ইবনে জহুর, বিশেষ প্রতিনিধি
গোটা বিশ্ব এখন মজে আছে বিশ্বকাপ ফুটবলে।এরমধ্যে বাংলাদেশে অন্যরকম এক খেলার প্রস্তুতি চলছে। আওয়ামী লীগ- বিএনপির রাজনীতি খেলা।সেই খেলার রেশ পড়েছে বন্দরনগরী চট্টগ্রামেও। ইতোমধ্যে এখানকার ঐতিহাসিক পলোগ্রাউন্ড মাঠে দুই দলই তাদের রিহার্সেল শেষ করেছে। এরমধ্যে পলোগ্রাউন্ড মাঠের মহাসমাবেশে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের সেই খেলার কথা চট্টগ্রাম বিএনপিকে আবারও স্বরণ করিয়ে দিয়েছেন। সব মিলিয়ে আসন্ন দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে আবারও উত্তপ্ত হচ্ছে দেশের বাণিজ্যিক রাজধানী চট্টগ্রামের রাজনীতির মাঠ।
গত ৪ ডিসেম্বর পলোগ্রাউন্ড মাঠে ওবায়দুল কাদের বলেন, ‘কর্ণফুলীর সব ঢেউ আজ পলোগ্রাউন্ডে। বঙ্গোপসাগরের সব ঢেউ আজ চট্টগ্রাম শহরে। দেখে যান জনপ্রিয়তা কাকে বলে। ফখরুলকে বলছি কান পেতে শুনুন মহাসাগরের গর্জন। শুনতে পাচ্ছেন? আপনি না শুনতে পেলে আমির খসরু, নোমান সাহেব, মীর নাছির সাহেব, আপনারা একটু দেখেন চট্টগ্রাম শহরের আজ কী অবস্থা। এখানে যা লোক, তার ৮ গুন বেশি লোক বাইরে। গোটা চট্টগ্রাম আজকে মিছিলের নগরী। এটা মহাসমাবেশ নয়, মহাসমুদ্র।খেলা হবে? হবে খেলা! বীর চট্টলা তৈরি। খেলা হবে।’
এদিকে খোঁজ নিয়ে জানা যায়, গত ৪ ডিসেম্বরের সমাবেশে উপস্থিতি দেখে চট্টগ্রামের সিনিয়র নেতাদের পাশাপাশি তৃণমূলের নেতা-কর্মীরাও উজ্জীবিত। সমাবেশে বড় ধরণের জনসমগমের প্রস্তুতি নিলেও এতো মানুষ হবে তা আশা করেনি অনেকে। এই পলোগ্রাউণ্ডে গত ১২ তারিখে বিএনপির সমাবেশ দেখে ‘মন খারাপ” করা দলটির নেতাকর্মীরাও এখন দারুণ ফুরফুরে মেজাজে আছেন।
চট্টগ্রাম দক্ষিণ জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক মফিজুর রহমান সাম্পান নিউজকে বলেন, আমাদের সমাবেশে কমপক্ষে ১০ লাখ মানুষ হয়েছে।এটা স্বরণকালের সবচেয়ে বড় সমাবেশ।ওই সমাবেশ আমাদের জন্য চ্যালেঞ্জ হিসেবে ছিলো। সেই চ্যালেঞ্জে আমরা জিতেছি।জনতার জোয়ার দেখে আমাদের নেতাকর্মীরা এখন দারুণভাবে উজ্জীবিত।
চট্টগ্রাম মহানগর আওয়ামী লীগের সহ-সভাপতি ও চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের সাবেক প্রশাসক খোরশেদ আলম সুজন বলেন, সমাবেশে জনতার ঢল নেমেছে।আমরা যতটুকু আশা করছি তার চেয়েও বেশি মানুষ হয়েছে।নিউমার্কেট মোড় থেকে ওয়াসা দেওয়ান হাট পর্যন্ত জনতার স্রোত ছিলো পলোগ্রাউন্ডের দিকে। ফখরুল সাহেবরা যদি খেলার কথা বলেন, তাহলে আমি বলবো তারা খেলার আগেই হেরে গেছেন।কারণ তারা বিভাগীয় মহাসমাবেশের করে যত লোক সমাগম করেছে, আমাদের চট্টগ্রাম জেলার প্রোগ্রামে তার চেয়ে কয়েক গুণ বেশি মানুষ হয়েছে।
