সাজেদুল হক
বাংলাদেশের রাজনীতি এক জায়গায় দাঁড়িয়ে। গেল কয়েক বছরে এ লাইনটি অনেকবার লেখা হয়েছে। জোয়ার-ভাটার দেশে এমনকি এক দশক আগেও এটা ছিল অকল্পনীয়। এমনিতে রাজনীতি নিয়ে এখন মানুষের মধ্যে তেমন আগ্রহ নেই। এক সময় এখানে ভোট মানে ছিল উৎসব। এখন ভোটাররা মুখ ফিরিয়ে নিয়েছেন। তবে ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে মিশ্র দৃশ্য দেখা যাচ্ছে। কোথাও কোথাও সরকারি দলের প্রার্থীরা বিনা ভোটে উতরে গেছেন।
মনোনয়ন কার্ড পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে ভেসেছেন অভিনন্দনে। আর কোথাও কোথাও লড়াই হচ্ছে তীব্র। বলাই বাহুল্য মাঠে আওয়ামী লীগ নেতারাই। কেউ দলের মনোনয়ন পেয়েছেন। কেউ স্বতন্ত্র। এসব এলাকায় ভোটের হারও বেশ ভালো। যদিও ঘরের ভেতরকার এ লড়াইয়ে রক্তপাতও হচ্ছে। মারা যাচ্ছে মানুষ।
যে কথা বলছিলাম রাজনীতি নিয়ে মানুষের আগ্রহ আর আগের মতো নেই। এক সময় গ্রামের চায়ের দোকানগুলো ব্যস্ত থাকতো রাজনৈতিক আড্ডায়। ‘এখানে রাজনৈতিক আলাপ নিষিদ্ধ’ লিখেও নিস্তার মিলতো না। মুখে চা, হাতে বিড়ি-সিগারেট। উজির-নাজির মারতেন প্রান্তিক এ মানুষগুলো। একধরনের চাঞ্চল্য ছিল সবসময়। আজ যখন নতুন বছর শুরু হচ্ছে তখন গ্রামের চায়ের দোকানগুলো ধারাবাহিকভাবেই চুপচাপ। রাজনীতি নিয়ে আলাপ বলতে গেলে শোনাই যায় না। তবে গেল কিছুদিনে ঢাকার অভিজাত ক্লাবের আড্ডায় রাজনীতি নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। বিশিষ্ট মানুষদের আড্ডায় ফিরে এসেছে রাজনীতির কথা। বিশেষ করে আমেরিকার কিছু ঘোষণার পর অনেকে বোঝার চেষ্টা করছেন পরিস্থিতি। কী হচ্ছে? আগাম নির্বাচন কিংবা রাজনৈতিক সমঝোতা এমন গুজবও আছে। চীনা রাষ্ট্রদূতের বিরুদ্ধে বিএনপির প্রকাশ্য অবস্থানও কম বিস্ময়কর নয়। কখনো কখনো টানাপড়েন হয়েছে। তারপরও চীনকে সবসময়ই বিএনপির ঐতিহাসিক মিত্র বিবেচনা করা হয়। কিন্তু সেটা যে এখন অতীত তা না বললেও চলে। চীন নিয়ে বিএনপির অবস্থান প্রসঙ্গে দলটির স্থায়ী কমিটির সদস্য ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকুর ভাষ্যও প্রনিধানযোগ্য। মানবজমিনকে তিনি এ প্রসঙ্গে বলেন, ‘‘বিএনপি একটি জাতীয়তাবাদী দল। বিএনপি কতৃত্ববাদী রাজনীতিতে বিশ্বাস করে না। যেহেতু চীনা রাষ্ট্রদূত কতৃত্ববাদী রাজনীতির পক্ষ নিয়েছেন, এই সরকারের পক্ষ নিয়েছেন, বিএনপি যেহেতু বহুদলীয় গণতন্ত্রে বিশ্বাস করে তাই তারা এর প্রতিবাদ জানিয়েছে।’’ তবে বিএনপির বিদেশনীতিতে কোনো পরিবর্তন আসেনি বলে জানান তিনি।
কেমন হবে ২০২২ সালের রাজনীতি? বিলিয়ন ডলারের প্রশ্ন বটে। রাজনীতিতো আর জৌতিষশাস্ত্র নয়। ভবিষ্যত দেখা যায় না! কিন্তু রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করতে পারেন। দাঁড় করাতে পারেন সম্ভাব্য সমীকরণ। সরকারের মেয়াদ আছে আর দুই বছর। তাই সামনের রাজনীতির একটি নির্ধারক হতে পারে চলতি বছর। এ বছরই কিছুটা হলেও খোলাসা হতে পারে আগামীদিনে কী ঘটবে।
রাজনীতি এমনিতে পুরোই সরকারি দলের নিয়ন্ত্রণে। সহায়ক এবং আন্তর্জাতিক শক্তিগুলো অবশ্য এক্ষেত্রে অন্যতম প্রধান ভূমিকা রেখেছে এবং রেখে চলেছে। এই পরিস্থিতিতে স্টাটাসকোই হবে সম্ভবত ক্ষমতাসীন দলের প্রধান চাওয়া। অর্থাৎ পরিস্থিতি যেমন আছে তেমনই থাকুক। বিশ্লেষকরা মনে করেন, সহসাই এই পরিস্থিতির পরিবর্তনের সম্ভাবনাও ক্ষীণ। সরকারকে চ্যালেঞ্জ জানাতে সক্ষম রাজনীতির মাঠে এমন বিরোধী শক্তির উপস্থিতি বলতে গেলে নেইই।
বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া রাজধানীর এভার কেয়ার হাসপাতালে জীবন-মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে রয়েছেন। চিকিৎসার জন্য তাকে বিদেশ নেয়ার অনুমতি চেয়েও পাওয়া যায়নি। তার দল বছরের শেষদিকে কিছুটা নড়াচড়া করছে। ১৪৪ ধারা ভঙ্গ করেও দুই/একটি জায়গায় মিছিল করার খবর মিলছে। কিন্তু এ আন্দোলনকে নেতারা কোনদিকে নিয়ে যেতে চান বলা মুশকিল। খালেদা জিয়াকে বিদেশ যাওয়ার অনুমতি না দিলে বিএনপির এমপিরা পদত্যাগের হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেছিলেন। এখন মনে হচ্ছে, সেটি কথার কথাই ছিল। যদিও তাদের সংসদে যোগ দেয়া নিয়ে শুরু থেকেই প্রশ্ন রয়েছে। বিএনপির লাখ লাখ নেতাকর্মীর বিরুদ্ধে রয়েছে মামলা। কেন্দ্রীয় নেতাদের প্রত্যেকের বিরুদ্ধে রয়েছে একাধিক মামলা। এসব মামলার বেশিরভাগই নিষ্পত্তির অপেক্ষায়। নানামুখী চাপে এবং প্রলোভনে দলটির অনেক নেতাই অতীতে নিজেদের অবস্থানে অনড় থাকতে পারেননি। বিশ্লেষকরা বলছেন, ২০২২ সালে আন্দোলন কিংবা নির্বাচনের ব্যাপারে বিএনপির অবস্থান আরও স্পষ্ট হবে।
গত কয়েক বছরে বারবার আলোচনায় এসেছে হেফাজতে ইসলাম। কিন্তু বর্তমানে সংগঠনটি অনেকটাই গুরুত্ব হারিয়েছে। সংগঠনটির শীর্ষ কয়েকজন নেতা মৃত্যুবরণ করেছেন। আল্লামা আহমদ শফীর মৃত্যুর পরই অবশ্য অনেকটা বিভক্ত হয়ে পড়ে কওমি ভিত্তিক সংগঠনটি। এরপর মাওলানা জুনায়েদ বাবুনগরী এবং নূর হোসাইন কাসেমীর মতো গুরুত্বপূর্ণ নেতাও মৃত্যুবরণ করেছেন। দ্বিতীয় সারির নেতাদের প্রায় সবাই এখনো বন্দি। সহসা হেফাজত ঘুরে দাঁড়াতে পারবে এমন সম্ভাবনাও কম। জাতীয় পার্টির এখন রাজনীতিতে স্বতন্ত্র অবস্থান নেই বললেই চলে। কেন্দ্রীয় নেতাদের মৃত্যুদণ্ড এবং প্রশাসনিক চাপে জামায়াত ইতিমধ্যে বিপর্যস্ত। ড. রেজা কিবরিয়া এবং নুরুল হক নুরের নেতৃত্বে নতুন দল গণঅধিকার পরিষদ অবশ্য প্রায় সব বিষয়েই সরব। কিন্তু এখনো সম্ভবত দেশব্যাপী এ সংগঠনের ভিত্তি গড়ে ওঠেনি। এই পরিস্থিতিতে অনেকটা নীরবের ফের জাতীয় সরকারের ফর্মুলা হাজির করেছেন জেএসডি সভাপতি আসম রব। তার এই প্রস্তাবের প্রতি সমর্থন জানিয়েছেন নুরুল হক নুর। ডাকসু’র এই সাবেক ভিপি বলেছেন, অন্তত দুই বছরের জন্য জাতীয় সরকার গঠন হতে পারে।
বঙ্গভবনে রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে সংলাপ করছেন প্রেসিডেন্ট আবদুল হামিদ। বিএনপি এরইমধ্যে জানিয়ে দিয়েছে, তারা সংলাপে যাবে না। সংলাপ, সার্চ কমিটি ও নির্বাচন কমিশন। অতীতে এ ফর্মুলায় অবাধ নির্বাচন আসেনি। ভবিষ্যতেও আসার সম্ভাবনা ক্ষীণ। যদিও বিশিষ্ট নাগরিকদের একটি দল এই সংলাপকে স্বাগতই জানিয়েছেন। তারা অবশ্য এজেন্ডায় গণতন্ত্র ও নির্বাচনকে আনার পরামর্শ দিয়েছেন।
কী হবে ২০২২ সালে। রাজনীতি কী এখনকার মতো ক্ষমতাসীন দলের নিয়ন্ত্রণেই থাকবে? আন্তর্জাতিক রাজনীতি বড় ভূমিকা নেবে? একইবৃত্তে ঘুরপাক খাবে বিএনপি? নতুন কোনো সংগঠনের উত্থান হবে? তবে আপাত যা দেখা যাচ্ছে, গুজবের মেশিন ফের ঘোরা শুরু হয়েছে।
লেখক :
প্রধান বার্তা সম্পাদক, দৈনিক মানবজমিন
