জালাল রুমি, বিশেষ প্রতিনিধি
জনসমর্থনে অনেক পিছিয়ে থাকলেও একসময় চট্টগ্রামে দেশের প্রধান দুইটি রাজনৈতিক দল আওয়ামী লীগ ও বিএনপির সাথে টেক্কা দিয়ে চলতো জামায়াত ইসলামী । বিশেষ করে সুসজ্জিত কর্মীবাহিনী, শক্তিশালী আর্থিক অবস্থা আর শিবিরের কয়েকটি ক্যাডার বাহিনীর কারণে বন্দরনগরী চট্টগ্রামে পরাক্রমশালী হয়ে উঠেছিল সংগঠনটি। তবে নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন মহাজোট সরকার টানা দক্ষমতায় আসলে মহান মুক্তিযুদ্ধে যুদ্ধাপরাধের খড়ক পড়ে দলটির উপর। একপর্যায়ে আত্নগোপনে চলে যায় নেতাকর্মীরা। এরপর নিত্য নতুন কৌশলে বের করে প্রশাসনের চোখ ফাঁকি দিয়ে তারা চালায় দলীয় কর্মকান্ড।বিশেষ করে গোপন ও ভার্চুয়াল প্রোগ্রামের মাধ্যমে নেতাকর্মীদের সু-সংগঠিত করেছে তারা।এরমধ্যে চলতি মাসেই নগরীতে কয়েকটি বড় মিছিল করে নিজেদের অবস্থান জানান দিয়েছে আলোচিত এই দলটি।
জানা যায়, নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পরপরই জামায়াতের উপর ধরপাকড় শুরু হয়।এরপরও তারা প্রকাশ্যে বিভিন্ন কর্মসূচী পালন করতো।বিশেষ করে আব্দুল কাদের মোল্লা ও মাওলানা দেলোয়ার হোসাইন সাঈদীর বিরুদ্ধে যুদ্ধাপরাধ ট্রাইবুনালের রায়ের সময় চট্টগ্রামের মাঠে সহিংসতা চালায় তারা। তবে দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগ জোট আবার ক্ষমতায় আসলে একেবারে কোণঠাসা হয়ে পড়ে আত্মগোপনে চলে যান নেতাকর্মীরা।এরপর গোপন বৈঠকের মাধ্যমের মাধ্যমে সাংগঠনিক তৎপরতা শুরু করে। তবে করোনা পরিস্থিতির আসার পর বিভিন্ন ভিডিও কনফারেন্সিং অ্যাপসের মাধ্যমেও প্রোগ্রাম পরিচালনা করছে দলটির নেতাকর্মীরা।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে পাঁচলাইশ থানার এক জামায়াত নেতা বলেন, সেই ২০১৪ সাল থেকে আমাদের প্রকাশ্যে প্রোগ্রাম হয়না।সর্বোচ্চ ১৫ – ২০ জনে বিভক্ত হয়ে প্রোগ্রাম হয়।নিরাপত্তার কারণে সবাইকে প্রোগ্রামে আসতে বলা হয় না।পালাক্রমে জনশক্তিকে প্রোগ্রাম আনা হতো।তবে ৩-৪ বছর আগে থেকে বিভিন্ন এ্যাপসের মাধ্যমে ভার্চুয়ালি প্রোগ্রাম হচ্ছে।বিশেষ করে করোনার সময় আমরা সব প্রোগ্রাম ভার্চুয়ালি করেছি। এর ফলে যে যার জায়গা থেকে প্রোগ্রামেও অংশ নিতে পারছে।।
এখনও প্রোগ্রাম ভার্চুয়ালি হয় কিনা জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘আসলে ভার্চুয়ালি প্রোগ্রাম হলে সবাই উপস্থিত থাকতে পারে ঠিক।তবে এতে ‘রোহানিয়াত’ তেমন থাকে না।যে কারণে নেতারা ভার্চুয়ালি প্রোগ্রাম অনেকটা কমিয়ে দিয়েছেন। এখন ছোট পরিসর হলেও সরাসরি প্রোগ্রাম করার চেষ্টা করা হচ্ছে।এখন গতানুগতিক রাজনীতির বাইরে গিয়ে ‘ভিশন ৪১’ বাস্তবায়নে আমরা কাজ করছি।’
সেই ভিশন ৪১ কি জানতে চাইলে তিনি বলেন,’জামায়াতের প্রতিষ্ঠা ১৯৪১ সালে।সে হিসেবে ২০৪১ সালে দলের ১০০ তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী।এই সময়ের মধ্যে আমরা একটা ইসলামী কল্যাণমুখী সমাজ প্রতিষ্ঠার স্বপ্ন দেখছি। সেই স্বপ্ন পূরণেই এখন আমরা কাজ করে যাচ্ছি।’
