বুধবার, ২৫ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ১৩ ফাল্গুন ১৪৩২

বিতর্কিত শিক্ষা সিলেবাস বাতিলে জাতীয় ওলামা মাশায়েখ আইম্মা পরিষদের ৮ দফা দাবি

প্রকাশ: ১০ জুলাই ২০২৪ | ৭:৫৭ অপরাহ্ণ আপডেট: ১০ জুলাই ২০২৪ | ৮:০৪ অপরাহ্ণ
বিতর্কিত শিক্ষা সিলেবাস বাতিলে জাতীয় ওলামা মাশায়েখ আইম্মা পরিষদের ৮ দফা দাবি

সাম্পান ডেস্ক 

বিতর্কিত শিক্ষা সিলেবাস বাতিলে জাতীয় ওলামা মাশায়েখ আইম্মা পরিষদের ৮ দফা দাবি ও ৩ দফা কর্মসূচি ঘোষণা করেছে।
আজ বুধবার বেলা ১২টার দিকে রাজধানীর ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটির সাগর-রুনি হলে “বিতর্কিত জাতীয় পাঠ্যক্রম; দেশপ্রেমিক সচেতন নাগরিকদের করণীয়” শীর্ষক সংবাদ সম্মেলনে জাতীয় ওলামা মাশায়েখ আইম্মা পরিষদ নেতৃবৃন্দ এসব দাবি ও কর্মসূচী ঘোষণা করেন।

জাতীয় ওলামা মাশায়েখ আইম্মা পরিষদের কেন্দ্রীয় সভাপতি মাওলানা নূরুল হুদা ফয়েজীর উপস্থিতিতে ও সাধারণ সম্পাদক মুফতী রেজাউল করীম আবরারের সঞ্চালনায় অনুষ্ঠিত সংবাদ সম্মেলনে লিখিত বক্তব্য পাঠ করেন সংগঠনের কেন্দ্রীয় সহ-সভাপতি প্রফেসর ড. আ.ফ.ম খালিদ হোসাইন।

সংবাদ সম্মেলনে জাতীয় ওলামা মাশায়েখ আইম্মা পরিষদের নেতৃবৃন্দ বলেন, দেশের বিদ্যমান রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, সামাজিক ও ধর্মীয় অবস্থা কতোটা সঙ্গীন সময় পার করছে। আমাদের জাতীয় শিক্ষাব্যবস্থায় বিরাজ করছে অতীতের যেকোন সময়ের চেয়ে ভয়াবহ রকমের নৈরাজ্য। যে শিক্ষার মাধ্যমে আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্ম শিক্ষিত, মার্জিত, দেশপ্রেমিক ও ধার্মিক একজন সচেতন নাগরিক হিসাবে গড়ে ওঠার কথা, সে শিক্ষাব্যবস্থায় ভাষাগত, নীতিগত ও চরিত্রগত এমন সামগ্রিক ধ্বংসযজ্ঞ চালানো হয়েছে, যা দেশের অধিকাংশ জনগোষ্ঠির চিন্তা ও মননের সাথে সাংঘর্ষিক এক শিক্ষাব্যবস্থায় রূপ নিয়েছে। শিক্ষা একজন নাগরিককে ব্যক্তিগত, পারিবারিক, সামাজিক, রাষ্ট্রীয় ও পেশাগত জীবনে সৎ, দায়িত্ববান, ধর্মপরায়ন ও দেশপ্রেমী হতে সাহায্য করে। আর এটা নিশ্চিত করা হয় দেশের জনগণের বোধ-বিশ্বাস, সংস্কৃতি ও মূল্যবোধের সাথে সংগতি রেখেই। কিন্তু বিদ্যমান শিক্ষাব্যবস্থায় তা উপেক্ষিত থেকে গেছে। বরং বর্তমান শিক্ষাব্যবস্থা হতে ধর্ম ও নৈতিকতাকে সরিয়ে ফেলে, মৌলিক দর্শন হিসাবে ব্রাহ্মণ্যবাদ, সেক্যুলারিজমকে ও ধর্মহীনতাকে প্রতিষ্ঠিত করার অপচেষ্টা পরিলক্ষিত হচ্ছে।

