নিজস্ব প্রতিবেদক:
বুধবার (১৪ মে) চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ৫ম সমাবর্তন অনুষ্ঠিত হচ্ছে। ২০১১ সাল থেকে ২০২৩ সাল পর্যন্ত বিভিন্ন ডিগ্রি পাওয়া শিক্ষার্থীদেরকে নিয়েই এবারের সমাবর্তন। ইতোমধ্যে পঞ্চম সমাবর্তনের প্রায় সব প্রস্তুতি সম্পন্ন করেছে কর্তৃপক্ষ।
বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তে এসে নিষিদ্ধ সংগঠন ছাত্রলীগের হাতে নির্মমভাবে খুনের শিকার হয়েছেন অনেকেই। অথচ শিক্ষাজীবন শেষ করলে তারাও এবারের সমাবর্তনে অংশগ্রহণ করার কথা ছিল।
রাজনৈতিক প্রতিহিংসায় গত ১৫ বছরে প্রাণ গেছে এসব শিক্ষার্থীর। এসব হত্যাকাণ্ডের পর আবাসিক হলে হলে অভিযান, গ্রেপ্তার, মামলা এবং একাধিক তদন্ত কমিটি হলেও বিচার হয়নি একটিরও। বিগত সময়ের ক্ষমতাসীন দলের ছাত্র সংগঠন নিষিদ্ধ ছাত্রলীগের নেতাকর্মীদের আধিপত্য বিস্তার, অভ্যন্তরীণ কোন্দল, চাঁদাবাজি, টেন্ডারবাজি মূলত এসব হত্যাকাণ্ডের প্রধান কারণ।
হারুন অর রশীদ কায়সার: ২০১০ সালের ২৮ মার্চ রাতে শাটল ট্রেনে করে চট্টগ্রাম শহর থেকে ক্যাম্পাসে ফেরার পথে চবি মার্কেটিং বিভাগের তৃতীয় বর্ষের মেধাবী ছাত্র হারুন অর রশীদ কায়সারকে গলাকেটে নৃশংসভাবে হত্যা করা হয়। এরপর তার মরদেহ নগরীর চৌধুরীহাট রেল স্টেশন এলাকায় ফেলে দেয়। ছাত্রলীগ কর্মীরা ট্রেনের বগিতে কুপিয়ে জবাই করে মৃত্যু নিশ্চিত করে এই শিবির কর্মীর। ২০১১ সালের মাস্টার্স শেষ করলে এবছর কায়সার সমাবর্তনে উপস্থিত থাকবার কথা ছিল।
আসাদুজ্জামান আসাদ: ২০১০ সালের ১৪ এপ্রিল দিবাগত রাতে চবি ছাত্রলীগ ও বিশ্ববিদ্যালয় সংলগ্ন জোবরা এলাকার আওয়ামী লীগ নেতাদের বাকবিতন্ডা হয়। বৈশাখী মেলায় ইভটিজিং করা নিয়ে এই বাকবিতন্ডার শুরু। পরে চবি ছাত্রলীগ ও গ্রামবাসীর মধ্যে সংঘর্ষে একাউন্টিং দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্র ও ছাত্রলীগ কর্মী আসাদুজ্জামান আসাদ ১৫ এপ্রিল নিহত হন। আসাদ ২০১১ সালে বিবিএ এবং ২০১২ সালে এমবিএ শেষ করার কথা ছিল।
মাসউদ বিন হাবিব: ২০১২ সালের ৮ ফেব্রুয়ারি চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রলীগের হামলায় শিবিরের সোহরাওয়ার্দী হলের সাধারণ সম্পাদক মাসউদ বিন হাবিব নিহত হয়েছেন। পুলিশের প্রত্যক্ষ মদদে বিশ্ববিদ্যালয়ের জিরো পয়েন্টের পাশে ছাত্রলীগ তাকে কুপিয়ে হত্যা করে। সেসময় ইংরেজি বিভাগের চতুর্থ বর্ষে থাকা মাসউদ ২০১১ সালে অনার্স এবং ২০১২ সালে মাস্টার্স সম্পন্ন করার কথা ছিল।
মুজাহিদুল ইসলাম জাহেদ: ২০১২ সালের ৮ ফেব্রুয়ারি চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রলীগের হামলার ঘটনায় শিবিরের জীববিজ্ঞান অনুষদের প্রচার সম্পাদক মুজাহিদুল ইসলাম জাহেদ নিহত হয়েছেন। লোক প্রশাসন বিভাগের শিক্ষার্থী ও ছাত্রলীগ নেতা সুমনের নেতৃত্বে তাকে কোপানোর একটি ভিডিও তখন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লেও আজও তার কোনো বিচার হয়নি। সেসময় প্রাণিবিদ্যা বিভাগের দ্বিতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী মুজাহিদ ২০১৪ সালে বিএসসি এবং ২০১৫ সালে এমএসসি শেষ করার কথা ছিল।
