জালাল রুমি, বিশেষ প্রতিনিধি
পাহাড়ে তৎকালীন জনসংহতি সমিতির ( জেএসএস) বর্বরতা ঠেকাতে ১৯৯৭ সালের ২ ডিসেম্বর দলটির সাথে ঐতিহাসিক পার্বত্য শান্তি চুক্তিতে সই করেন বাংলাদেশ সরকার।চুক্তি অনুযায়ী তারা সরকার থেকে নানারকম লোভনীয় সুযোগ সুবিধা ভোগ করবেন।বিনিময়ে অস্ত্র সমর্পণ করে স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসবেন। তবে সরকার প্রায় সব শর্ত ধীরে ধীরে বাস্তবায়ন করলেও কথা রাখেনি এই সশস্ত্র বাহিনী।বরং আধিপত্য কায়েমকে কেন্দ্র করে তারা এপর্যন্ত আরও ৪ টি গ্রুপে বিভক্ত হয়ে নিজেদের মধ্যেই রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষে লিপ্ত হয়েছে। পাশাপাশি আগের মতো সেখানকার বাঙালিদেরও নিপীড়ন করছে।শান্তি চুক্তির পরেই তাদের হাতে পাহাড়ি বাঙালি মিলিয়ে দুই সহস্রাধিক মানুষ খুন হয়েছে।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, পার্বত্য চট্টগ্রামে বর্তমানে ৫ টি সশস্ত্র সংগঠন তাদের সন্ত্রাসী সংগঠন কাজ করছে। এই সন্ত্রাসী সংগঠনগুলো হলো সন্তু লারমার নিয়ন্ত্রণাধীন জেএসএস, প্রসীত খীসার নেতৃত্বাধীন ইউপিডিএফ, সুধাসিন্ধু খিসালের নেতৃত্বাধীন জেএসএস সংস্কার, শ্যামল চাকমার নেতৃত্বাধীন ইউপিডিএফ গণতান্ত্রিক ও বান্দরবানের ম্রো সম্প্রদায়ের নেতৃত্বাধীন মগ লিবারেশন পার্টি। আর এই ৫ টি গ্রুপের আছে কমপক্ষে ২০ হাজার সশস্ত্র ক্যাড়ার। অত্যাধুনিক অস্ত্রে সজ্জিত বাহিনীর আছে আলাদা আলাদা ইউনিফর্ম, শক্তিশালী গোয়েন্দা বাহিনী আর নিজস্ব পতাকা।
জানা যায়, তিন পার্বত্য চট্টগ্রামে একসময় সন্তু লারমার নেতৃত্বাধীন জেএসএস এর একচ্ছত্র আধিপত্য ছিলো। তবে ১৯৯৭ সালে সরকারের সাথে করা শান্তি চুক্তির বিরোধিতা করে দলটির প্রভাবশালী নেতা প্রসীত খীসার নেতৃত্বে ইউনাইটেড পিপলস ডেমোক্রেটিক ফ্রন্ট নামে নতুন একটি দল গঠিত হয়।এরপর শুরু হয় দুইগ্রুপের ভ্রাতৃঘাতী সংঘর্ষ। পরে সন্তু লারমার জেএসএস আবারও ভেঙে জেএসএস সংস্কার আর ইউপিডিএফ ভেঙে ইউপিডিএফ গণতান্ত্রিক গঠিত হয়।
এদিকে বান্দরবানে মগ লিবারেশন পার্টি (এমএলপি) নামে নতুন একটি দল তৎপরতা চালাচ্ছে। ২০১০ সালে সংগঠনটির আত্মপ্রকাশ হলেও গত কয়েক বছর ধরে এদের তৎপরতা বেশি লক্ষ্য করা যায়।মুলত চাঁদার ভাগবাটোয়ারা নিয়ে জেএসেস ও আরাকান আর্মির মারমা সম্প্রদায়ের দলছুট কর্মীরাই এই গ্রুপটির নেতৃত্ব দিচ্ছেন।কমপক্ষে ৩ শতাধিক ক্যাডারের এই গ্রুপটি বান্দরবানের রোয়াংছড়ি, রুমা, থানচি উপজেলার বিভিন্ন পয়েন্টে চাঁদাবাজি চালাচ্ছে। এনিয়ে তাদের সাথে জেএসএসের কয়েক দফা সংঘর্ষ হয়। তারা মারমা সম্প্রদায়ের জন্য আলাদা একটি স্টেট গঠন করবে বলে তারা ইতোমধ্যে সাধারণ মারমাদের কাছ থেকে অনেকটা সহানুভূতি আদায় করেছে।
