বিসিবি নির্বাচনের কথা ভাবতে পারতেন। অবশ্য নির্বাচন থেকে সরে আসা তামিম হয়তো এরই মধ্যে বুঝতে পেরেছেন, রাজনীতির কাঁদায় পা ডোবানো কতটা ভয়াবহ হতে পারে। এ অভিজ্ঞতা বাংলাদেশের ক্রিকেটে নতুন এক শিক্ষা দিল, খেলোয়াড়রা যখন কেবল মাঠেই সীমাবদ্ধ থাকেন, তখন খেলার মান ও সমাজ দুই-ই লাভবান হয়। আর রাজনৈতিক প্রভাব ঢুকলে জন্ম নেয় বিভাজন ও বিতর্ক। তবে উদ্দেশ্য যদি সত্যিই ক্রিকেটের উন্নয়ন ও খেলোয়াড়দের স্বার্থ রক্ষার জন্য হয় তাহলে সেটি হতে হবে রাজনৈতিক ছায়ামুক্ত।
সাকিব-মাশরাফির অভিজ্ঞতা ইতিমধ্যেই দেখিয়েছে, রাজনীতিতে সরাসরি ঝাঁপিয়ে পড়লে ভক্তদের আস্থা নড়বড়ে হয়। তামিমের ক্ষেত্রেও সেই শিক্ষা প্রযোজ্য। তাঁর ভক্তরা চান তাকে কেবল ক্রিকেটের প্রতিনিধি হিসেবেই দেখতে, কোনো রাজনৈতিক দলের প্রতীক হিসেবে নয়। নিজের যোগ্যতায়, প্রভাবে চট্টগ্রামের গর্বিত সন্তান একদিন বিসিবির মসনদে বসবেন, এ নিয়ে হবে না কোনো বিতর্ক, থাকবে না কোনো রাজনীতির কালো ছায়া, সব পক্ষই বরণ করে নেবেন ফুলের তোড়ায়-এমন স্বপ্নে দিন গুণছেন আপামর চাঁটগাবাসী।
রহা

সম্পর্কিত পোস্ট

সর্বশেষ পোস্ট



Shares