সুমন বাইজিদ, চবি থেকে
গত বছরের ২রা নভেম্বর থেকে ২২ দফা দাবিতে অনির্দিষ্টকালের জন্য অবস্থান কর্মসূচি ও ক্লাস বর্জন শুরু করেন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা ইনস্টিটিউটের শিক্ষার্থীরা। একপর্যায়ে ২২ দফা দাবি পরিবর্তন করে হঠাৎ মূল ক্যাম্পাসে ফেরার এক দফা এক দাবিতে রূপ নেয় এই আন্দোলন। শেষ পর্যন্ত বৃহস্পতিবার বিকেলে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন এক মাসের জন্য সশরীরে ক্লাস-পরীক্ষা বন্ধ ঘোষণা করে শিক্ষার্থীদের ক্যাম্পাস ত্যাগের নির্দেশ দেন।এদিকে প্রশাসন হঠাৎ ক্যাম্পাস বন্ধ ঘোষণা দেওয়ায় চারুকলা ইন্সটিটিউটের চলমান এ সংকটের সমাধান কী হতে যাচ্ছে তা নিয়ে এখন তৈরি হয়েছে ধোঁয়াশা । আর ছাত্র- ছাত্রীদের শিক্ষা জীবন নিয়ে তৈরি হয়েছে এক ধরনের অনিশ্চয়তা।
চট্টগ্রাম মহানগর থেকে ২২ কিলোমিটার দূরে হাটহাজারীতে অবস্থিত চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়।তবে ২০১০ সালে চবি চারুকলা বিভাগ ও চট্টগ্রাম সরকারি চারুকলা কলেজকে একীভূত করার মধ্য দিয়ে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে একটি চারুকলা ইনস্টিটিউট প্রতিষ্ঠার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। ২০১১ সালের ২ ফেব্রুয়ারি নগরীর বাদশাহ মিয়া চৌধুরী সড়কে বর্তমান চারুকলা ইনস্টিটিউটের আনুষ্ঠানিক যাত্রা শুরু হয়। তবে শুরু থেকেই এই ইনস্টিটিউটের শিক্ষার্থীরা বিভিন্ন অভাব অভিযোগ জানিয়ে আসছিলেন। তবে এসব দাওয়া দাওয়ার অধিকাংশ পূর্ণ করেনি বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন।এরমধ্যে গত বছরের ২ নভেম্বর থেকে নিজস্ব বাস চালু, ডাইনিং-ক্যান্টিনের সু – ব্যবস্থা, আবাসন, পাঠাগার সংস্কারসহ ২২ দফা দাবিতে অনির্দিষ্টকালের জন্য আন্দোলনের ডাক দেয় চারুকলার শিক্ষার্থীরা।
শিক্ষার্থীদের এই আন্দোলন চলে টানা ৮২ দিন। এরপর গত ২১ জানুয়ারি শিক্ষার্থীদের সঙ্গে বৈঠক করেন শিক্ষামন্ত্রী ডা. দীপু মনি ও শিক্ষা উপমন্ত্রী মহিবুল হাসান চৌধুরী নওফেল। পরদিন দ্বিতীয় দফায় সাবেক সিটি মেয়র আ জ ম নাছির উদ্দীন ও চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসক শিক্ষার্থীদের আশ্বাস দিলে তারা আন্দোলন এক সপ্তাহের জন্য স্থগিত রেখে খোলা মাঠে ক্লাস করার সিদ্ধান্ত নেন। এরপর এক সপ্তাহ পেরিয়ে গেলেও কোনো পদক্ষেপ না দেখে আবারও আন্দোলনে নামে শিক্ষার্থীরা। একপর্যায়ে এ সংস্কার আন্দোলন রুপ নেয় চারুকলাকে হাটহাজারীর মুল ক্যাম্পাসে ফেরানোর এক দফা দাবিতে।
