নিজস্ব প্রতিবেদক
চট্টগ্রামের রাউজানের সাবেক সংসদ সদস্য ও বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান গিয়াস উদ্দিন কাদের চৌধুরীকে সংগঠনটির হাইকমান্ড থেকে চাঁদাবাজিসহ কয়েকটি অভিযোগ এনে শোকজ করা হয়েছে। আর সে শোকজ নিয়ে এখন তৈরি হয়েছে বিতর্ক। স্থানীয় বিএনপি নেতাকর্মীদের অভিযোগ, রাউজানের রাজনীতিতে ‘ঠেক’ দিতে এবং কেন্দ্রীয় সংগঠনের কাছে বিতর্কিত করতে উত্তর জেলা বিএনপিরএক শীর্ষ নেতা দুই ধনাঢ্য ব্যবসায়ীকে দিয়ে গিয়াস উদ্দিন কাদের চৌধুরীর বিরুদ্ধে কেন্দ্রে অভিযোগ করিয়েছেন।আর মূলত সেই দুইটি অভিযোগের প্রেক্ষিতে গিয়াস কাদেরকে কেন্দ্রে শোকজ করা হয়।
সিআইপি ইয়াসিন চৌধুরী ও সিআইপি ফুরকান নামের এই দুই ব্যবসায়ী বিএনপি ওই নেতার ঘনিষ্ঠ বলে পরিচিত।যদিও তাদের দায়ের করা করা মামলা এবং অভিযোগে চাঁদাবাজির সাথে গিয়াস কাদেরের সম্পৃক্ততার কথা উল্লেখ করা হয়নি।এরমধ্যে একজন বিবৃতি দিয়ে জানিয়েছেন,গিয়াস কাদের চৌধুরী তার কাছ থেকে কোন চাঁদা চাননি।
জানা যায়, গত ৫ নভেম্বর গিয়াস কাদের চৌধুরীকে কেন্দ্র থেকে কারণ দর্শানোর নোটিশ জারি করা হয়। দলের সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব অ্যাডভোকেট রুহুল কবির রিজভী স্বাক্ষরিত সেই নোটিশে গিয়াস কাদেরের বিরুদ্ধে মোট ৫ টি অভিযোগ আনা হয়।সেগুলোর মধ্যে রয়েছে এলাকায় দলমত নির্বিশেষে ধনী ব্যবসায়ীর তালিকা করে কোটি কোটি টাকা চাঁদা আদায়, ওমান বসবাসরত সিআইপি ব্যবসায়ী ইয়াসিনের কাছ থেকে দেড় কোটি টাকা চাঁদা দাবি, চাঁদা না পেয়ে সন্ত্রাসীদের দিয়ে ইয়াসিনের রাউজানের বাড়ি পুড়িয়ে দেয়া, সিআইপি ব্যবসায়ী মো. ফোরকানের কাছে এক কোটি টাকা চাঁদা দাবি করে না পেয়ে সন্ত্রাসী দিয়ে ফোরকানকে নির্মম শারীরিক নির্যাতন।
এতে আরো বলা হয়, ‘স্বঘোষিত কমিটি ঘোষণা করার বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে আপনি ঔদ্ধত্য প্রকাশ করে বলেন, রাউজান কমিটি গঠন করতে কারোর প্রয়োজন নেই, আমার এলাকা আমি করবো। এ ধরণের বক্তব্য মাননীয় ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান মহোদয়ের নেতৃত্বের প্রতি চরম অনাস্থা ও ধৃষ্টতা। দীর্ঘ ৬ বছর বিদেশে থেকে নতুন সরকারের শুরুতে দেশে এসে দেশ-বিদেশের সন্ত্রাসীদের ভাড়া করে রাউজানে আপনি অস্থিরতা ও মারাত্মক আতঙ্ক তৈরি করেছেন-যা রাঙ্গুনিয়া, সীতাকুণ্ডসহ উত্তরের অন্যান্য নির্বাচনী এলাকায় বিরুপ প্রভাব ফেলছে।’