সংবাদ সম্মেলন সম্মেলনে ৮ দফা দাবি এবং ৩ দফা কমসূচি ঘোষণা করা হয়।দাবিগুলো হলো : ১. বিতর্কিত জাতীয় পাঠ্যক্রম বাতিল করতে হবে। ২. বিদেশের অন্ধ অনুসরণ নয়; বরং যুগোপযোগী শিক্ষা কারিকুলাম প্রণয়নে অভিজ্ঞ, দেশপ্রেমিক শিক্ষাবিদ ও ধর্মীয় বিশেষজ্ঞ ওলামায়ে কিরামের সমন্বয়ে শিক্ষা কমিশন গঠন করা। ৩. পাঠ্যপুস্তক হতে বিতর্কিত ও ইসলামী আকিদাবিরোধী বিষয়সমূহ বাদ দেয়া। স্কুল ও মাদরাসার সকল পাঠ্যপুস্তকে বিজাতীয় সংস্কৃতি, অনৈসলামিক শব্দ এবং অশ্লীল চিত্র মুক্ত রাখা। ৪ .মাদরাসা শিক্ষা কারিকুলাম মাদরাসা সংশ্লিষ্ট আলেম, ইসলামিক স্কলার ও শিক্ষকদের দ্বারা পরিমার্জন করা ও আলিয়া মাদরাসার স্বকীয়তা বজায় রেখে স্বতন্ত্র কারিকুলাম প্রণয়ন করা। ৫.দশম শ্রেণি পর্যন্ত স্ব-স্ব ধর্মীয় শিক্ষা বাধ্যতামূলক করা। ৬.প্রকৃতি বিরুদ্ধ ও দেশীয় সংস্কৃতি বিরোধী ট্রান্সজেন্ডার মতবাদ পাঠ্যপুস্তক থেকে বাতিল এবং শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ভর্তির ক্ষেত্রে ট্রান্সজেন্ডার কোটা বাতিল করা। ৭. সমাজে অবহেলিত হিজড়া জনগোষ্ঠীর সুশিক্ষা নিশ্চিত করনের লক্ষ্যে সুস্পষ্ট নীতিমালা প্রণয়ন করা। ৮.“কৃষি শিক্ষা” ও “গার্হস্থ্য বিজ্ঞান” শিক্ষা পাঠ্যসুচিতে বাধ্যতামূলক।

তিন দফা কর্মসূচির মধ্যে রয়েছে ১. জুলাই’২৪ মাসব্যাপী জেলায়-জেলায় বিতর্কিত পাঠ্যক্রম ইস্যুতে ওলামা, শিক্ষাবিদ ও সূধি সম্মেলন। ২. আগস্ট ও সেপ্টেম্বর‘২৪ থানায় থানায় ওলামা ও সূধি সম্মেলন। ৩. সেপ্টেম্বর মাসের শেষ সপ্তাহে বিতর্কিত পাঠ্যক্রম বাতিলের দাবীতে ঢাকায় জাতীয় সম্মেলন।

লিখিত বক্তব্যে বলা হয়, শিক্ষাই জাতির মেরুদণ্ড। সেই শিক্ষার ভীত যদি দুর্বল, জাতিস্বত্তা বিরোধী ও নৈতিকতাহীন নিরেট বস্তুবাদী হয় তাহলে জাতি ভুল পথে পরিচালিত হবেই। আদর্শ শিক্ষা ও শিক্ষাব্যবস্থার মাধ্যমে একটি সুখী, সমৃদ্ধশালী বাংলাদেশ গড়তে যেভাবে দেশের মানুষের বোধ-বিশ্বাস, ধর্মীয় আদর্শের প্রতি লক্ষ্য রেখে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার আলোকে ঐক্যবদ্ধ প্রচেষ্টা চালিয়ে যাওয়ার দরকার ছিল, দুঃখজনক বাস্তবতা হলো, স্বাধীনতার অর্ধশতক পরও শিক্ষা নিয়ে কর্তৃপক্ষের সুচিন্তিত দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা কখনোই সেভাবে লক্ষ্য করা যায়নি। শিক্ষাখাতে বার্ষিক বাজেট প্রয়োজনের তুলনায় খুবই কম। শিক্ষকদের মর্যাদা ভূলণ্ঠিত। অবকাঠামোগত ব্যবস্থাপনা কতটা নাজুক তা শিক্ষকদের বেতন কাঠামোর দিকে তাকালে সুস্পষ্ট ধারণা পাওয়া যায়। তাছাড়া বর্তমানে শিক্ষার্থীদের মধ্যে নীতি-নৈতিকতা বিকশিত হবার পরিবর্তে অনেকেই নানা অপরাধমূলক কর্মকান্ডে জড়িয়ে পড়ছে, বাড়ছে সামাজিক বিশৃঙ্খলা। এমতাবস্থায় নীতি-নৈতিকতার প্রধান চালিকাশক্তি ধর্মীয় শিক্ষাকে পরিকল্পিতভাবে সংকুচিত করাসহ নানারূপ অসঙ্গতিপূর্ণ বিতর্কিত কারিকুলাম প্রণয়ন করা হয়েছে।