৪ তারিখের সমাবেশ আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদেরের সেই খেলা’র প্রস্তুতি সমাবেশ কিনা জানতে চাইলে চট্টগ্রাম উত্তর জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি আলহাজ্ব এম এ সালাম বলেন, ‘আমরা এসব খেলা ঠেলায় বিশ্বাসী না।আওয়ামী লীগ স্বচ্ছ রাজনীতিতে বিশ্বাস করে।আমরা কোন ধরনের হিংসাত্মক কর্মকাণ্ডে যাবো না।তবে বিরোধীদের সব ধরনের কর্মকান্ড আমরা রাজনৈতিকভাবে মোকাবিলা করতে প্রস্তুত আছি।’
এদিকে খোঁজ নিয়ে জানা যায়, চট্টগ্রাম জেলায় আওয়ামী লোগ থেকে নির্বাচিত ১৪ জন এমপি প্রধানমন্ত্রীর সমাবেশে লোক সমাগমে বড় ধরনের ভূমিকা রেখেছে।আগামী নির্বাচনে মনোনয়ন পেতে এই এমপিদেরকে সর্বোচ্চ লোকবল নিয়ে হাজির হতে বলা হয়েছিল কেন্দ্র থেকে।এক্ষেত্রে তাদের প্রতিজনের জন্য আলাদা ড্রেস কোডও ঠিক করে দেয়া হয়েছিল।যে কারণে সমাবেশে উপস্থিতি বাড়াতে তারাও সর্বোচ্চ চেষ্টা করেছে।আর আগামী নির্বাচনে দলীয় প্রার্থী বাছাইয়ের প্রথম পরীক্ষায় তারা উত্তীর্ণ হয়েছেন বলে জানিয়েছেন দলটির একটি সূত্র।
এই সূত্রটি বলেছে, এই সমাবেশ চট্টগ্রাম মহানগরের বর্তমান ভারপ্রাপ্ত সভাপতি মাহতাবউদ্দিন চৌধুরী ও সেক্রেটারি আ জ ম নাসির উদ্দিনের জন্য একটি চ্যালেঞ্জ ছিলো ।সমাবেশে সুশৃঙ্খলভাবে আয়োজন ও বিপুল উপস্থিতির কারণে মহানগর আওয়ামী লীগে তাদের অবস্থান আরও সুসংহত হয়েছে।যে কারণে নির্বাচনের আগে মহানগর কমিটিতে আর নতুন নেতৃত্ব না আনার বিষয়ে নীতিগত সিদ্ধান্ত নিয়েছে কেন্দ্রীয় সংগঠন।
এদিকে দীর্ঘদিন ধরে কোণঠাসা বিএনপি এই বছরের প্রথম দিক থেকে মাঠে আসতে শুরু করে।এরমধ্যে তারা চট্টগ্রাম মহানগর, উত্তর ও দক্ষিণ জেলায় তৃণমূলে কমিটি গঠন করা হয়। এরপর জ্বালানি ও নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্রের দাম বৃদ্ধির প্রতিবাদে সেই সব কমিটির উদ্যোগে বিক্ষোভ কর্মসূচি পালন করে।সর্বশেষ গত ১২ অক্টোবর পলোগ্রাউন্ড মাঠে বিভাগীয় সমাবেশের নেতাকর্মীদের ঢল নামে।সেই সমাবেশের পর নেতাকর্মীরা দারুণভাবে উজ্জীবিত।
