মোঃ শহীদুল হক
বাংলাদেশের সাংবাদিকতা নানাবিধ চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি। করোনা পরিস্থিতিতে এ চ্যালেঞ্জ আরও অনেক বেড়ে গেছে। সেল্ফ সেন্সরশিপ, আইনগত জটিলতা, রাজনৈতিক ও মতাদর্শগত কারণে হয়রানি, তথ্য প্রাপ্তির সীমিত সুযোগ, সামাজিক গণমাধ্যমের চাপ, যথাযথ শিক্ষা-প্রশিক্ষণের অভাব, চাকরি হারানোর ভয়, ব্যক্তি গোপনীয়তা লঙ্ঘন, শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন এবং বেতন নিয়ে জটিলতা বাংলাদেশের সাংবাদিকতায় লেগেই আছে। এগুলো মোকাবেলায় অতিসত্বর যথাযথ পদক্ষেপ গ্রহণ করা অত্যন্ত জরুরী।
ব্যক্তিগত স্বার্থ, দলীয় স্বার্থ, চাকরি হারানোর ভয়, মালিক তোষণ, ঊর্ধ্বতনের অন্ধ আনুগত্য ইত্যাদি নানা কারণে সাংবাদিকরা সেল্ফ সেন্সরশিপ চর্চা করে। এতে স্বাধীন সাংবাদিকতা চরমভাবে ক্ষতিগ্রস্থ হয়। এ অবস্থা থেকে উত্তরণের জন্য সাংবাদিকতায় নৈতিকতার ভিত্তি আরও মজবুত করতে হবে। সাংবাদিকদের ব্যক্তিগত ও দলীয় স্বার্থের চেয়ে দেশ ও জাতির স্বার্থকে প্রাধান্য দিতে হবে। কাউকে খুশি করার জন্য কোন গুরুত্বপূর্ণ সংবাদ চাপিয়ে রাখা যাবে না।
বাংলাদেশের কিছু আইন স্বাধীন সাংবাদিকতার ক্ষেত্রে বড় বাধা হয়ে আছে। ডিজিটাল সিকিউরিটি আ্যক্টের কিছু ধারা নিয়ে সাংবাদিকদের আপত্তির কোন সুরাহা আজও হয়নি। এ রকম আরও কিছু আইনগত জটিলতা বাংলাদেশের সাংবাদিকতাকে নানাভাবে বাধাগ্রস্ত করছে। এ অবস্থায় আবার নতুন করে ডাটা প্রটেকশন আ্যক্ট প্রণয়ন ও বাস্তবায়নের উদ্যোগে সাংবাদিকদের মাঝে নতুন আশংকা তৈরি হয়েছে।
রাজনৈতিক ও মতাদর্শগত কারণে সাংবাদিক হয়রানি বাংলাদেশের সাংবাদিকতায় একটি ঘৃণ্য কালো অধ্যায়। সাংবিধানিক অধিকার নিয়ে সাংবাদিকরাও নানা দল ও মতের অনুসারী হতে পারে। কিন্তু সাংবাদিকদের রাজনৈতিক অন্ধ অনুসরণ এবং তাদের ওপর রাজনৈতিক নিপীড়ন অবশ্যই বাংলাদেশের সাংবাদিকতাকে পঙ্গু করে দিচ্ছে। এ অবস্থা থেকে রক্ষা পেতে অন্ধভাবে রাজনৈতিক লেজুড়বৃত্তি ও অন্যায়ভাবে প্রভাব বিস্তারের প্রবণতা রোধ করতে হবে।
তথ্য প্রাপ্তির অধিকার নিয়ে আইন আর স্লোগান দিয়ে তেমন কোন ফায়দা হচ্ছে না।
বাংলাদেশের সাংবাদিকদের সঠিক তথ্য প্রাপ্তির সু্যোগ খুবই সীমিত। বিশেষ করে দুর্নীতি সংশ্লিষ্ট তথ্য পেতে বাঁধার অন্ত নেই। অনেক সময় তথ্য চাইতে গেলে তথ্য না দিয়ে উল্টো সাংবাদিকদের নানাভাবে মানসিক ও শারীরিক নির্যাতন করা হয়। এ অবস্থা থেকে বেরিয়ে আসার জন্য তথ্য প্রাপ্তির অধিকার আইনের যথাযথ প্রয়োগ করতে হবে। এ আইনকে আরও উপযোগী করতে প্রয়োজনীয় সংশোধন করতে হবে। সরকারসহ সকলে মিলে সাংবাদিকদের তথ্য প্রাপ্তির অধিকার নিশ্চিত করতে হবে।
অনলাইন মিডিয়া ও সামাজিক গণমাধ্যম অবাধ তথ্য প্রবাহের ক্ষেত্রে অনেক সুবিধা নিয়ে এলেও মূল ধারার সাংবাদিকতাকে নানাবিধ চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলে দিয়েছে। অনেক অনলাইন ভুঁইফোড় মিডিয়ার অপসাংবাদিকতার কারণে মূলধারার গণমাধ্যমের সুনাম ক্ষুন্ন হচ্ছে। গুজব ও মিথ্যাচারে ভরে যাচ্ছে মিডিয়া জগত। গুগল, ইউটিউব ও ফেসবুক বিভিন্ন বিজ্ঞাপনের বিরাট একটা অংশ নিয়ে যাওয়ায় মূলধারার গণমাধ্যমের টিকে থাকতে অনেক কষ্ট হচ্ছে।