লিখিত বক্তব্যে আরও বলা হয়, শিক্ষানীতি-২০১০ এর প্রাককথনে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী বলেছেন “এই শিক্ষানীতির উল্লেখ্যযোগ্য দিক হলো এখানে ধর্ম, বিজ্ঞান ও কারিগরি শিক্ষাকে প্রাধান্য দেওয়া হয়েছে”। এই শিক্ষানীতির অধ্যায়-২ “শিক্ষার উদ্দেশ্য ও লক্ষ্য” নির্ধারনের ৩০টি পয়েন্টের উপর নীতিগত তাগিদ দেওয়া হয়েছে। যার ২য় পৃষ্ঠায় ১৬নং পয়েন্টটি এইরূপ “প্রাথমিক ও মাধ্যমিক স্তরে শিক্ষার্থীদের নিজ নিজ ধর্ম ও নৈতিক শিক্ষার মাধ্যমে উন্নত চরিত্র গঠনে সহায়তা করা”। ২১ পৃষ্ঠায় বলা হয়েছে “নৈতিকতার মূল উৎস হচ্ছে ধর্ম শিক্ষা”। বাস্তবে আমরা সুস্পষ্টভাবে দেখতে পাচ্ছি সংসদে পাশ হওয়া “জাতীয় শিক্ষানীতি-২০১০” এ ধর্মশিক্ষাকে যেভাবে গুরুত্ব দেয়া হয়েছে “জাতীয় শিক্ষাক্রম ২০২১” এ তার প্রতিফলন ঘটেনি। বরং সুকৌশলে ধর্ম তথা ইসলাম শিক্ষাকে প্রকারান্তরে বাদ দেয়ার গভীর ষড়যন্ত্র বাস্তবায়ন করা হয়েছে।

 

লিখিত বক্তব্যে নেতৃবৃন্দ আরো বলেন, আমরা মনে করি সকলের মেধা ও প্রতিভা কখনই এক হবে না। কিন্তু সরকার, অভিভাবক এবং ছাত্র-ছাত্রীদের লক্ষ্য ও প্রতিভার বিভিন্নতা বিবেচনা না করে বাধ্যতামূলকভাবে সকল ছাত্র-ছাত্রীদের একমূখী মডেলে তৈরি করতে চান। শিক্ষা কারিকুলাম-২০২১ এ সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো প্রায় প্রতিটি বিষয়ই সবচেয়ে কম মেধাবী ছাত্রের কথা বিবেচনা করে পাঠ্যপুস্তক প্রণিত হয়েছে, যা বিজ্ঞান বইগুলোতে চোখ রাখলেই এর বাস্তবতা লক্ষ্য করা যাবে। এতে করে আমাদের মেধাবী ছাত্র-ছাত্রীরা তাদের মেধার বিকাশ করতে পারবে না। ফলে বহির্বিশ্বের সাথে প্রতিযোগিতায় টিকতে পারবে না। জাতি হিসেবে আমরা আরো পিছিয়ে পড়বো।