চট্টগ্রাম উত্তর জেলা বিএনপির যুগ্ন আহবায়ক আলহাজ্ব সালাহ উদ্দিন বলেন,’ আমাদের উপর এতো প্রতিবন্ধকতা ছিলো।প্রচার প্রচারণা চালাতে দেয়া হয়নি।নেতাকর্মীদের বাসায় বাসায় গিয়ে পুলিশ প্রোগ্রামে না আসার জন্য ভয়ভীতি দেখিয়েছে,গণ গ্রেফতার করেছে।এরপরও সেই মহাসমাবেশ মহাসমূদ্রে পরিণত হয়েছিল।
তিনি বলেন, আমাদের সমাবেশ দেখে তাদের মাথা খারাপ হয়ে গিয়েছিল।প্রতিক্রিয়া হিসেবে গত ৪ তারিখ এখানে তারাও সমাবেশে করেছে।রাষ্ট্রযন্ত্রকে নোংরাভাবে ব্যবহার করে তারা সর্বোচ্চ চেষ্টা করেছিল। গার্মেন্টস থেকে শুরু করে কলকারখানা, স্কুল কলেজ, সরকারি অফিস – সবগুলো থেকে জোরপূর্বক মানুষ এনে এখানে তাদের অবস্থান দেখাতে চেয়েছে।এমনকি স্কুল কলেজ পর্যন্ত বন্ধ করে শিক্ষার্থীদের পলোগ্রাউন্ডে নিয়ে এসেছে।এরপরও আমাদের সমাবেশের সমান মানুষ হয়নি।সবচেয়ে বড় কথা আমাদের সমাবেশের প্রধান অতিথি ছিলেন মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর সাহেব৷ আর তাদের সমাবেশে স্বয়ং দলের প্রধান শেখ হাসিনা উপস্থিত ছিলেন।
এদিকে মাঠে সরব হওয়ার সাথে সাথে চট্টগ্রামে বিএনপির অভ্যন্তরীণ কোন্দল আবারও মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছে।বিশেষ করে চট্টগ্রাম উত্তর ও দক্ষিণ জেলায় সেই বিরোধ রক্তপাত পর্যন্ত গড়িয়েছে।এরমধ্যে অপর পক্ষের কয়েকজনকে ছুরিকাঘাত করার ঘটনায় গত ১৭ অক্টোবর দক্ষিণ জেলার আওতাধীন আনোয়ারা উপজেলা বিএনপির সদস্য সচিব লায়ন হেলাল উদ্দিনসহ ৪ জনকে দল থেকে অব্যাহতি দেয় কেন্দ্রীয় সংগঠন। গত ২৪ নভেম্বর চট্টগ্রাম উত্তর জেলা বিএনপির আহবায়ক গোলাম আকবর চৌধুরীর বাসায় রাঙ্গুনিয়া উপজেলা বিএনপির আহবায়ক ও সদস্য সচিবকে ধাওয়া করে বিরোধী গ্রুপ। ২৬ জুন রাউজান উপজেলা বিএনপির সাধারণ সভাও পণ্ড হয়ে যায়।সর্বশেষ এই দুইটি সভাতেই চট্টগ্রাম উত্তর জেলা বিএনপির আহবায়ক গোলাম আকবরের সাথে প্রয়াত সালাহ উদ্দিন কাদের চৌধুরী সমর্থকদের বাকবিতন্ডা হয়।
এদিকে পলোগ্রাউন্ড মাঠের সমাবেশ পরবর্তী চট্টগ্রাম বিএনপির বর্তমান অবস্থান নিয়ে জানতে চাইলে দলের চট্টগ্রাম বিভাগীয় সাংগঠনিক সম্পাদক মাহবুবের রহমান শামীম বলেন, দীর্ঘদিন ঘাত প্রতিঘাত সহ্য করতে করতে নেতাকর্মীরা এখন হুমকি ধুমকিকে ভয় পায় না।বিশেষ করে সব ধরনের বাধা বিপত্তি ডিঙিয়ে গত ১২ তারিখ পলোগ্রাউন্ড মাঠে আমরা স্বরণকালের সবচেয়ে বড় সমাবেশ করেছি।এই সমাবেশ থেকেই সরকার অটোমেটিক হলুদ কার্ড পেয়ে গেছে। আমাদের নেতাকর্মীরা এখন সংগঠিত। তারা এখন কেন্দ্রের বড় কোন সিদ্ধান্তের জন্য অপেক্ষা করছে।’
