জালাল রুমি, বিশেষ প্রতিনিধি
পাহাড়ে তৎকালীন জনসংহতি সমিতির ( জেএসএস) বর্বরতা ঠেকাতে ১৯৯৭ সালের ২ ডিসেম্বর দলটির সাথে ঐতিহাসিক পার্বত্য শান্তি চুক্তিতে সই করেন বাংলাদেশ সরকার।চুক্তি অনুযায়ী তারা সরকার থেকে নানারকম লোভনীয় সুযোগ সুবিধা ভোগ করবেন।বিনিময়ে অস্ত্র সমর্পণ করে স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসবেন। তবে সরকার প্রায় সব শর্ত ধীরে ধীরে বাস্তবায়ন করলেও শান্তি ফিরেনি পাহাড়ে।বরং আধিপত্য কায়েমকে কেন্দ্র করে সেখানে তৈরি হয়েছে অনেকগুলো সশস্ত্র গ্রুপ।প্রতিনিয়ত নিজেদের মধ্যেই রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষে লিপ্ত হচ্ছে তারা।। পাশাপাশি আগের মতো সেখানকার বাঙালিদেরও নিপীড়ন করছে।শান্তি চুক্তির পরেই তাদের হাতে পাহাড়ি বাঙালি মিলিয়ে দুই সহস্রাধিক মানুষ খুন হয়েছে।এরমধ্যেই ‘কেএনএফ’ নামে নামে নতুন একটা সশস্ত্র গ্রুপের জম্ম হয়েছে পাহাড়ি এই জনপদে।
কেএনএফ এর পুর্নাঙ্গ রুপ কুকি-চিন ন্যাশনাল ফ্রন্ট (কেএনএফ)।২০১৬ সালে সশস্ত্র গ্রুপটি তৈরি হয়। তবে এই বছরের মে মাস থেকে তাদের কর্মকাণ্ড প্রকাশ্যে আসে।এই সংগঠনের সশস্ত্র সদস্যের সংখ্যা ৩ থেকে ৪ শতাধিক। তারা সবাই খ্রিস্টান ধর্মাবলম্বী। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা বিভাগের সাবেক শিক্ষার্থী ও ছাত্র ইউনিয়নের সাবেক নেতা নাথান বম এই সংগঠনের নেতা।তিনি রুমা উপজেলার এডেন পাড়ার অধিবাসী। রুমার এডেন পাড়ায় কুকি-চিন ন্যাশনাল ডেভেলপমেন্ট অর্গানাইজেশন (কেএনডিও) নামের একটি এনজিও আছে তার।২০১৮ সালের জাতীয় নির্বাচনে অংশগ্রহণও করেছিলেন তিনি।
জানা যায়,শুরুতেই এর সংগঠনের নাম ছিলো কুকি-চীন ন্যাশনাল ভলান্টিয়ার্স। প্রথমদিকে তারা শান্তিপূর্ণ কর্মসূচী পরিচালনা করে এবং ভারতের মনিপুর ও বার্মার চীন রাজ্যের বিচ্ছিন্নতাবাদীদের সাথে সম্পর্ক গড়ে তোলে।এই বছরের মে মাস থেকে তদের সশস্ত্র রুপ প্রকাশ্যে আছে। তাদের সদস্যরা মণিপুর, মিজোরাম ও বার্মায় প্রশিক্ষপ্রাপ্ত।
মূলত সন্তু লারমার জেএসএস থেকে বের হয়ে বম জাতিগোষ্ঠীর কিছু সদস্যকে নিয়ে নাথান বম সশস্ত্র এই সংগঠনটি তৈরি করেন। যে কারণে এটি বম বাহিনী নামেও পরিচিত। তবে কেএনএফ দাবি করছে, রাঙামাটি ও বান্দরবান অঞ্চলের ছয়টি জাতিগোষ্ঠীর প্রতিনিধিত্ব করছে তারা। সেগুলো হলো বম, পাংখোয়া, লুসাই, খিয়াং, ম্রো ও খুমি। এই ছয়টি জাতি অধ্যুষিত রাঙামাটির বাঘাইছড়ি, বরকল, জুরাছড়ি ও বিলাইছড়ি এবং বান্দরবানের রোয়াংছড়ি, রুমা, থানচি, লামা ও আলীকদম—এই উপজেলাগুলো নিয়ে আলাদা রাজ্য গঠন করা হবে।
যদিও বিশ্বস্ত সূত্রে জানা যায়, স্বায়ত্তশাসনের পাশাপাশি পাহাড়ে চাঁদাবাজিও চোরাকারবারের ভাগবাটোয়ারা নিয়ে জেএসএসের সাথে মনোমালিন্যের জের ধরে এই সংগঠনটির প্রতিষ্ঠা।এছাড়া বম সম্প্রদায় নিজেদের পার্বত্য চট্টগ্রামের আদি বাসিন্দা বলে মনে করে। চাকমা, মারমা, ত্রিপুরা প্রভৃতি জনগোষ্ঠীকে তারা বার্মিজ, ভারতীয় জাতিভূক্ত এবং বহিরাগত মনে করে।জেএসেসের নেতাদের অধিকাংশ চাকমা ও মারমা সম্প্রদায়ের। যে কারণে তারা জেএসএস থেকে বের হয়ে আলাদা সংগঠন করেছে।আর প্রতিষ্ঠার পর থেকেই জেএসসের সাথে সংঘাতে জড়াচ্ছে তারা।এরপর্যন্ত কেএন এফের হাতে এপর্যন্ত জেএসএসের ১৫-২০ জন কর্মী নিহত হয়।আর আহত হয় অর্ধশাতাধিক।