জানা যায়,গিয়াস কাদেরের বিরুদ্ধে উত্থাপন করা অভিযোগের মধ্যে অন্যতম হচ্ছে ব্যবসায়ী ফোরকান ও ইয়াসিন নামে দুই ধনাঢ্য ব্যবসায়ীর কাছ থেকে চাঁদা দাবি ও নির্যাতন।ফোরকান ও ইয়াসিন নামে এই দুই ব্যবসায়ী রাউজানের রাজনীতিতে গিয়াস কাদেরের প্রতিদ্বন্দ্বী বলে পরিচিত উত্তর জেলা বিএনপির আহবায়ক গোলাম আকবর খোন্দকারের ঘনিষ্ঠ । এছাড়া সেই দুই ব্যবসায়ীর সাথে রাউজানের সাবেক আওয়ামী এমপি ফজলে করিম চৌধুরীর ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ রয়েছে।এরমধ্যে খোন্দকারের সাথে ‘ভুক্তভোগী’ ব্যবসায়ী মো. ইয়াসিনের সস্ত্রীক ছবিও দেখা গেছে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে।
এদিকে সিআইপি ফোরকান নামে যে ব্যবসায়ীর কাছ থেকে চাঁদা আদায়ের বিষয় উল্লেখ করে গিয়াস উদ্দিন কাদের চৌধুরীকে শোকজ করা হয়েছিল,তিনি গণমাধ্যমে বিবৃতি দিয়ে বিষয়টি সত্য নয় বলে দাবি করেছেন। বিবৃতিতে মোহাম্মদ ফোরকান বলেন, আমি গিয়াস উদ্দীন কাদের চৌধুরীকে কোন চাঁদা প্রদান করিনি কিংবা তিনি নিজে আমার নিকট কোন চাঁদা দাবী করেননি। যারা আমার নিকট চাঁদা দাবী করেছে এবং আমাকে শারীরিকভাবে নির্যাতন করেছে সুর্নিদিষ্টভাবে তাদের ৩ জনের নাম ও অজ্ঞাতনামা ৮/১০ জনের বিরুদ্ধে আমি রাউজান থানায় মামলা দায়ের করেছি। উক্ত মামলাটি বর্তমানে তদন্তাধীন আছে। উল্লেখ্য মামলার ঘটনাস্থল রাউজান এসি (ল্যান্ড) অফিস এর সম্মুখস্থল, যা সার্বক্ষণিক ফ্লোজ সার্কিট ক্যামেরা দ্বারা মনিটর করা হয়। ফলে অলোচ্য ঘটনাটির সিসি টিভি ফুটেজ ইতিমধ্যে, মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তার নিকট সংরক্ষিত আছে।
গত ৮ নভেম্বর দেয়া এই বিবৃতিতে ফোরকান বলেন, গিয়াস উদ্দীন কাদের চৌধুরী একজন জাতীয় পর্যায়ের নেতা হওয়ায় তাকে আমার সাথে সংঘটিত ঘটনায় উদ্দেশ্যমূলক ভাবে জড়িত করা হয়েছে। আমার মামলার বিষয়টি ভিন্নখাতে প্রবাহিত করে প্রকৃত আপরাধী কে বাচাঁনোর জন্য পরিকল্পিতভাবে কোনপক্ষ হয়তো ফায়দা লুঠার চেষ্টা করছে। প্রকৃত অপরাধীকে শান্তি নিশ্চিত করার জন্য আমি আহ্বান জানাচ্ছি এবং সংশ্লিষ্ট সকলের জ্ঞাতার্থে স্বেচ্ছায় আমি অত্র বিবৃতি প্রদান করছি।
ফোরকান ছাড়াও মোহাম্মদ ইয়াসিন নামে আরেক ব্যবসায়ীর কাছ থেকে গিয়াস কাদের চৌধুরী দেড় কোটি টাকা চাঁদা চেয়েছেন বলে অভিযোগ করা হয়।তবে ওই ঘটনায় ইয়াসিনের পক্ষে প্রধান উপদেষ্টা ও বিএনপির দপ্তর বরাবর দেয়া অভিযোগে কোথাও গিয়াস কাদেরের নাম উল্লেখ করা হয়নি। ওমানে বসবাসকারী এই ব্যবসায়ী গোলাম আকরের ঘনিষ্ঠ অনুসারী বলে পরিচিত।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক রাউজান উপজেলা বিএনপির একজন যুগ্ন আহবায়ক বলেন,চৌধুরী পরিবারের এমন দুরাবস্থা হয়নি যে চাঁদাবাজি করতে হবে।আসল ব্যাপার হচ্ছে দীর্ঘদিন ধরে এলাকার খোঁজখবর না নেয়া গোলাম আকবর খোন্দকারের ষড়যন্ত্রের শিকার হয়েছেন তিনি।আর যে দুজনের কাছ থেকে চাঁদা চাওয়ার বিষয়ে অভিযোগ করা হয়েছিলো, তারা কোথাও চৌধুরীর নাম বলেননি।একজন তো ইতোমধ্যে এই বিষয়ে বিবৃতি দিয়ে খোলাস করেছেন।