এরমধ্যে গত বুধবার বিশ্ববিদ্যালয়ের অস্থিতিশীল পরিবেশ সৃষ্টির আশঙ্কায় মধ্যরাতে পুলিশ সাথে নিয়ে ইন্সটিটিউটে অভিযান চালায় বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টরিয়াল বডি।এসময় ইন্সটিটিউটের শিল্পী রশিদ চৌধুরী হোস্টেলের (ছাত্র) ১০৫ নম্বর কক্ষ থেকে ২০১৬-১৭ শিক্ষা বর্ষের এক ছাত্রীকে আটক এবং পাশের রুম থেকে গাঁজা উদ্ধার করে প্রক্টরিয়াল বডি।
এ ঘটনার পরের দিনই বৃহস্পতিবার (২ ফেব্রুয়ারি) উপাচার্যের সভাকক্ষে অনুষ্ঠিত বিশ্ববিদ্যালয়ের সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারণী পর্ষদ সিন্ডিকেটের এক জরুরি সভায় আগামী একমাসের জন্য সশরীরে ক্লাস-পরীক্ষা বন্ধ ঘোষণা করে শিক্ষার্থীদের ক্যাম্পাস ত্যাগের নির্দেশ দেওয়া হয়। এতে বিপাকে পড়েন শিক্ষার্থীরা। হঠাৎ করে ক্যাম্পাস ত্যাগের নির্দেশ আসায় আরও বিক্ষুব্ধ হয়ে উঠছেন আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীরা।
চারুকলা ইনস্টিটিউটের ২০১৭-১৮ শিক্ষা বর্ষের শিক্ষার্থী ফাহিম বলেন, আমাদের আন্দোলনকে দমাতেই মূলত সিন্ডিকেটের এ সিদ্ধান্ত। আমরা আগামী রবিবার অনশনের ঘোষণা দেওয়াতে প্রশাসন এ সিদ্ধান্ত দিয়েছে। তবে আমরা আমাদের আন্দোলন চলমান রাখবো এবং অনশনও করবো তবে কবে করবো এ বিষয়ে আপাতত সিদ্ধান্ত নেয়নি।
ছেলে হোস্টেল থেকে মেয়ে আটকের বিষয়ে তিনি বলেন, এক জুনিয়র মেয়েকে রিসিভ করে মেসে তুলে দিতেই সে হোস্টেলে এসেছিল। গভীর রাতে হঠাৎ প্রক্টরিয়াল বডি তালা ভেঙে ভিতরে আসায় সে ভয় পেয়ে যায়। তাই সে সামনের ১০৫ নম্বর কক্ষে ঢুকে পড়ে। পরে প্রশাসন এসে তাকে আটক করে জিজ্ঞাসাবাদ করে এবং মুচলেকা নিয়ে ছেড়ে দেয়। গাঁজার বিষয়টি পুরোপুরি অস্বীকার করে ফাহিম বলেন, প্রশাসন আমাদের আন্দোলন থামাতেই বিষয়টি অতিরঞ্জিত করছেন।
এ বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের সহকারী প্রক্টর মো. ইয়াকুব বলেন, চারুকলা নিয়ে সরকারের সাথে একটি চুক্তি হয়েছে। সেটা শিক্ষামন্ত্রী জানিয়েছেন। আপাতত চারুকলা একমাস বন্ধ থাকবে। এই একমাস সংস্থার করা হবে। তাদের ক্যাম্পাসে ফেরা নিয়ে যে সিদ্ধান্ত সেটা ক্যাম্পাস চালু হওয়ার পর জানানো হবে।
বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-উপাচার্য অধ্যাপক বেনু কুমার দে বলেন, তাদের ক্যাম্পাসে ফেরার বিষয়টা সরকার থেকে প্রকৌশলী এবং আমাদের প্রকৌশলী দেখবেন। শিক্ষামন্ত্রী আসবেন। এরপর সিন্ডিকেটের সিদ্ধান্তের ভিত্তিতে সমাধান হবে।
