নিজস্ব প্রতিবেদক
চট্টগ্রামে সেনাবাহিনী ও পুলিশের উপর হিন্দুত্ববাদী বিতর্কিত সংগঠন ’ইসকন’ সন্ত্রাসী হামলা ও এসিড নিক্ষেপ করেছে । এতে ৫ সেনা ও ৯ পুলিশ সদস্যসহ মোট ২০ জন আহত হয়েছে। যৌথবাহিনী সেখানে অভিযান চালিয়ে ইসকনের ৮২ জন সদস্যকে গ্রেফতার করে। গতকাল ইসকন নিয়ে নিয়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে বিরূপ মন্তব্য করাকে কেন্দ্র করে চট্টগ্রাম নগরের হাজারি গলি এলাকায় সহিংসতার ঘটনা ঘটেছে।ইসকন সদস্যরা এসময় একটা দোকান ভাংচুর ও লুটপাট করেন।পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করতে আসা সেনাবাহিনী ও পুলিশের উপরও এসময় হামলা চালায় দুর্বৃত্তরা। এসময় তারা ছাদের উপর থেকে এসিড নিক্ষেপ করে।
মঙ্গলবার ( ৫ নভেম্বর) বিকেলে চট্টগ্রাম নগরের কোতোয়ালী থানার হাজারি গলি এলাকায় এ ঘটনা শুরু হয়ে রাত ১১ টা পর্যন্ত চলমান থাকে।পরে সেনাবাহিনীর নেতৃত্বে যৌথ বাহিনী অভিযান চালায়।
সশ্লিষ্টরা জানান, কিছুদিন আগে একজন ফেসবুক ব্যবহারকারী তার প্রোফাইলে একটি ফটোকার্ড শেয়ার করেন। সেখানে ইসকন নিয়ে ‘কুরুচিপূর্ণ’ মন্তব্য ছিল। ফটোকার্ড সম্বলিত সেই পোস্ট নিজের প্রোফাইলে শেয়ার করেন ওসমান আলী নামে হাজারী গলির মিয়া শপিং সেন্টারের একটি দোকানের মালিক।বিষয়টি নিয়ে মঙ্গলবার বিকেল হতেই সেখানে স্থানীয় সনাতন ধর্মাবলম্বী কিছু মানুষ উত্তেজিত হয়ে পড়ে।একপর্যায়ে তারা উসমানের দোকানে হামলা চালায় ও লুটপাট করে।তারা সেখান থেকে ওসমানকে উঠিয়ে নিয়ে মারধর করতে চাইলে পুলিশ উদ্ধার করে নিয়ে যান।এসময় উত্তেজিত সনাতনী যুবকরা পুলিশের উপর হামলা চালায়।এতে ৬ পুলিশ সদস্য আহত হয়।আর সংবাদ সংগ্রহ করতে গিয়ে কয়েকজন গণমাধ্যম কর্মী হামলার শিকার হয়েছেন।
এদিকে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে রাত ৯ টার দিকে ঘটনাস্থলে সেনাবাহিনী ও বিজিবি আসে।তারা বিক্ষুব্ধ সনাতনী যুবকরা যৌথ বাহিনীর উপর হামলা চালায়।এসময় বাড়ির ছাদে উপর থেকে যৌথ বাহিনীর উপর এসিড নিক্ষেপ করা হয়।এসে ৪ সেনা সদস্যসহ আরও ৩ পুলিশ সদস্য আহত হয়। একপর্যায়ে যৌথ বাহিনী সেখানে সাঁড়াশি অভিযান চালায়। পরে সেখান থেকে ৮২ জন দুর্বৃত্তকে আটক করা হয়।আটককৃতদের অধিকাংশই ইসকনের সদস্য বলে জানিয়েছে পুলিশ । আর এঘটনায় ৫৮২ জনকে আসামী করে কোতোয়ালি থানায় মামলা করা হয়েছে।
চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশের উপ-কমিশনার (অপরাধ) রইছ উদ্দিন বলেন , ‘ইসকনকে নিয়ে দেওয়া একটি ফেসবুক পোস্টকে কেন্দ্র করে ওসমান আলী নামে এক ব্যক্তিকে অবরুদ্ধ করে রাখা হয়েছে— এমন তথ্য ৯৯৯-এ পেয়ে আমাদের কোতোয়ালী থানা পুলিশ রেসপন্স করে। তারা সেখানে গেলে অবরুদ্ধ ওসমান নামে ওই ব্যক্তিকে উশৃঙ্খল জনতা ছিনিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করে। পরিস্থিতির অবনতি হলে সেখানে অতিরিক্ত পুলিশ এবং সেনাসদস্যসহ অন্যান্য আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা উপস্থিত হন। ছিনিয়ে নেওয়ায় বাধা দেওয়ায় উশৃঙ্খল জনতা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ওপর ইটপাটকেল ও এসিড নিক্ষেপ করলে আমাদের ৯ জন সদস্য আহত হন। যার মধ্যে একজন এসিড দগ্ধ হয়েছেন।’
হামলায় জড়িত থাকার অভিযোগে আটকের সংখ্যা জানিয়ে তিনি বলেন, ‘ঘটনাস্থল থেকে বিপুল সংখ্যক ব্যক্তিকে আটক করা হলেও যাচাই বাছাই করে আমরা ৮২ জনকে আটক দেখিয়েছি। তাদের মধ্যে বেশিরভাগই ইসকন সমর্থক। কয়েকজন মুসলিম থাকতে পারে। এটিও যাচাই-বাছাই চলছে।’
গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদের বরাতে তিনি জানান, ঘটনার সাথে যারা জড়িত ছিল তারা ‘জয় শ্রীরাম’ বলে স্লোগান দিয়েছে। ‘আর ফেসবুকে যে মিথ্যা প্রচার-প্রচারণা করা হয়েছে— সবকিছু বিচার বিশ্লেষণ করে জানতে পেরেছি, ইসকন সমর্থকরাই জড়িত রয়েছে।’ বলেন সিএমপির এই কর্মকর্তা।
ঘটনার সাথে রাজনৈতিক সম্পৃক্ততা রয়েছে কিনা—এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘আটকদের জিজ্ঞাসাবাদ চলছে। কোনো রাজনৈতিক মদদ রয়েছে কিনা সেটিও তদন্ত করা হচ্ছে। শান্ত নগরীকে যারা বিশৃঙ্খল করতে চায়, তাদের বিষয়ে আমাদের কার্যক্রম চলমান। অস্থিশীল পরিস্থিতি তৈরি করে যেন নাশকতা বা লুটতরাজ করতে না পারে সেই কার্যক্রম আমাদের আগেও ছিল এখনো রয়েছে।’
যৌথবাহিনীর পক্ষে টাস্কফোর্স-৪ এর মুখপাত্র লেফটেন্যান্ট কর্নেল ফেরদৌস আহমেদ গণমাধ্যমককে বলেন,টাস্কফোর্স-৪ এর মুখপাত্র লেফটেন্যান্ট কর্নেল ফেরদৌস আহমেদ সংবাদ সম্মেলনে বলেন, ‘গতকাল বিকেল সাড়ে ৫টায় ওসমান আলী নামে একজন ব্যক্তির ইসকনবিরোধী একটি ফেসবুক পোস্টকে কেন্দ্র করে টেরিবাজার এলাকার হাজারি লেইনে উত্তেজনার সৃষ্টি হয়। আনুমানিক ৫০০ থেকে ৬০০ জন দুষ্কৃতকারী হাজারি লেনে ওসমান আলী ও তার ভাইকে হত্যা এবং দোকান জ্বালিয়ে দেওয়ার উদ্দেশ্যে জড়ো হয়। স্থানীয় কন্ট্রোল রুম থেকে প্রাপ্ত তথ্যের ভিত্তিতে দ্রুততম সময়ের মধ্যে সেনাবাহিনী, পুলিশ এবং বিজিবি সদস্যদের ৬টি টহল দল সেখানে পৌঁছায়।’
