বৃহস্পতিবার, ২৬ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ১৪ ফাল্গুন ১৪৩২

ভূমিকম্প মোকাবেলায় আমাদের প্রস্তুতি কতটুকু?

প্রকাশ: ২৩ ফেব্রুয়ারি ২০২৩ | ৮:৫৪ পূর্বাহ্ণ আপডেট: ২৩ ফেব্রুয়ারি ২০২৩ | ১০:০৬ পূর্বাহ্ণ
ভূমিকম্প মোকাবেলায় আমাদের প্রস্তুতি কতটুকু?

ড. ইফতেখার উদ্দিন চৌধুরী

অতিসম্প্রতি দুটি বিশ্বজুড়ে সমজা ক্ষতবিক্ষত। শুধু ফলশ্রুতিতে বিধ্বস্ত সভ্যতার নির্দয় ধ্বংসস্তূপ বিশ্ববিবেককে প্রচণ্ড নাড়া দিয়েছে। ভূমিকম্পের প্রবণতায় উল্লেখ্য দেশসমূহ অধিকতর ঝুঁকিপূর্ণ হলেও দুর্যোগ লাঘবে সরকারি-বেসরকারি ভবন তৈরিতে কোন আগাম সতর্কতামূলক ব্যবস্থা গ্রহণ তেমন একটা অনুভূত নয়। ভৌত অবকাঠামো- দালান ইত্যাদি নির্মাণে নীতিমালার যথার্থ প্রয়োগ- তদারকি পরীক্ষণ- পর্যবেক্ষণ অতিশয় নিম্নপর্যায়ে পৌঁছেছে বলেই সমূহ বিধ্বস্ততার অভিযোগ উঠেছে।

ইতিমধ্যেই দেশসমূহেরআদালত-সুশীলসমাজ-সচেতন তাদের গভীর ক্ষোভ প্রকাশ অব্যাহত রেখেছে। দীর্ঘ এগারো-বারো দিন পরেও জীবিত ব্যক্তির সন্ধান এক বিস্ময়কর অধ্যায় রচনা করছে। মানবিক সাহায্যের জন্য জাতিসংঘসহ বিশ্বের সকল দেশই কমবেশি সচেষ্ট রয়েছে। আমাদের প্রিয় মাতৃভূমি বাংলাদেশের সরকার প্রধানের জরুরী নির্দেশনায় দেশপ্রেমিক সেনা-আইনশৃঙ্খলা বাহিনী-ফায়ার ব্রিগেডের সুদক্ষ দল উদ্ধার কাজে তাদের একনিষ্ঠ মেধা-শ্রম কাজে লাগিয়ে শুধু জীবিত মানুষকে প্রাণে রক্ষা করছে না; অন্যান্য প্রাসঙ্গিক কাজেও বৈরী আবহাওয়া সত্ত্বেও তাদের চ্যালেঞ্জিং কর্মযজ্ঞ উচুমার্গে প্রশংসিত।

দুঃখজনক হলেও সত্য যে, আমাদের দেশে রাজউক সিডিএ-বিভিন্ন জেলা উপজেলায় সংশ্লিষ্ট সেবা খাতসমূহ অর্থবহ নগর-জনপদ পরিকল্পনায় প্রায় ব্যর্থ বলেই জনশ্রুতি রয়েছে। অর্থলিপ্সু মানবরূপী হিংস্র দানবদের নূন্যতম বিবেক বিকশিত না করে শুধুমাত্র ব্যক্তিস্বার্থে নদী-নালা-খাল-বিল- জলাশয় ভরাটে ভবন নির্মাণের অনুমতি প্রদানে এক বিপর্যস্ত পরিবেশ ইতিমধ্যেই পরিলক্ষিত। সর্বনিম্ন থেকে সর্বোচ্চ পর্যায়ে এসব প্রতিষ্ঠানে অথর্ব অপদার্থ-অযোগ্য ব্যক্তিদের অযৌক্তি অনৈতিক বিবেচনায় নিয়োগ দিয়ে দুঃসহ পরিস্থিতির দায়ভাগ কে নেবে তা সুস্পষ্ট নয়। এধরনের অপকর্মে জড়িত সামান্য বেতনের কর্মচারী কর্মকর্তাদের বিশাল সম্পদের অধিকারী হওয়ার বিষয়টি দেরিতে হলেও মহামান্য আদালতের গোচরীভূত হয়েছে এবং এদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা গ্রহণের নির্দেশনাও এসেছে। অধিকাংশ পর্যায়ে সামন্যতম ভবন নির্মাণ কোড- বিধিমালা না মেনেই শুধুমাত্র হিংস্য কর্মকর্তাদের অর্থলোভের কারণে দেশজুড়ে দুর্বল ভবন নির্মাণের প্রভাবে অপরিকল্পিত নগরায়ন নানামুখী আর্থ সামাজিক কঠিন অসঙ্গতি অচিরেই দেশকে কোন পর্যায়ে পৌঁছে দেবে তা কল্পনায়ও আনা যাচ্ছে না।