পেশাদার ও মানসম্মত সাংবাদিকতার জন্য উপযুক্ত শিক্ষা ও প্রশিক্ষণের বিকল্প নেই। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য যে, বর্তমানে আধুনিক তথ্য প্রযুক্তির সুবাদে গণমাধ্যমের ব্যাপক প্রসার ঘটায় অনেকেই সাংবাদিকতা বিষয়ে উপযুক্ত শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ ছাড়াই ঢুকে পড়ছেন এ অঙ্গনে। কেউ কেউ তাদের টেকনিক্যাল জ্ঞানের কারণে কিছু ক্ষেত্রে হয়তো ভালোও করছেন। কিন্তু যথাযথ জ্ঞানের অভাবে অনেক সময় নিজের অজান্তেই করে বসছেন সাংবাদিকতার নীতি বিরুদ্ধ অনেক কাজ। এ অবস্থা থেকে মুক্তি পেতে সাংবাদিকদের সাংবাদিকতার নীতিমালাসহ নানা বিষয়ে উপযুক্ত শিক্ষা ও প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করতে হবে।
করোনার কারণে সাংবাদিকদের সৃষ্টি হয়েছে চাকরি হারানোর নতুন সমস্যা। অনেক মিডিয়া ব্যাপক সংখ্যক সাংবাদিক ছাঁটাই করেছে। এদের মধ্যে এমন অনেকেই রয়েছেন যারা দীর্ঘ অনেক বছর ধরে সাংবাদিকতা করে আসছেন। তাদের পছন্দের পেশাও ছিল সাংবাদিকতা। হঠাৎ করে চাকরি হারানোয় তারা এখন অসহায় হয়ে পড়েছেন। এ কঠিন পরিস্থিতিতে সরকার, গণমাধ্যম প্রতিষ্ঠান এবং তাদের সহযোগী সংগঠনগুলো পাশে দাঁড়ালে এ অবস্থার উত্তরণ সম্ভব।
অনেক মিডিয়ায় সাংবাদিকদের বেতন নিয়মিত পরিশোধ করা হয় না। এটা মিডিয়া জগতের একটা অপসংস্কৃতিতে পরিণত হয়েছে। দিনরাত অক্লান্ত পরিশ্রম করে মাস শেষে বেতন না পাওয়ার বেদনা সত্যিই অসহ্য। সরকারের কঠোর হস্তক্ষেপ ও সুদৃঢ় পদক্ষেপের মাধ্যমে এ প্রবণতা রোধ করতে হবে।
সাংবাদিকতার নীতি না মেনে যত্রতত্র মিডিয়া প্রতিষ্ঠা করার কারণে অনেক সময়ই বাংলাদেশের নাগরিকদের ব্যক্তি গোপনীয়তার অধিকার লঙ্ঘন হচ্ছে। বিশেষ করে যথাযথ শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ ছাড়াই যারা সাংবাদিকতা করছেন তারা অনেক সময় এ অপরাধে যুক্ত হয়ে যাচ্ছেন। যে সব ক্ষেত্রে অনুমতি নেয়া প্রয়োজন, সে সব ক্ষেত্রে অনুমতি ছাড়া ছবি তুলে ও ভিডিও করে সাংবাদিকতার নামে অনৈতিক আচরণ করে যাচ্ছেন। যেকোন মূল্যে এ জাতীয় প্রবণতা রুখতে হবে।
বর্তমান সময়ে বাংলাদেশে সাংবাদিকতার ক্ষেত্রে বিদ্যমান চ্যালেঞ্জগুলো মোকাবেলায় সরকার, সরকারি, আধা সরকারি, স্বায়ত্তশাসিত ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানসমূহ, গণমাধ্যম সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানসমূহ, সাংবাদিকবৃন্দ ও জনগণের এগিয়ে আসতে হবে। চ্যালেঞ্জ যেহেতু অনেক, সকলের সহযোগিতা ছাড়া এগুলো মোকাবেলা করা সম্ভব নয়।
লেখক
লেখক :
সভাপতি ও সহযোগী অধ্যাপক
যোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগ
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়