তারা বলেন,বর্তমানে প্রশ্নফাঁস মহামারী আকার ধারণ করেছে। একে নতুন কারিকুলামে পরীক্ষা ও মূল্যায়নকে পুরো মাত্রায় সংকুচিত করা হয়েছে। তার উপর যুক্ত হয়েছে এই প্রশ্নফাঁস। শিক্ষানবীস শেষ করার পর ছাত্ররা চাকরির বাজারে যাবে, নিজের মেধা ও যোগ্যতার স্বাক্ষর রাখবে, নিজের পরিবারের মুখে হাসি ফোটাবে; কিন্তু বিভিন্ন দলীয় ছত্রছায়ায় গড়ে ওঠা কিছু চক্র প্রশ্নফাঁসের মাধ্যমে প্রকৃত মেধাকে গলা টিপে হত্যা করে যাচ্ছে। চক্রে জড়িতদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দাবি করছি। সারাদেশের শিক্ষার্থী ও তরুণরা চাকরিতে কোটা বাতিলের আন্দোলনে সরব রয়েছে। আমরা মনে করি ‘কোটা পদ্ধতি’ দেশকে মেধাশূণ্য ও অকার্যকর অচলাবস্থার দিকে নিয়ে যাবে। তাই আজকের সংবাদ সম্মেলন থেকে আমরা আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের প্রতিটি দাবী ও শান্তিপূর্ণ আন্দোলনের সাথে সংহতি প্রকাশ করছি।

তারা বলেন, আজকে সমাজে অসংখ্য কিশোর-কিশোরীরা পিতা-মাতার অজান্তে বন্ধুর হাত ধরে নিখোঁজ হচ্ছে এবং ধর্ষণের শিকার হচ্ছে। এটা বাংলাদেশের সভ্য সমাজকে অসভ্য অবাধ যৌনতার সমাজে পরিণত করার কুটকৌশল বৈ কিছুই নয়।  সপ্তম শ্রেণির ইতিহাস ও সামাজিক বিজ্ঞান বইয়ের ৩৯ থেকে ৪৫ পৃষ্ঠা পর্যন্ত শরিফ ও শরিফার গল্প আলোচনা করা হয়েছে। ২০২৩ সালে ওই বইয়ে যে বিষয়টি নিয়ে সারা দেশব্যাপী প্রকৃতি বিরুদ্ধ ও দেশীয় সংস্কৃতি বিরোধী ট্রান্সজেন্ডার প্রমোট করায় প্রতিবাদের ঝড় উঠেছিল। কর্তৃপক্ষ বিষয়টি আমলে না নিয়ে ২০২৪ সালেও ট্রান্সজেন্ডার বিষয়টি বইয়ে উল্লেখ রয়েছে। তৃতীয় লিঙ্গ বা হিজড়া জনগোষ্ঠীর সাথে ট্রান্সজেন্ডারকে তালগোল পাকিয়ে পাশ্চাত্য থেকে আমদানিকৃত সমকামিতাকে ফুটিয়ে তোলার চেষ্টা করা হয়েছে।

সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত ছিলেন সংগঠনের উপদেষ্টা পরিষদ সদস্য মাওলানা ইয়াহইয়া মাহমুদ, সহ-সভাপতি মুফতি মোহাম্মদ আলী কাসেমী, সিনিয়র যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মুফতী হেমায়েতুল্লাহ কাসেমী, যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মুফতী কেফায়েতুল্লাহ কাশফী, যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাওলানা শামসুদ্দোহা আশরাফী, যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক, মাওলানা মুফতি ইসমাঈল সিরাজী আল মাদানী, হাফেজ মাওলানা কামাল উদ্দিন সিরাজ, মুফতি রফিকুন্নাবী হক্কানী, মুফতী আব্দুল আজিজ কাসেমী, মাওলানা শাহজাহান আল হাবিবী, মাওলানা মঈনুদ্দীন খান তানভীর, মুফতী ফরিদুল ইসলাম, মাওলানা নুরুল করীম আকরাম, মুফতী জোবায়ের আব্দুল্লাহ কাসেমী, মাওলানা মাহবুবুর রহমান আশরাফী প্রমূখ।

সম্পর্কিত পোস্ট

সর্বশেষ পোস্ট



Shares