ব-দ্বীপ খ্যাত বাংলাদেশ ভূমিকম্পের প্রচণ্ড ঝুঁকিতে থাকা সত্ত্বেও অকস্মাৎ ঘটে যাওয়া সম্ভাব্য পরিস্থিতি মোকাবেলা করার কোন ধরনের চিন্তা-চেতনা বা কর্মব্যবস্থাপনার কার্যকর কিছুই পরিলক্ষিত নয়। সচেতন মহলের ধারণা; অবিলম্বে বিচার বিভাগীয় চৌকস দক্ষ যোগ্য দেশপ্রেমিক তদন্ত দলের মাধ্যমে ইতিমধ্যে অত্যন্ত অগোছালোভাবে নির্মিত ভবনসমূহের দুর্বলতা আবিষ্কারসহ উচ্ছেদে কঠোর আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করা না হলে দেশকে নিষ্ঠুর পরিণতির ঠেলে দেওয়া হবে। তাৎপর্যপূর্ণ সমন্বয় ব্যতিরেকে সংস্থাসমূহের পক্ষ থেকে শুধুমাত্র বাচনিক ভঙ্গিতে একে অপরের প্রতি অঙ্গুলি প্রদর্শণ-দোষারোপের অপসংস্কৃতি পরিহার করে প্রয়োগিক কর্মকৌশল প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন অতীব জরুরী হয়ে পড়েছে। অভিযুক্ত অপরাধীদের সতর্কতামূল পত্র-কর্মচ্যুতি নয়; তাদের অবৈধ উপার্জিত অর্থ রাষ্ট্রের কোষাগারে নিয়ে জনকল্যাণে ব্যয় করাই হবে উৎকৃষ্ট পন্থা। করছি- করব ইত্যাদি অপাংক্তেয় বক্তব্য সংহার করে দ্রুততর সময়ের মধ্যে উল্লেখ্য অপকর্মের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক পদক্ষেপ গ্রহণ সময়ের জোরালো দাবি।

গণমাধ্যমে প্রকাশিত সূত্রমতে, তুরস্কের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলে সৃষ্ট ৭ দশমিক ৮ মাত্রার শক্তিশালী ভূমিকম্প পরবর্তী সময়ে শতাধিক আফটারশকও রেকর্ড করা হয়েছে। সাম্প্রতিক সময়ে বিশ্বের সবচেয়ে ভয়াবহ ভূমিকম্পগুলোর অন্যতম হিসেবে বিবেচ্য এই ভুমিকম্পে বিস্তৃর্ণ এলাকা মাটির সাথে মিশে একাকার হয়ে তুরস্ক ও সিরিয়া মৃত্যুপুরীতে পরিণত হয়েছে। ১৫ ফেব্রুয়ারি ২০২৩ পর্যন্ত শুধু তুরস্কেই নিহত হয়েছে ৩৫ হাজার ৪১৫ এবং সিরিয়ায় নিহত হয়েছে ৫ হাজার ৮০০ জনের বেশি। প্রতিদিনই শত শত লাশ উদ্ধারে দীর্ঘায়িত হচ্ছে এই তালিকা। জাতিসংঘের ধারণা এই সংখ্যা দ্বিগুন হতে পারে। এখন পর্যন্ত তুরস্কে ১১ হাজারের বেশি ভবন ধস ক্ষতিগ্রস্থ হওয়ার সংবাদ পরিবেশিত হয়েছে।

বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থা’র মতে, ভূমিকম্পের কারণে বহু মানুষ তাদের ঘরবাড়ি হারিয়েছে। তুরস্কের নগর পরিকল্পনাবিদ ও ভূমিকম্প বিষয়ক বিশেষজ্ঞদের মতানুসারে, ভূমিকম্প প্রবণ অঞ্চলে বিল্ডিং কোড না মেনে বহু ভবন নির্মাণ করায় এই পরিমাণ ক্ষয়ক্ষতি ও প্রাণহানি হয়েছে। ১৯৯৯ সালে সংঘটিত বড় ধরণের ভূমিকম্পের পর তুরস্কের সরকার ভূমিকম্প মোকাবেলায় তহবিল গঠনসহ বেশ কিছু পদক্ষেপ নিলেও, সেমসয় নিয়ম না মেনে ভবন তৈরিকারীদের শাস্তির আওতায় না এনে অল্প কিছু জরিমানার বিনিময়ে ছেড়ে দিলে প্রায় ৬০ লাখ ভবন অপরিবর্তিত অবস্থায় থেকে যায়। সরকারের এই অনিয়মের ফলেই সাম্প্রতিক ভূমিকম্পে ব্যাপক আকারে ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে বলেও বিশেষজ্ঞরা মত প্রকাশ করেছেন।

বিজ্ঞানীদের দাবি, ঐ এলাকার মাটির নীচে থাকা অ্যারাবিয়ান প্লেটটি উত্তর দিকে সরে গিয়ে আনাতোলিয়ান প্লেটে ধাক্কা দিলে এই ভয়াবহ ভূমিকম্পের সৃষ্টি হয়। একই কারণে ১৮২২ সালেও একদফা ভূমিকম্প হয়েছিল। গণমাধ্যমে প্রকাশিত পরিসংখ্যান পর্যালোচনায় দেখা যায় বাংলাদেশের উত্তর, উত্তর-পূর্ব, দক্ষিণ-পূর্ব অঞ্চলে বড় ধরনের ভূমিকম্পের আশঙ্কা রয়েছে। ১৭৬২ সালের ভূমিকম্পে টেকনাফ থেকে মিয়ানমার পর্যন্ত প্রায় ৪০০ কিলোমিটার জায়গায় যে ফল্ট লাইন রয়েছে সেখানে ৮ দশমিক ৫ মাত্রার বেশি শক্তিশালী ভূমিকম্পে সেন্টমার্টিন অইল্যান্ড তিন মিটার এবং মিয়ানমারের একটি দ্বীপ ছয় মিটার উপরে উঠে আসে। একই ভূমিকম্পে সীতাকুন্ড পাহাড়ে কঠিন শিলা ভেদ করে নিচ থেকে কাদা বালুর উদগীরণ ও বঙ্গোপসাগরে সুনামির দৃষ্টান্তও রয়েছে। এই সুনামির কাণে ঢাকায় বুড়িগঙ্গা নদীর ধারে বাড়িঘর ভেসে গিয়ে প্রায় ৫০০ মানুষের প্রাণহানি ঘটে। বেঙ্গল ভূমিকম্প নামে পরিচিত ১৮৮৫ সালের মধুপুর ফন্টের ভূমিকম্পের মাত্রা ছিল ৬ দশমিক ৫ থেকে ৭ দশমিক শূন্য। এটি এতো শক্তিশালী ছিল যে ভারতের সিকিম, বিহার, মনিপুর এবং মিয়ানমারেও অনুভূত হয়েছিল। ১৮৯৭ সালের ১২ই জুন মেঘালয়ের শিলং এর কাছে যে মারাত্মক ভূমিকম্পের উৎপত্তি হয়েছিল তার ফলে বাংলাদেশের ঢাকা, সিলেট ও ময়মনসিংহসহ অনেক শহরের দালান কোঠা ভেঙ্গে পড়ে ও অনেক লোক প্রাণ হারায়।