জানা যায়, এই চারটি গ্রুপের মধ্যে সন্তু লারমার জেএসেস ও প্রসীত খীসার ইউপিডিএফ এর তিন পার্ব্যত্য জেলায় আছে শক্তিশালী অবস্থান।আর জেএসেস সংস্কার রাঙামাটি – খাগড়াছড়ি ও ইউপিডিএফ গণতান্ত্রিক খাগড়াছড়ি ও মগ পার্টির শুধুমাত্র বান্দরবানে তৎপরতা দেখা যায়।তবে সম্প্রতি সুধাসিন্ধু খীসার জেএসএস (এমএন লারমা) এবং শ্যামল কান্তি চাকমার ইউপিডিএফ (গণতান্ত্রিক) এক হয়ে যাবতীয় সন্ত্রাসী কর্মকান্ড শুরু করে।এটি বুঝতে পেরে দীর্ঘদিনের বৈরিতা ফেলে চুক্তির পক্ষের সন্তু লারমার নেতৃত্বাধীন পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতি (জেএসএস) এবং চুক্তিবিরোধী প্রসীত খীসার নেতৃত্বাধীন ইউনাইটেড ডেমোক্রেটিক ফ্রন্টও(ইউপিডিএফ) অনেকটা এক হয়ে চাঁদাবাজিসহ যাবতীয় কাজ করছে।
জানা যায়, শান্তি চুক্তির বিরোধিতায় ইউপিডিএফের জম্ম বলা হলেও মুলত চাঁদাবাজির ভাগ বাটোয়ারা নিয়েই এটি সহ নতুন করে ৪ টি সংগঠন তৈরি হয়। সম্প্রতি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একটি প্রতিবেদনে বলা হয়, প্রতি বছর পাহাড়ে ৪ শত টাকা চাদাবাজি করে এই ৫ টি সংগঠন। মোবাইল কোম্পানি থেকে শুরু করে গরীব কৃষকের একটি কাঠাল বিক্রিতেও তারা টোকেন নামের চাঁদবাজি করে।আর নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যরা অভিযান চালালে এই তিন পার্বত্য জেলার সাথে থাকা ভারত ও মিয়ানমারের ১৭৩ কিলোমিটার অরক্ষিত সীমান্ত দিয়ে ওপারে চলে যাচ্ছে।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়,এই সশস্ত্র সংগঠনগুলো ইদানিং চাঁদাবাজির ক্ষেত্রে প্রতিনিয়ত তাদের কৌশল পরিবর্তন করছে। আগে তারা সশরীরে চাঁদার অর্থ সংগ্রহ করলেও এখন নিরাপত্তা বাহিনীর চোখ ফাঁকি দিতে মোবাইল ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে চাঁদার টাকা আদায় করে।এ কারণে তাদের গ্রেপ্তার করাটা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর জন্য কঠিন হয়ে পড়েছে। অন্যদিকে সশস্ত্র সংগঠনগুলোর চাঁদাবাজির বিষয়ে ভুক্তভোগী কেউ প্রকাশ্যে কথা বলতে চান না। কারণ কথা বললেই প্রাণ হারানোর ভয় কাজ করে তাদের মধ্যে।
এই বিষয়ে পার্বত্য বাঙালি নাগরিক পরিষদের সভাপতি এলখাস আল মামুন বলেন, ‘পার্বত্য চট্টগ্রামে কৃষক, শ্রমিক, ব্যবসায়ী, ঠিকাদার,যানবাহন মালিক সবাইকে চাঁদা দিয়ে নিজ নিজ পেশায় টিকে থাকতে হয়। শুধু তাই নয়, এই তিন পার্বত্য জেলায় চাকুরী জীবিদেরকেও তাদের আয়ের ৫ শতাংশ হারে এইসব দলকে চাঁদা দিতে হয়। না হয় খুন, গুমের শিকার হতে হচ্ছে। আর এই বিষয়ে স্থানীয় প্রশাসনকে জানালে তারা এইসব গ্রুপের সাথে সমঝোতা করে চলার পরামর্শ দেন।
