বুধবার, ২৫ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ১৩ ফাল্গুন ১৪৩২

বাপ-দাদার পেশা ছাড়ছেন কর্ণফুলীর সাম্পান মাঝিরা

প্রকাশ: ১৮ ডিসেম্বর ২০২১ | ৬:৩৩ অপরাহ্ণ আপডেট: ১ জানুয়ারি ২০২২ | ৪:১৫ পূর্বাহ্ণ
বাপ-দাদার পেশা ছাড়ছেন কর্ণফুলীর সাম্পান মাঝিরা

ওরে সাম্পানা ওয়ালা, তুঁই আঁরে গরিলে দিওয়ানা/ তোরা হন্ হন্ যাবি আঁর সাম্পানে’/ ওরে কর্ণফুলী রে, সাক্ষী রাখিলাম তোরে। কর্ণফুলী নদী আর এখানকার সাম্পান মাঝিদের নিয়ে এমন অনেক গান ভেসে বেড়ায় চট্টগ্রামে।একসময় বন্দরনগরী চট্টগ্রামের মানুষের সুখ – দুঃখ, হাসি -কান্নার অনেক গল্প এই সাম্পান মাঝিদের গানের সুরে সুরে ফুটে উঠতো । তবে সাম্পান মাঝিদের তখনকার সেই জৌলুশ এখন আর নেই। আর্থিক দুরাবস্থার কারণে অনেকেই বাপ দাদার পেশা ছেড়ে গাছ-বাঁশকাটা, ধানকাটা, মাছধরাসহ বিকল্প পেশায় চলে যাচ্ছেন।

পার্বত্য রাঙ্গামাটির লুসাই পাহাড়ে সৃষ্টি হয়ে চট্টগ্রামের পতেঙ্গা এলাকায় সাগরের মোহনায় মিলিত হয়েছে কর্ণফুলী। আর এই কর্ণফুলী নদীকে ঘিরেই তৈরি হয়েছে সাম্পান মাঝিদের জীবনযাত্রা।এই সাম্পান মুলত হাতে চালিত ছোট ছোট ডিঙি নৌকা। যাত্রী পরিবহনের পাশাপাশি
প্রায় ২ শত বছর আগে থেকে বন্দরে আসা জাহাজের মালামাল বিভিন্ন জায়গায় নেয়ার জন্য ছোট ছোট নৌকা তৈরি করতো মাঝিরা।সেই নৌকা তখন পরিচিত হয়ে ওঠে সাম্পান নামে।

এক সময় কর্নফুলীর তীরের মানুষের যোগাযোগের প্রধান মাধ্যম ছিলো এই সাম্পান।সেসময় প্রায় দেড়শ ঘাটে ভীড়তো এইসব পালবাহী নৌকা।তবে সময়ের বিবর্তনে খরস্রোতা কর্ণফুলীর মতো সেই সাম্পান মাঝিদের জীবন স্রোতও থেমে গেছে অনেকটা।নিজেদের ঐতিহ্য সাম্পান ফেলে ভিন্ন পেশায় যোগ দিচ্ছেন কর্ণফুলীর বরপুত্র এইসব মাঝিরা।যদিও কর্ণফুলী সাম্পান মাঝি কল্যাণ সমিতি ফেডারেশনের তথ্যমতে ,এখনো কর্ণফুলী নদীর ২৩টি ঘাটের মধ্যে ১২টি ঘাট দিয়ে প্রায় দুই হাজার সাম্পান মাঝি যাত্রী পারাপার করেন।

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, একসময়ের খরস্রোতা কর্ণফুলী পাড় দখল, দূষণসহ বিভিন্ন অনিয়মের কারণে নাব্যতা হারাচ্ছে।যার প্রভাব পড়ছে সাম্পান মাঝিদের জীবন জীবিকার ওপর।এদিকে ইঞ্জিনচালিত নৌযানের সাথে প্রতিযোগিতায় টিকতে পারছে না হাতে চালিত এইসব নৌকা। সময়ের প্রয়োজনে বড় বড় ব্রীজ তৈরিও স্বাভাবিক নিয়মে মাঝিদের কদর কমিয়ে দিয়েছে । দেশের ভোগ্যপণের প্রধান বাজার চট্টগ্রাম শহরের চাক্তাই -খাতুনগঞ্জের ব্যবসা কমে যাওয়াও প্রভাব পড়েছে সাম্পান মাঝিদের জীবনে। যেসব কারণে হারিয়ে যাচ্ছে এক সময়ের ঐতিহ্য নানা নামের বাহারি নৌকা আর সাম্পান মাঝি।