বিগত ২১ নভেম্বর ১৯৯৭ সালে চট্টগ্রাম ও তৎসংলগ্ন এলাকায় প্রচণ্ড ভূমিকম্প আঘাত হানে এবং অনুরূপভাবে ১৯৯ সালে রজুলাই-আগস্ট মাসে মহেশখালি ও পার্শ্ববর্তী এলাকায় প্রায় চার দফা ভূমিকম্প সংঘটিত হয় যার ফলে এই সব এলাকায় বহু লোকের মৃত্যুবরণের পাশাপাশি বাড়ি ঘর ধ্বংসপ্রাপ্ত হয়। এছাড়া রেকর্ড অনুযায়ী সেই সুনামিতে দুই লাখের বেশি মানুষ মারা গিয়েছিল। ১৯৫৫ সালে পর্তুগালের রাজধানী লিসবনে ৮ দশমিক ৭ মাত্রার ভূমিকম্পটি ছিল ঐ অঞ্চলের জন্য রেকর্ড। এছাড়াও ২০১৬ সালে ইতালির অ্যামাটিসা শহরে মাঝারি মাত্রার তিন দফা ভূমিকম্পে তিনশোর বেশি মানুষ নিহত হয়েছিল। ১৯৬৪ সালে আলাস্কায় আঘাত করেছিল ৯ দশমিক ২ মাত্রার একটি শক্তিশালী ভূমিকম্প। দক্ষিণ আমেরিকান প্লেটের সাথে বেশ কয়েকটি মহাদেশীয় প্লেটের সংঘর্ষের কারণে দক্ষিণ আমেরিকার দেশগুলোয় প্রায়ই শক্তিশালী ভূমিকম্প দেখা যায়। বিশেষ করে ভূমিকম্প প্রবণ এলাকা কলম্বিয়া এবং ভেনেজুয়েলার ক্যারাবিয়ান উপকূলে সবচেয়ে বড় ভূমিকম্প রেকর্ড করা হয়েছিল ১৯৬০ সালে। সেই সময় চিলে সালভেদরের কাছে ৯ দশমিক ৫ মাত্রার ভূমিকম্পে পাঁচ হাজারের বেশি মানুষ নিহত হয়েছিল এবং বাস্তুচ্যুত হয়েছিল ২০ লাখের বেশি মানুষ। পরবর্তীতে ২০১০ সালে কনসেপসিওন শহরের কাছে আরেকটি ৮ দশমিক ৮ মাত্রার ভূমিকম্পে নিহত হয়েছিল প্রায় ৫০০ মানুষ। বাংলাদেশের ভূতত্ত্ববিদ ও নগর পরিকল্পনাবিদদের মতে, দেশে বড় ধরণের ভূমিকম্প হলে এখানকার ক্ষয়ক্ষতি ও প্রাণহানি তুরস্কের মত বা তার চেয়ে বেশি মাত্রায় হতে পারে। আর এই ক্ষয়ক্ষতির পিছনে অন্যতম প্রধান কারণ হবে অপরিকল্পিতভাবে তৈরি করা ভবন-নগরায়ন ।

জাতিসংঘের ভাষ্যমতে, পৃথিবীর সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ ২০টি শহরের মধ্যে ঢাকা অন্যতম। ২০০৯ সালে পরিচালিত সমন্বিত দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কর্মসূচি (সিডিএমপি) ও জাইকার যৌথ জরিপে ঢাকায় সাত বা তার চেয়ে বেশি। মাত্রার ভূমিকম্প হলে শহরের ৭২ হাজার ভবন ভেঙে পড়ার, ১ লাখ ৩৫ হাজার ভবন ক্ষতিগ্রস্ত এবং আনুমানিক সাত কোটি টন কনক্রিটের স্তুপ তৈরি হওয়ার আশঙ্কা করা হয়েছে। ২০১৮ সালের এশিয়ান ডিজাস্টার প্রিপেয়ার্ডনেস সেন্টারের জরিপে দেখা যায়, রাজউকের আওতাধীন ১ হাজার ৫২৮ বর্গ কিলোমিটার এলাকার ২ লাখ ৪ হাজার ১০৬টি ভবনের মধ্যে ১ লাখ ৩৪ হাজার ৯২৫টি ভবন অর্থাৎ ৬৬ দশমিক ১ শতাংশই অনুমোদনহীন। প্রাসঙ্গিকতায় রাজউকের নগর পরিকল্পনাবিদ গণমাধ্যমে দেওয়া সাক্ষাৎকারে বলেন, ‘ঢাকায় সাতের বেশি মাত্রার ভূমিকম্প হলে পুরোনো ঝুঁকিপূর্ণ এবং শুধু ইটের তৈরি ভবনগুলো ধসে পড়ার আশঙ্কা প্রবল। তাছাড়া বালু দিয়ে জলাশয় ভরাট করে তৈরি ভবনগুলোও ঝুঁকিতে থাকবে। জলাশয়ের উপর করা ভবনগুলোর নিচের মাইট শক্ত না হওয়ার কারণে ঝাঁকুনি এলে সয়েল লিকুইফিকেশন ইফেক্টের প্রভাবে ভবন দেবে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। সার্বিক বিবেচনায় কালক্ষেপণ না করে কোন ধরনের অনৈতিক লেনদেনে বা অবাঞ্ছিত পৃষ্ঠপোষকতায়-মাফিয়াচক্রের যোগসাজসে নির্মাণ দুর্নীতি রুখে দেওয়া না হলে দেশের জন্য চরম অসহায় ভবিষ্যৎ মুখিয়ে থাকবে।

লেখক : সমাজবিজ্ঞানী ও সাবেক উপাচার্য, চবি

সম্পর্কিত পোস্ট

সর্বশেষ পোস্ট



Shares