মামুন হোসাইন: ২০১৪ সালের ১২ জানুয়ারি বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রলীগের হামলায় শাহ আমানত হল ছাত্রশিবিরের সাধারণ সম্পাদক মামুন হোসাইন নিহত হয়েছিলেন। মৃত্তিকা বিজ্ঞান বিভাগের এই শিক্ষার্থী ২০১৩ সালে বিএসসি এবং ২০১৪ সালে এমএসসি শেষ করার কথা ছিল।
তাপস সরকার: ২০১৪ সালের ১৪ ডিসেম্বর আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে ছাত্রলীগের দুই পক্ষের সংঘর্ষ চলাকালে প্রতিপক্ষের গুলিতে নিহত হন সংস্কৃত বিভাগের ছাত্র তাপস সরকার। তাপস ২০১৭ সালে অনার্স এবং ২০১৮ সালে মাস্টার্স শেষ করার কথা ছিল।
দিয়াজ ইরফান চৌধুরী: ২০১৬ সালের ২০ নভেম্বর রাতে বিশ্ববিদ্যালয়ের ২ নম্বর গেইট সংলগ্ন নিজ বাসা থেকে উদ্ধার করা হয় ছাত্রলীগ নেতা দিয়াজের ঝুলন্ত লাশ। ৯৫ কোটি টাকার দরপত্রের ভাগবাঁটোয়ারা নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রলীগের তৎকালীন সভাপতির অনুসারী নেতা-কর্মীরা তাকে হত্যা করে ফাঁকা বাসায় লাশ ঝুলিয়ে রাখে বলে অভিযোগ ওঠে। বিশ্ববিদ্যালয়ের ফাইন্যান্স এন্ড ব্যাংকিং বিভাগের শিক্ষার্থী দিয়াজ ২০১২ সালে এমবিএ সম্পন্ন করেন। ৪র্থ সমাবর্তনে দিয়াজ বিবিএর শিক্ষার্থী হিসাবে উপস্থিত থাকলেও এবার এমবিএর শিক্ষার্থী হিসেবে থাকার কথা ছিল।
নিহত মাসউদ বিন হাবিবের ছোট বোন তামান্না বিনতে হাবিব বলেন, ‘আল্লাহ ভাইয়াকে শিক্ষা জীবনের শেষ দিকে নিয়ে গেছেন। টেলিভিশন ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাবর্তনের সংবাদ দেখার পর বারবার ভাইয়ার কথা মনে হয়। মনে হয়, ভাইয়া বেঁচে থাকলে সে তো তার বন্ধুদের সাথে এই সমাবর্তনে থাকতে পারতেন। আনন্দ করতেন। ভাইয়ের হত্যাকাণ্ডের বিচার আজও হয়নি। আমরা ভাইয়ের হত্যাকারী চিহ্নিত সন্ত্রাসীদের বিচার চাই।
নিহত মামুন হোসাইনের ক্লাসমেট মাকসুদুর রহমান আসিফ বলেন, ‘আমি এই মুহূর্তে উচ্চ শিক্ষার জন্য দেশের বাহিরে আছি। বন্ধুরা সমাবর্তন নিয়ে নানা পরিকল্পনা করছে। আমি নিজেও দেশের বাহিরে থাকায় সমাবর্তনে অংশগ্রহণ করতে পারছি না। তবে সমাবর্তন আয়োজনে আমাদের ক্লাসমেট মামুন হোসাইনকে সবাই মিস করছে৷ বিগত সময়ে ক্যাম্পাসে সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের বিচার হলে হয়তো আমরা মামুনকে এভাবে হারাতে হতো না।’
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রো-ভাইস চ্যান্সেলর (প্রশাসন) ড. মোঃ কামাল উদ্দিন বলেন, ‘শিক্ষা অর্জন করতে এসে খুনের শিকার হওয়া দুঃখজনক ঘটনা। আমরা নতুন বাংলাদেশে এসব ঘটনার পুনরাবৃত্তি চাই না। আগামী দিনের বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস হবে শতভাগ সন্ত্রাসমুক্ত। আমরা সে লক্ষে কাজ করছি।’
/রহা