এই বাঙালি নেতা বলেন,এই সন্ত্রাসীরা অনেক ভয়ংকর হয়। এদিকে সেদিক হলে খুন ঝরাতে একটুও চিন্তা করেনা। এরা সত্যি বলতে কি সেনাবাহিনী ছাড়া পুলিশ, বিজিবি কাউকে ভয় করেনা।এখন তাই পাহাড়কে শান্ত রাখতে সেনাবাহিনীর সদস্য বৃদ্ধির কোন বিকল্প নেই। পাশাপাশি পাহাড়িদের মতো বাঙালীদেরও সমান সহযোগিতা দিয়ে ক্ষমতার ভারসাম্য আনতে হবে।
এদিকে পাহাড়ে সশস্ত্র সংগঠনগুলোর তৎপরতাকে নিছক বিচ্ছিন্ন ঘটনা ও চাঁদাবাজির উদ্যেশ্যে বলে মানতে নারাজ
পার্বত্য বাঙালি ছাত্র পরিষদের সভাপতি ইঞ্জিনিয়ার সাকিব। তিনি বলেন, এই পার্বত্য চট্টগ্রামকে বাংলাদেশ থেকে বিচ্ছিন্ন করার ষড়যন্ত্র হিসেবে পাহাড়ি এইসব শক্তি অপতৎপরতা চালাচ্ছে। এক্ষেত্রে দেশ বিদেশি শক্তির পাশাপাশি কিছু দেশদ্রোহী এনজিও ইন্ধন দিচ্ছে।
তিনি বলেন, সরকার শান্তি চুক্তির সময়কার ৭২ টি ধারার এখন পর্যন্ত ৫০ টিই মেনে নিয়েছে। এরপরও সন্তু লারমাসহ সশস্ত্র সংগঠনগুলো অরাজকতা করছে। এর মানে হচ্ছে তারা শান্তি চায় না। তারা অরাজকতা করে পাহাড়কে বিচ্ছিন্ন করতে চায়। এদের এক পক্ষ বাংলাদেশ থেকে তিন পার্বত্য জেলাকে আলাদা করে জুমল্যান্ড করতে চায়।আরেক পক্ষ চায় পাহাড় থেকে ৮ লাখ বাঙালি উচ্ছেদ করে একক রাজত্য কায়েক করতে।শান্তি চুক্তির পরও যখন এরা বিশৃঙ্খলা করছে, তাহলে সরকারের উচিত এই চুক্তির পুনর্মূল্যায়ন করা।
এদিকে সন্ত্রাসীদের কর্মকাণ্ডে সাধারণ পাহাড়িরাও অসন্তুষ্ট।অনেকটা বাধ্য হয়েই যুবকদের একটি অংশ সন্ত্রাসে জড়িয়ে পড়ে। পরে অনুশোচনা নিয়ে কেউ স্বাভাবিক কাজে ফিরে আসতে চাইলেও আর ফিরে আসার সুযোগ থাকেনা।
এই বিষয়ে নাম প্রকাশ্যে অনিচ্ছুক বান্দরবানের লামার লামার স্থানীয় এক জেএসএস ( সংস্কার) নেতা বলেন, ‘আসলে আমরা চাইলেও এই পথ থেকে ফিরে আসার সুযোগ নেই।মূলত সন্তু লারমা তার ব্যক্তিগত স্বার্থে সাধারণ পাহাড়িড়ের গুটি হিসেবে ব্যবহার করছে। বাঙালি – পাহাড়ি সংঘাত লাগিয়ে রেখেছে। স্বজাতির ভাইদের রক্ত ঝরাচ্ছে। সে তো মন্ত্রী পদমর্যাদা নিয়ে বাংলাদেশ সরকার থেকে সব সুযোগ সুবিধা নিচ্ছে। বাকি ৮ লাখ পাহাড়ি জম্মু জনতা কি পাচ্ছে।এখন যুদ্ধ যখন সে শুরু করেছে,তাকেই এটা শেষ করতে হবে।’
বান্দরবান জেলার পুলিশ সুপার জেরিন আক্তার এই প্রতিবেদককে বলেন, ‘আসলে ভৌগোলিক কারণে পুলিশ প্রশাসন চাইলেও অনেক কিছু করতে পারে না।পাহাড়গুলো অনেক দুর্গম।সন্ত্রাসীরা অপরাধ করে দ্রুত পালিয়ে যায়।অনেক এলাকায় গাড়ি চলার রাস্তা নেই।হেঁটে হেঁটে যেতে হয়।এরপরও আমারা সর্বোচ্চ চেষ্টা করছি।সন্ত্রাসীদের ধরার চেষ্টা করছি।চাঁদাবাজির বিষয়ে অভিযোগ পেলেই আমরা ব্যবস্থা গ্রহণ করি।’
বান্দরবানের মগ পার্টির বিষয়ে এই পুলিশ কর্মকর্তা বলেন, ‘এই গ্রুপের কথা আমরা শুনেছি।তবে জেএসএস, ইউপিডিএফ এর মতো এদের প্রকাশ্য কোন অস্তিত্ব নেই।তাই এদের বিরুদ্ধে কোন ব্যবস্থা নেয়ার সুযোগ হয়না।’