তিনি বলেন, ‘বিশৃঙ্খলাকারীদের সংখ্যা অনেক বেশি হওয়ায় জানমাল রক্ষা এবং মবজাস্টিস রোধে যৌথবাহিনী ওসমান আলী ও তার ভাইকে উদ্ধার করে। উত্তেজিত জনতাকে যথাযথ আইনি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে সমাধানের বিষয়টি আশ্বস্ত করা সত্ত্বেও একপর্যায়ে উগ্র বিশৃঙ্খলাকারীরা আরো আক্রমনাত্মক হয়ে ওঠে। দুর্বৃত্তরা এ সময় যৌথবাহিনীর ওপর অতর্কিতভাবে জুয়েলারির কাজে ব্যবহৃত এসিড-হামলা চালায় এবং ভারী ইটপাটকেলসহ ভাঙা কাঁচের বোতল ছুঁড়তে শুরু করে।’
ফের হামলার কথা জানিয়ে লেফটেন্যান্ট কর্নেল ফেরদৌস আহমেদ বলেন, ‘ফলে সেনাবাহিনীর পাঁচজন সদস্য এবং ৭ পুলিশ সদস্য আহত হয়। আহত সেনাসদস্যরা বর্তমানে সম্মিলিত সামরিক হাসপাতাল, চট্টগ্রামে চিকিৎসাধীন। এছাড়া, ঘটনাস্থলে দুর্বৃত্তরা ইট ছুঁড়ে সেনাবাহিনীর একটি গাড়ির সামনের কাঁচ ভেঙে ফেলে। উদ্ধার অভিযানের পর দুর্বৃত্ত শনাক্তকরণে যৌথবাহিনীর ১০টি টহল দল আনুমানিক ৯টার দিকে ওই এলাকায় গেলে লুকিয়ে থাকা দুষ্কৃতকারীরা ফের যৌথবাহিনীর ওপর এসিড সদৃশ ছুঁড়তে শুরু করে। এ সময় যৌথবাহিনী ঘটনাস্থল থেকে ৮২ জন সন্দেহভাজন ব্যক্তিকে আটক করতে সক্ষম হয়।’
এদিকে, আজ (বুধবার) সকালে সরজমিনে দেখা গেছে, হাজারি গলির স্বর্ণ এবং ওষুধসামগ্রী বিক্রির দোকান বেশিরভাগই সিলগালা করে দেওয়া হয়েছে। অনেক ওষুধ ক্রেতা ওষুধ কিনতে এসে ফেরত যাচ্ছেন। আর যেসব দোকান খোলা রয়েছে তারাও অবসর সময় কাটাচ্ছেন।
কয়েকজন দোকানির সাথে কথা বলে জানা গেছে, রাতের দিকে ওই এলাকায় ১৪৪ ধারা জারি করা হলেও সকাল নাগাদ তা শিথিল করা হয়েছে। সিলগালা করা দোকান কবে খুলবে—তা নিয়ে শঙ্কায় রয়েছেন তারাও।
দেখা গেছে, টেরিবাজার মোড় হয়ে হাজারি গলি সড়কের প্রবেশ পথের গেট বন্ধ করে রাখা হয়েছে। সেখানে সতর্ক অবস্থানে দেখা গেছে পুলিশ সদস্যদের। অন্যদিকে, কেসিদে সড়কের মুখেই রাখা আছে পুলিশের একটি প্রিজন ভ্যান। ওই সড়কটি বর্তমানে চালু রয়েছে।
যৌথবাহিনীর পক্ষে টাস্কফোর্স-৪ এর মুখপাত্র লেফটেন্যান্ট কর্নেল ফেরদৌস আহমেদ বলেন, হাজারি গলির দোকান সিলগালার বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘যেহেতু ওই এলাকায় সেনা ও পুলিশ সদস্যের ওপর এসিড নিক্ষেপ করা হয়েছে-সেই প্রেক্ষিতে ম্যাজিস্ট্রেটের উপস্থিতিতে দোকানগুলো সিলগালা করা হয়৷ আমরা সংশ্লিষ্টতা খুঁজে বেড়াচ্ছি। অতিসত্তর তদন্তকার্যক্রম শেষ করে দোকানগুলোর স্বাভাবিক কার্যক্রম নিশ্চিত করা হবে।
এদিকে ইসকনের অপতৎপরতা ও সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা তৈরির অপতৎপরতার বিরুদ্ধে বুধবার বিকেলে চট্টগ্রাম নগরের জামালখান এলাকায় বিক্ষোভ করেছে বৈষম্য বিরোধী ছাত্র আন্দোলন।এতে বিপুলসংখ্যক ছাত্র জনতা উপস্থিত ছিলেন। তারা দেশে। অবিলম্বে ইসকন নিষিদ্ধের দাবি জানান।