নগরীর কোতোয়ালীর অভয়মিত্র ঘাটে ঝালমুড়ি ও পান -সিগারেট বিক্রি করেন ৪৫ বছর বয়সী মোহাম্মদ আলী । একসময় ইসানগর ঘাটে সাম্পান চালাতেন তিনি। বাপ দাদার পেশাও ছিলো এটি। তবে গত বছরের লকডাউন হওয়ার পর প্রশাসন কর্ণফুলীতে সাম্পান চলাচল সীমিত করে দেয়।যে কারণে ৭ সদস্যের পরিবার নিয়ে খুব কষ্ট পড়ে যান তিনি।একপর্যায়ে দীর্ঘদিনের পেশা ছেড়ে শহরে ঝাল মুড়ি ও পান সিগারেট বিক্রির পেশা শুরু করেন। সেই তখন থেকে এই পেশায় আছেন এক সময়ের এই সাম্পান মাঝি।

মোহাম্মদ আলী বলেন, এই সাম্পানের সাথে আমাদের বাপ দাদাদের স্মৃতি মিশে আছে।তবে দিন দিন এই পেশায় টিকে থাকা আমাদের জন্য কঠিন হয়ে পড়ছে । ইঞ্জিনের নৌকার কারণে এমনিতেই ভাড়া অর্ধেকে নেমে গেছে । অন্যদিকে মহাজনরা নৌকার ভাড়া বাড়িয়ে দিয়েছে । এলাকার নেতারা ঘাটের টোল নিচ্ছে।এরমধ্যে আবার লকডাউনে যাত্রী ছিলোনা।কেউ সেসময় আমাদের সাহায্য করেনি । যে কারণে পেটের দায়ে তখন নদী থেকে উঠে গেছি । আমার মতো এরকম অনেকেই বৈঠা ছেড়ে অন্য কাজে লেগে গেছে ।

জানা যায়, একসময় মাঝিদের প্রতিনিধিরাই সিটি করপোরেশন থেকে ঘাটের ইজারা পেতো। তবে কয়েক বছর ধরে রাজনৈতিক ছত্রছায়ায় স্থানীয় প্রভাবশালীরা ইজারা ভাগিয়ে নিচ্ছে।আর তারা মাঝিদের কাছ থেকে যাত্রী প্রতি অতিরিক্ত টোল আদায় করছে। একদিকে যাত্রী কমে যাওয়া, অন্যদিকে অতিরিক্ত টোল আদায়ের কারণে অনেকটা বাধ্য হয়েই মাঝিরা তাদের পূর্বের পেশা ছেড়ে দিচ্ছেন।

এই বিষয়ে চট্টগ্রাম ইতিহাস ঐতিহ্য সংরক্ষণ পরিষদের সভাপতি আলিউর রহমান রুশাই বলেন, ‘এক শ্রেণীর প্রভাবশালীদের কারণে আজকে মাঝিরা সাম্পান থেকে দুরে সরে আসছে। এই প্রভাবশালীরা ঘাটের ইজারা সিটি করপোরেশন ও উপজেলা প্রশাসনের দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তাদের যোগসাজশে নিজেরাই নিচ্ছে।আবার তাদের কাছ থেকে মাঝিদের নিতে হচ্ছে। যে কারণে আয়ের সাথে ব্যয়ের মিল না পাওয়ায় মাঝিদের অনেকেই বাপ দাদার পেশা ছেড়ে দিচ্ছেন।’

দীর্ঘদিন সাম্পান মাঝিদের নিয়ে কাজ করা এই সমাজকর্মী বলেন, সাম্পান চালানো শুধু একটি পেশা নয়।এটি চট্টগ্রামের দীর্ঘদিনের ইতিহাস ঐতিহ্যের অংশ। তাই এই পেশার যাতে কোনরকম ক্ষতি না হয় সেটি আমাদেরকেই দেখতে হবে।এজন্য প্রথমত এই ঘাটের অধিকার তাদের কাছে ফিরিয়ে দিতে হবে।আর সিটি করপোরেশকে প্রতি বছর জরিপ করে ইজারা দিতে হবে।পাশাপাশি এই সাম্পান মাঝিদের জন্য সরকারিভাবে প্রণোদনার ব্যবস্থা করতে হবে।

সম্পর্কিত পোস্ট

সর্বশেষ পোস্ট



Shares