এদিকে খোঁজ নিয়ে জানা যায়,চট্টগ্রামে জামায়াতের তৃণমূলে বিএনপির প্রতি অনেকটা অনীহা তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে সাম্প্রতিক সময়ে বিএনপির বিভিন্ন নেতাদের বক্তব্য নিয়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ক্ষোভ প্রকাশ করছেন তারা।তাদের দাবি, বিএনপির সাথে জোট থাকার কারণে তারা আওয়ামী লীগের হাতে অতিমাত্রায় নির্যাতিত হয়েছেন।সর্বশেষ একটি ভার্চুয়াল বৈঠকে দলের আমীরের একটা বক্তব্যের পর থেকে দলটির অনেক কর্মী সমর্থককে সামাজিক যোগাযোগ বিএনপি নেতাদের বিরুদ্ধাচারণ করতে দেখা যায়।
বিএনপি সাথে জামায়াতের জোট এখন কি অবস্থায় আছে জানতে চাইলে নগর জামায়াতের এক সাংগঠনিক সম্পাদক নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, ‘ বিএনপির সাথে আমাদের দীর্ঘদিন জোট ছিলো।এখন একটু শীতল সম্পর্ক সৃষ্টি হলেও জোট নেই সেটা বলা যাবে না ।তবে হ্যাঁ, এখন আমরা আমাদের মতো কাজ করছি।তারা তাদের মতো আছে।আমরা সবাই চাই এই স্বৈরাচারের পতন। এক্ষেত্রে কেন্দ্র যেভাবে সিদ্ধান্ত দেন, আমরা সেভাবে কাজ করবো। তবে এটা শতভাগ নিশ্চিত, আওয়ামী লীগের সাথে আমাদের কোনভাবেই আঁতাতের সুযোগ নেই।সেটার প্রশ্নই নেই।
এদিকে খোঁজ নিয়ে জানা যায়,সারাদেশের মতো চট্টগ্রামেরও ১৯ টি নির্বাচনী আসনের জন্যও প্রার্থী চূড়ান্ত করেছে জামায়াত।তবে জোটগত নির্বাচন করলে চট্টগ্রামের ৫ টি আসন তারা বিএনপি থেকে চাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। সেগুলো হলো সাতকানিয়া – লোহাগাড়া,বাঁশখালী, ফটিকছড়ি, সীতাকুণ্ড ও নগরীর ডবলমুরিং- হালিশহির আসন।সেক্ষেত্রে যেকোন ভাবেই তারা ৩ টি আসনে জয়ী হওয়ার পরিকল্পনা নিয়ে গোপন তৎপরতা চালিয়ে যাচ্ছে তারা।তবে আওয়ামী লীগের অধীনে কোন নির্বাচনে না যাওয়ারও নীতিগত সিদ্ধান্ত তাদেরকে বলা হয়েছে বলে জানা যায়।
এইদিকে গোপন বৈঠক নিয়ে জানতে চাইলে জামায়াতের চট্টগ্রাম মহানগর আমীর ও কেন্দ্রীয় এসিস্ট্যান্ট সেক্রেটারি মাওলানা শাহজাহান চৌধুরী বলেন, জামায়াত একটি নিয়মতান্ত্রিক দল। আমরা গঠনতন্ত্র অনুযায়ী কাজ করি ।আমাদের গঠনতন্ত্রে গোপন বৈঠক বলে কিছুই নেই।এটাও সরকারের একটা প্রোপাগান্ডা।আমরা প্রশাসনের এতো দমনপীড়নের পরও হেকমতের সাথে যাবতীয় সাংগঠনিক কাজ চালিয়ে যাচ্ছি।
‘ভার্চুয়াল বৈঠকের কারণে নেতাকর্মীদের মান যথাযথ হচ্ছে না, এমন অভিযোগের বিষয়ে জামায়াতের নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের এই নেতা বলেন, বিষয়টি ঠিক না যে, আমরা সব ভার্চুয়ালি প্রোগ্রাম করছি।আমরা দুইভাবেই প্রোগ্রাম করছি।আমরা আমাদের জনশক্তিকে একজন সৎ, দক্ষ ও দেশপ্রেমিক নাগরিক হিসেবে গড়ে তুলতে নিয়মিত বিভিন্ন প্রোগ্রাম করি। পরিবেশ পরিস্থিতির আলোকে প্রোগ্রামের ধরণ ঠিক ল করা হয়।সবসময় যে ভার্চুয়ালি প্রোগ্রাম করি এমনটা নয়।সবচেয়ে বড় কথা, জামায়াত একটি কল্যাণমুখী দল।প্রযুক্তির ভালো দিকটা গ্রহণ করতে তো দোষের কিছু নেই।’
প্রসঙ্গত, মহানগর ,উত্তর ও দক্ষিণ জেলা মিলিয়ে ৩ টি সাংগঠনিক শাখায় বিভক্ত চট্টগ্রাম জামায়াত। এদের মধ্যে সাংগঠনিক কাঠামোতে সবচেয়ে শক্তিশালী শাখা চট্টগ্রাম মহানগর শাখা। জনসম্পৃকতা বেশি দক্ষিণ জেলায়। এই শাখার অধীন সাতকানিয়া, লোহাগাড়া ও বাঁশখালী উপজেলা চট্টগ্রামের জামায়াত অধ্যুষিত এলাকা বলে পরিচিত। এদিকে জনসম্পৃক্ততা কম থাকলেও ক্যাড়ারভিত্তিক রাজনীতিতে এগিয়ে চট্টগ্রাম উত্তর জেলা। বিশেষ করে ফটিকছড়ি ও হাটহাজারী কেন্দ্রীক শিবির ক্যাড়াররা পুরো চট্টগ্রামে একসম পরাক্রমশালী ছিলো।যদিও এই ক্যাডারদেরকে নিজেদের কর্মী বলে অস্বীকার করতেন জামায়াত নেতারা।