এদিকে জেসএসসের সাথে এই সংঘাতের বিবরণ নিজেদের ফেসবুক পেইজে দিয়ে দেয় সংগঠনটি।সর্বশেষ গত ২১ জুম জাইজাম পাড়ায় জেএসএস-এর ক্যাম্পে কেএনএফ’র কমান্ডোরা হামলা সেখানেই ৪জন নিহত হয়।তবে পরে জানা যায়, নিহতদের মধ্যে ২ জন সাধারণ পাহাড়ি।ওই ঘটনার দিন বিকেলে ওই ঘটনার বিবরণ দিয়ে নিজেসের ফেসবুক পেইজে বিবৃতিও দেন কেএনএফ।
লে.কর্ণেল সলোমন নামে নিজেদের মিডিয়া উইন প্রধানের বরাত দিয়ে সেখানে বলা হয়,’আজ জুন ২১ তারিখ সন্ধ্যা ৬ ঘটিকার সময় কেএনএফ-এর স্পেশ্যাল কমান্ডো ফোর্স হেড-হান্টার টিম সন্ত্রাসী জেএসএস’র সশস্ত্র বাহিনী জেএলএ-এর জাইজাম বেসমেন্ট ক্যাম্পে সফলভাবে হামলা চালিয়েছে। এতে জেএলএ বাহিনীর ৩ জন গুলিবিদ্ধ হয়ে ঘটনাস্হলে নিহত হয় তবে আহত অবস্থায় ট্রেইনি সহ অন্যরা সবাই পালিয়ে যেতে সক্ষম হয়।’
জানা যায়,কেএনএফ এর সাথে পাহাড়ের অন্যান্য গ্রুপের প্রধান পার্থক্য দেখা যায় আয়ের ক্ষেত্রে।জিএসএসসহ অন্যান্য সংগঠনগুলো মুলত স্থানীয় ব্যবসায়ী থেকে শুরু করে সাধারণ মানুষের কাছ থেকে নেয়া চাঁদার টাকায় নিজেদের সাংগঠনিক কর্মকাণ্ড চালায়।এছাড়া বিভিন্ন বিদেশী সংস্থাও তাদের অর্থায়ন করে বলে অভিযোগ আছে।তবে কেএনএফ এর আয়ের প্রধান উৎস চোরাকারবারি। তারা বান্দরবান – মিয়ানমারের সীমান্ত পথ ব্যবহার করে ইয়াবা, মাদক ও গরু চোরাচালান নিয়ন্ত্রণ করছে।এছাড়া আন্তর্জাতিক চোরাকারবারিদের কাছ থেকে আদায় করছে মোটা অংকের চাঁদা। এই অর্থ তারা ভারী অস্ত্রশস্ত্রসহ সদস্যদের ভরণপোষণে ব্যয় করছে।
এদিকে অভিযোগের বিষয়ে কেনএনএফ এর কোন নেতার বক্তব্য পাওয়া যায়নি।তাদের ফেসবুক পেইজ ‘কুকি-চিন ন্যাশনাল ফ্রন্ট (কেএনএফ) এ মেসেজ দিয়ে বক্তব্য জানতে চাইলেও কেউ সাড়া দেননি।
তবে এই বিষয়ে বান্দরবান জেলা পুলিশ সুপার জেরিন আক্তার বলেন, ‘ কয়েক দিন ধরে কেএনএফ নামে একটা সংগঠনের বিষয়ে কথাবার্তা চলছে।আমরা খোঁজ নিচ্ছি।তবে এরা যেখানে থাকে সেটা অত্যন্ত প্রত্যন্ত এলাকা। যে কারণে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর এদের নাগাল পেতে কষ্ট হয়।
প্রসঙ্গত, কেএনএফ ছাড়াও পার্বত্য চট্টগ্রামে বর্তমানে উপজাতিদের ৫ টি সংগঠন তাদের সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড চালাচ্ছে। এই সংগঠনগুলো হলো সন্তু লারমার নিয়ন্ত্রণাধীন জেএসএস, প্রসীত খীসার নেতৃত্বাধীন ইউপিডিএফ, সুধাসিন্ধু খিসালের নেতৃত্বাধীন জেএসএস সংস্কার, শ্যামল চাকমার নেতৃত্বাধীন ইউপিডিএফ গণতান্ত্রিক ও বান্দরবানের ম্রো সম্প্রদায়ের নেতৃত্বাধীন মগ লিবারেশন পার্টি।এই চারটি গ্রুপের মধ্যে সন্তু লারমার জেএসেস ও প্রসীত খীসার ইউপিডিএফ এর তিন পার্বত্য জেলায় আছে শক্তিশালী অবস্থান।জেএসএস সংস্কারের তৎপরতা রয়েছে রাঙামাটি ও খাগড়াছড়ি জেলায়। ইউপিডিএফ গণতান্ত্রিকের শুধুমাত্র খাগড়াছড়ি ও মগ পার্টির বান্দরবানে তৎপরতা দেখা যায়।এই গ্রুপগুলোর আছে কমপক্ষে ২০ হাজার সশস্ত্র ক্যাডার। অত্যাধুনিক অস্ত্রে সজ্জিত এইসব বাহিনীর আছে আলাদা আলাদা ইউনিফর্ম, শক্তিশালী গোয়েন্দা বাহিনী আর নিজস্ব পতাকা।