দলের মধ্যে ইদানিং শুরু হওয়া কোন্দল ও গ্রুপিং নিয়ে জানতে চাইলে মাহবুবের রহমান শামীম বলেন, বিএনপি বিশাল একটি দল।তাই এখানে নেতাকর্মীদের মধ্যে সামান্য মনোমালিন্য, অভিযোগ থাকা স্বাভাবিক। তবে এরকম কোন বিষয় প্রকাশ্যে আসলে আমরা সেগুলো দ্রুত সমাধানের চেষ্টা করি।
এদিকে চট্টগ্রামের রাজনীতিতে একসময়ের ছড়ি ঘুরানো ক্যাডারভিত্তিক দল জামায়াতও ভেতরে ভেতরে মাঠে নামার প্রস্তুতি নিচ্ছে। সরকারের কঠোর অবস্থানের কারণে অনেকটা আত্মগোপনে থাকা দলটির নেতাকর্মীরা নিত্য নতুন কৌশল বের করে প্রশাসনের চোখ ফাঁকি দিয়ে গোপন ও ভার্চ্যুয়াল প্রোগ্রামের মাধ্যমে এখন অনেকটা সুসংগঠিত। ইতিমধ্যে শহরে জামায়াত শিবির প্রকাশ্যে কয়েকটি বড় শোড়াউন করে নিজেদের অবস্থান জানান দিয়েছে।এই মাসের মাঝামাঝি সময়ে চট্টগ্রাম মহানগর, উত্তর ও দক্ষিণ জেলার নতুন কমিটি গঠনের পর আগামী বছরের শুরুতেই তারা প্রকাশ্যে মাঠে নামার সিদ্ধান্ত নিয়েছে বলে জানিয়েছে দলটির কয়েকটি সূত্র।
নগর জামায়াতের এক শীর্ষ নেতা নাম প্রকাশ করার শর্তে বলেন,’ রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় আওয়ামী লীগ মহাসমাবেশ করেছে।যা ইচ্ছা তাই করতে পারছে।বিএনপিও যেভাবে হোক প্রকাশ্যে অনেক সমাবেশ করতে পারছে।তবে সরকার আমাদের সভা সমাবেশের মৌলিক অধিকার হরণ করেছে।এরপরও আমরা আমাদের মতো সাংগঠনিক কর্মকাণ্ড , দাওয়াতি কর্মকাণ্ড চালাচ্ছি।সামনে কোন আন্দোলন সংগ্রাম মাঠে গড়ালে সেটার জন্যও আমরা প্রস্তুত আছি। ‘
এদিকে বিএনপি জোটসঙ্গী জামায়াত ভেতরে ভেতরে আসন্ন খেলার (আন্দোলন) জন্য প্রস্তুতি নিলেও আওয়ামী লীগ জোটের জাতীয় পার্টির কোন খবর নেই।দলটির চট্টগ্রামের ৩ টি ইউনিটের মধ্যে মোটামুটি চোখে পড়ত মহানগর কমিটির কার্যক্রম। সেটিও বর্তমানে জিএম কাদের ও রওশন কাদেরের বিরোধের কারণে স্থবির হয়ে আছে।
জাতীয় পার্টির চট্টগ্রাম মহানগর কমিটির আহবায়ক সোলাইমান আলম শেঠ বলেন, ‘ আমরা তো দলকে ভালো ভাবেই চালাচ্ছিলাম।এরমধ্যে আপনারা তো দেখলেন কেন্দ্রের গণ্ডগোল। ইতিমধ্যে চেয়ারম্যান সাহেবের উপর আদালত থেকে নিষেধাজ্ঞা দিলো।সব কাজে তাই ভাটা পড়ে গেছে।আশা করছি সব সংকট কাটিয়ে আমরা আবার এগিয়ে যাবো।