তিনি বলেন, অভিযোগ করা হয়েছে রাউজানে গিয়াস কাদের আলাদা কমিটি দিয়েছেন।এটাও হাস্যকর ব্যপার। এরকম কোন প্যারালাল কমিটির তারা প্রমাণ দেখাক।আর সন্ত্রাসের কথা বলা হচ্ছে।যেখানে খোন্দকারের লোকজন ৫ আগস্টের পর রাউজানে যা ইচ্ছা তাই করছেন।জুনুর ( ফজলে করিম চৌধুরী) রেখে যাওয়া চাঁদার আসরগুলো এখন উনার লোকজন নিয়ন্ত্রণ করছে।
এদিকে শোকজের বিষয়ে জানতে চাইলে গিয়াস কাদের চৌধুরী বলেন, আমি ও আমার পরিবারের এক দেড় কোটি টাকা চাঁদা চাইতে হবে সেটা হাস্যকর ব্যপার। এরমধ্যে যার কাছ থেকে চাঁদা চেয়েছি বলে অভিযোগ করা হলো,তিনি নিজেই বিবৃতি দিয়েছেন বিষয়টি সত্য নয়।আমি ও আমার পরিবারকে জনগণের সামনে হেয় প্রতিপন্ন করার জন্য একটি স্বার্থান্বেষী মহল এসব অপপ্রচার করেছে।
তিনি আরও বলেন, আমি বিগত ১৭ বছর আওয়ামী লীগের রোষানলের পরেও দলের হাল ছাড়িনি। সন্ত্রাসীদের রক্তচক্ষু উপেক্ষা করে দলের সকল কর্মসূচী সফলভাবে সম্পন্ন করেছি। আওয়ামী সন্ত্রাসীদের নির্যাতনে মামলা-হামলার শিকার ও শহীদ নেতাকর্মীদের দাফন কাপন সম্পন্নসহ বিএনপি ও অঙ্গসংগঠনের পাশে ছিলাম।বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলে জিয়া পরিবারের পরে আমার পরিবারই সবচেয়ে বেশি নির্যাতনের শিকার।
শোকজ ও একজন অভিযোগকারীর বিবৃতির বিষয়ে জানতে চাইলে বিএনপির কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক মাহবুবের রহমান শামীম বলেন, কেন্দ্রে থেকে উনাকে শোকজ করা হয়েছে।এই বিষয়ে আমার তাই কোন বক্তব্য নেই।এটা কেন্দ্র ভালো জানবেন।
প্রসঙ্গত, চট্টগ্রামের রাউজান সংসদীয় আসন নিয়ে গিয়াস কাদের চৌধুরীর সাথে চট্টগ্রাম উত্তর জেলা বিএনপির আহবায়ক ও বিএনপি চেয়ারপার্সনের উপদেষ্টা গোলাম আকবর খন্দকারের প্রতিযোগিতা আছে।এরমধ্যে ঐতিহ্যবাহী চৌধুরী পরিবারের সন্তান হিসেবে রাউজানের পাশাপাশি পুরো উত্তর চট্টগ্রামে গিয়াস কাদের চৌধুরীর আছে শক্ত অবস্থান। আর জনভিত্তি কম হলেও উত্তর চট্টগ্রামের প্রায় সব উপজেলায় বিএনপির কমিটির শীর্ষ পদে আছেন আহবায়ক খোন্দকারের অনুসারীরা। গত ২৮ অক্টোবরের পরের আন্দোলন সংগ্রামে কোথাও দেখা না গেলে ৫ আগস্টের পর প্রকাশ্যে এসে সরব হয়েছেন গোলাম আকবর। আর বঙ্গবন্ধু পরিবারকে হত্যার হুমকির ঘটনায় রাষ্ট্রদ্রোহ মামলা খেয়ে দুবাইয়ে আশ্রয় নেয়া গিয়াস কাদের চৌধুরী ১০ আগস্ট দেশে ফিরেন।এরমধ্যে গিয়াস কাদের ও খোন্দকারের অনুসারীরা রাউজানে নিয়মিত সংঘাতে জড়াচ্ছেন।
